পুজোর নৈবেদ্যে, রচনা হাঁড়িতে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে মঠ, খেলনা, কদমা, বাতাস নিবেদন করে বাঙালি। প্রতিটি জিনিসই চিনি থেকে তৈরি হয়। এর মধ্যে কদমা কালীপুজোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে।
বলা হয়, দেবী কালিকার হাতে কদমা না-দিলে নাকি মায়ের পুজো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। চিনি ফুটিয়ে ঘন করে তাল পাকিয়ে তার পর সুতোয় কেটে কেটে কদমা বানানো হয়। কদমার উপর, নীচ কমলালেবুর মতো একটু চাপা।
বাংলার নানা প্রান্তে প্রসিদ্ধ কালী প্রতিমাদের হাতে কদমা দেখা যায়। বোল্লাকালী, ইন্দ্রগাছার বামাকালী, চকভৃগু শ্মশানকালী, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার জলঘরের ত্রিকুল কালীর হাতে কদমা দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।
আবার দেবীর সামনে কদমা বলি দেওয়ার রীতিও আছে বাংলায়।
অবিভক্ত বর্ধমান জেলার বর্ধিষ্ণু গ্রাম মানকর। অধুনা তা পূর্ব বর্ধমানে। পূর্ব বর্ধমানের মানকর কদমার জন্য বিখ্যাত।
এই মানকরে রয়েছেন বড়মা। মানকরের বড়মার পুজো পুর্ব বর্ধমান জেলা তথা বাংলার অন্যতম প্রাচীন কালীপুজো। এই পুজোয় দেবীর উদ্দেশ্যে পাঁচ সের ওজনের এক জোড়া কদমা বলি দেওয়া হয়।
কথিত আছে, কালীর জন্যই কদমার সৃষ্টি। একদা মানকর ছিল ডাকাতদের ডেরা, চারিদিক জঙ্গলে ঘেরা। হীরু ডাকাত দাপিয়ে বেড়াত মানকরে। প্রতি রাতে ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে কালী সাধনা করত হীরু। কার্তিক মাসের এক অমাবস্যায় নানা ফল, মিষ্টি দিয়ে দেবী কালিকার পুজোর আয়োজন করেছে হীরু ডাকাত। হঠাৎই তার পোষা কুকুর কালু এসে পুজোর উপকরণগুলি খেয়ে ফেলল।
পুজো হবে কী ভাবে? মায়ের পুজো হবে না? দুঃখে কাতর হীরু ডাকাতের চোখে ঘুম নেমে এল। স্বপ্নাদেশ দিলেন দেবী কালিকা। বললেন, গ্রামে কদম ময়রা আছে। তাকে গিয়ে বল মায়ের আদেশ চিনি আর জল দিয়ে কদম ফুলের মতো মিষ্টি তৈরি করে দিতে হবে।
ময়রা বানিয়ে দিলেন, সেই কদমা নিয়ে এসে পুজো সারল হীরু। কালী আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল কদমা। আজও মা কালীর বাম হাতে কদমা না-দিলে কালী পুজো সম্পূর্ণ হয় না বর্ধমানে।
মানকর ছাড়াও নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূমের নানা গ্রামে কুটির শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে কদমা তৈরি।
বিশ্বকর্মা পুজোর আগে থেকে কদমা বানাতে আরম্ভ করেন কারিগররা। মোটামুটি বৃষ্টি কমের দিকে, বর্ষা যাব যাব করছে, কদম ফুল ফুটে গিয়েছে, ঠিক এমন সময় ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পুজো হয়। তখনই কদমা বানানো শুরু হয়।
কদম ফুলের মতো আকৃতিই হয়তো কদমা নামকরণের কারণ। কালীর হাতে ঠাঁই পেয়ে কদমা হয়ে উঠেছে দেবভোগ্য, প্রসাদের দুনিয়ায় জুটেছে জনপ্রিয়তা। (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ)।