চাহিদায় ভাটা। সেই বাজারে ভরসা রেখে লগ্নির ঝাঁপি উপুড় করতে এখনও সে ভাবে এগিয়ে আসছে না বেসরকারি সংস্থা। তাই দেশের অর্থনীতির চাকায় গতি বাড়াতে সরকারি লগ্নির মন্ত্রই জপতে হচ্ছে কেন্দ্রকে।
নর্থ ব্লকের অন্দরমহল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এ বার বাজেটে পরিকাঠামোয় বিপুল অঙ্ক বরাদ্দ করতে পারেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। কিন্তু রাজকোষ ঘাটতি লক্ষ্মণরেখার মধ্যে বেঁধে রাখলে টাকা আসবে কোথা থেকে, স্পষ্ট উত্তর মিলছে না সে প্রশ্নের। বিশেষত যেখানে সপ্তম বেতন কমিশন এবং এক পদ-এক পেনশন খাতে বিপুল বাড়তি টাকা তুলে রাখতে হবে তাঁকে।
অর্থ মন্ত্রকের কর্তাদের যুক্তি, রাস্তা, বন্দর, সেতুর মতো স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়ে। বাড়ে চাহিদা। আর সেই রথে চেপেই আসে বেসরকারি লগ্নি। যা ক্রমশ উপরে নিয়ে যায় বৃদ্ধিকে। তাই তাঁরা মনে করছেন, বিশ্ব জুড়ে অর্থনীতির এই অস্থির সময়ে এ দেশের শিল্পমহল যখন লগ্নি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, তখন প্রথম পা ফেলতে হবে সরকারকেই।
গত বাজেটে ২০১৫-’১৬-র জন্য মূলধনী খাতে ২.৪০ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেন জেটলি। ২০১৪-’১৫ অর্থবর্ষের তুলনায় যা প্রায় ২৫% বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন, ভারতে বরাদ্দ হওয়া উচিত আরও বেশি। এখন তা জিডিপির ১.৭%। থাকা উচিত অন্তত ২%। তাই বাজেটে পরিকাঠামোয় বাড়তি জোরের পক্ষে তাঁরা।
পরিকাঠামোয় জোর দিতে বলেছে বণিকসভা ফিকি-সহ শিল্পের একাংশও। এ জন্য আপাতত রাজকোষ ঘাটতির লক্ষ্য শিথিলের পরামর্শ দিয়েছে তারা।
দিনে ৩০ কিমি জাতীয় সড়ক তৈরি, পাঁচ বছরে ২০টি স্মার্ট সিটি গড়া, জাতীয় লগ্নি ও পরিকাঠামো তহবিল তৈরিরও ‘প্রতিজ্ঞা করেছে’ কেন্দ্র। যা পূরণে বিপুল টাকার সংস্থান করতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। প্রশ্ন, তা জোগাবেন কোন গৌরী সেন?
এ বছর বিশ্ব বাজারে তেলের দর তলানিতে ঠেকার সুযোগে বারবার পেট্রোল-ডিজেলে উৎপাদন শুল্ক বাড়িয়ে কোষাগারে মোটা টাকা এনেছেন জেটলি। গত বাজেটে পরিষেবা করের হার ১২.৩৬ থেকে বাড়িয়ে করেছেন ১৪%। বসিয়েছেন ০.৫% স্বচ্ছ ভারত সেস। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকাঠামোয় যে-পরিমাণ লগ্নি দরকার হবে, তার তুলনায় ওই সমস্ত অঙ্ক নস্যি।
তার উপর, তলানি ছোঁয়া তেল এই অর্থবর্ষে আর অত নামবে না। বিপুল টাকা রাখতে হবে সপ্তম বেতন কমিশন (৭২ হাজার কোটি) ও এক পদ-এক পেনশন নীতি কার্যকর করতে। তা হলে পরিকাঠামোর অর্থ আসবে কোথা থেকে?
অর্থ মন্ত্রকের কর্তারাও মানছেন, এই মুহূর্তে আয়কর খাতে রাজস্ব বাড়ানোর পথ সীমিত। বিলগ্নিকরণ লক্ষ্যমাত্রার ধারে-কাছে পৌঁছয়নি। তার উপর পাঁচ বছরে কোম্পানি করের হার ৩০ থেকে ২৫ শতাংশে নামানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে গত বাজেটে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে আর্থিক কর্মকাণ্ড বাড়লে বৃদ্ধির হার চাঙ্গা হত। অসুবিধা হত না কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে। কিন্তু আপাতত সে গুড়ে বালি।
তাই অনেকে মনে করেন, পরিকাঠামোয় বিপুল বরাদ্দ করতে গেলে রাজকোষ ঘাটতির লক্ষ্য থেকে সরতে হবে জেটলিকে। কিন্তু তা যে ঠিক হবে না, সে কথা আগেই বলেছে বণিকসভা সিআইআই। বিশেষজ্ঞদের বড় অংশেরও মত, নিজের লক্ষ্য কেন্দ্র নিজেই ভাঙলে, প্রশ্ন উঠবে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। মূল্যায়ন সংস্থা ও বিদেশি লগ্নিকারীদের চোখে তা ভাল ঠেকবে না। তখন বেসরকারি লগ্নি টানা আরও কঠিন হবে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটে কার্যত দড়ির উপর হাঁটতে হবে জেটলি-কে। ক্রিসিলের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ডি কে জোশীর কথায়, ‘‘হাত বাঁধা অবস্থায় জেটলিকে বাছতে হবে কিছু পরিকাঠামো ক্ষেত্র। যেখানে জোর দিলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।’’