ডলারে টাকার দামের পতন জোর করে রোখার চেষ্টা করবে না রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। শীর্ষ ব্যাঙ্কের মতে বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে টাকার দামের এই পতন তেমন অস্বাভাবিক নয়। হঠাৎ ধস না-নেমে পরিস্থিতির সঙ্গে তাল রেখে টাকার দাম ধীরে ধীরে পড়লে ক্ষতি নেই বলে মনে করছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।
শীর্ষ ব্যাঙ্ক এ কথা বললেও, নতুন বছরে ডলারের সাপেক্ষে টাকা পড়ে গিয়েছে ৩.৫%। এক ডলার ক্রমশ ৬৯ টাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বুধবারই ১ ডলারের দাম নেমেছিল ৬৮.৬৭ টাকায়। গত ৩০ মাসের মধ্যে যা সবচেয়ে কম। বাজার বন্ধ হয় ৬৮.৪৭ টাকায়। বৃহস্পতিবার অবশ্য মোটামুটি স্থিতাবস্থা বজায় ছিল। এ দিন প্রতি ডলার দাঁড়ায় ৬৮.৪৬ টাকায়। ভারতীয় মুদ্রাটি এতটা নীচে নামায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে বিভিন্ন মহলে। তারা চাইছে, এই পতন রুখতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কিছু একটা করুক।
আর ঠিক এখানেই আরবিআইয়ের প্রশ্ন, সত্যিই এতটা আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার মতো কিছু ঘটেছে কি না। আসলে শীর্ষ ব্যাঙ্ক কৃত্রিম উপায়ে টাকার দাম বাড়ানোর বিপক্ষে। কারণ, সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে তা থেকে সরে এলে দামে ধসও নামতে পারে। তাদের মতে, বাজারই টাকার দাম ফেলছে। শুধু ভারতের নয়, পড়ছে বিশ্বের আরও বহু দেশের মুদ্রার দামই। বরং ওই সব দেশের তুলনায় ভারতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির হার কম। অথচ আর্থিক বৃদ্ধির হার বেশি। তাই টাকা এই পতনে কৃত্রিমতা নেই। সে কারণেই তা জোর করে রোখার চেষ্টা ঠিক হবে না।
টাকার পতন রুখতে বড়জোর দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার থেকে বাজারে ডলার বিক্রির রাস্তায় হাঁটতে পারে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এর আগে পতনে রাশ টানতে ২০১৩-র অগস্ট, সেপ্টেম্বর— এই দু’মাসেই শীর্ষ ব্যাঙ্ক বাজারে ৬০০ কোটি ডলার বেচেছিল। চলতি বছরে এ পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ মাত্র ৭ কোটি ৭০ লক্ষ ডলার।
সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর রঘুরাম রাজন এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, দেশের আর্থিক উন্নয়নের খাতিরে কেন্দ্র বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কেউই চিনের পথ অনুসরণ করে টাকার দাম কৃত্রিম ভাবে কমাতেও চায় না। উল্লেখ্য, রফতানি বাড়িয়ে নিজের দেশের আর্থিক সমস্যার মোকাবিলা করতে অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’ দু’বার ইউয়ানের মূল্য হ্রাস করেছে চিন। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মনে করে, টাকার এ ধরনের অবমূল্যায়নেও ভবিষ্যতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
তবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই অবস্থানে উদ্বিগ্ন কোনও কোনও ব্যবসায়ী মহল। তাদের আশঙ্কা, টাকার দাম কমার বিষয়টি বড় সহজ ভাবে দেখছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। তাদের সবচেয়ে বেশি চিন্তা শেয়ার বাজারে বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলিকে নিয়ে। কারণ, তারা টানা শেয়ার বিক্রি করে চলেছে। নতুন বছরে ওই সব সংস্থা যতটা শেয়ার কিনেছে, বিক্রি করেছে তার থেকে অনেক বেশি। অথচ গত বছর ছবিটা ছিল উল্টো। আর, বিদেশি লগ্নি সংস্থা শেয়ার বেচতে থাকলেই টাকার পতন দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বর্তমানে বাজারের যা অবস্থা, তাতে ওই সব সংস্থা শেয়ার বিক্রির বহর আরও বাড়িয়ে দিলে টাকার মূল্য ধরে রাখার বিষয়টি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিভিন্ন মহলের।
এ দিকে এই অবস্থার মধ্যেই বৃহস্পতিবার সেনসেক্স উঠেছে ২৬৭.৩৫ পয়েন্ট। দাঁড়িয়েছে ২৩,৬৪৯.২২ অঙ্কে। এই নিয়ে টানা দু’দিনের লেনদেনে মোট ৪৫৬.৮৫ পয়েন্ট বাড়ল বাজার। এ দিন বিশ্ব বাজারে বেড়েছে অশোধিত তেলের দাম। যার জেরে এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন শেয়ার বাজারও বেশ চাঙ্গা ছিল।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভারতে পড়তি বাজারে লগ্নিকারীদের শেয়ার কেনার জেরেই সূচক উঠেছে। পাশাপাশি বিদেশের শেয়ার বাজারগুলির তেজী ভাবও ইন্ধন জুগিয়েছে উত্থানে। অবশ্য বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলির শেয়ার বিক্রি অব্যাহত। ফলে ক্রেতার ভূমিকায় মূলত ভারতীয় আর্থিক সংস্থাগুলিকেই দেখা গিয়েছে।
অনেকে অবশ্য বলছেন, সূচক টানা দু’দিন উঠলেও ভারতে বাজারের অবস্থার কোনও মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। এই মুহূর্তে তা চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি বদলের আশায় শেয়ার বাজার মহলে সকলেরই নজর এখন কেন্দ্রীয় বাজেটের দিকে।