আর্থিক ভিত দুর্বল, দেখাল সমীক্ষা

এ বড় সুখের সময় নয়। উপরে পালিশ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু অর্থনীতির ভিত যে দুর্বল, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল আর্থিক সমীক্ষা।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:১৯
Share:

এ বড় সুখের সময় নয়। উপরে পালিশ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু অর্থনীতির ভিত যে দুর্বল, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল আর্থিক সমীক্ষা।

Advertisement

শুক্রবার অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির পেশ করা আর্থিক সমীক্ষায় (২০১৫-’১৬) পূর্বাভাস, আগামী অর্থবর্ষে বৃদ্ধির হার ৭ থেকে ৭.৭৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে। ২ থেকে ৫ বছরের মধ্যে তা পৌঁছবে ৮-১০ শতাংশে। যা প্রথম ঝলকে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশা জাগায়। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলেই স্পষ্ট যে, বিশ্ব পরিস্থিতি টালমাটাল এবং দেশে কৃষির দুরবস্থার জেরে অর্থনীতির ভিতরের ছবি ততটা ভাল নয়।

এমনিতেই মোদী সরকারের জমানায় জিডিপি মাপার পদ্ধতি বদলে বৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। তার পরেও সমীক্ষা মেনে নিয়েছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির হাল আরও জটিল হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর হঠাৎ বাড়তে শুরু করলে, পৌনে আট শতাংশ বৃদ্ধির স্বপ্ন ধাক্কা খেতে পারে।

Advertisement

গ্রামীণ অর্থনীতির হাল ফেরাতে আসন্ন বাজেটে গ্রাম-গরিবের দিকে নজর থাকবে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রকের মুখ্য উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যন। বলেছেন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা। কিন্তু সামাজিক উন্নয়নে ঢালার টাকা আসবে কোথা থেকে, সে প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়। সেই টাকা জোগাড়ে কেন্দ্রকে যে-মরিয়া হতে হবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে সমীক্ষায়। ওই লক্ষ্যে করের জাল বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। সুপারিশ করা হয়েছে করছাড়ের সুবিধা ধাপে ধাপে তুলে দেওয়ার। পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ধনী চাষিদের দেওয়া ভর্তুকি বন্ধ করারও।

বেসরকারি লগ্নি এখনও সে ভাবে আসছে না। তাই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকারি লগ্নি বাড়ানোর দাওয়াই দিয়েছেন সুব্রহ্মণ্যন। বিশেষত পরিকাঠামোয়। কিন্তু সমস্যা হল, সে ক্ষেত্রে রাজকোষ ঘাটতি বাড়বে। সেই কারণে সমীক্ষাও বলছে, চলতি বছরে ৩.৯ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া সম্ভব। কিন্তু আগামী কয়েক বছরে আগেভাগেই বেঁধে রাখা লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা শিথিল করার কথা ভাবা যেতে পারে।

সমীক্ষা দেখে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিডিপির সঙ্গে ঘাটতির অনুপাত এমনিতেই লাগামছাড়া হওয়ার ভয় আছে। কারণ, গত বাজেটে জেটলি ধরেছিলেন, চলতি আর্থিক বছরে জিডিপি হবে ১৪১ লক্ষ কোটি টাকা। আগের বারের তুলনায় বাড়বে ১১.৫%। কিন্তু তা না হওয়ায় ঘাটতিতে লাগাম পরানো কঠিন হবে জেটলির পক্ষে।

ইউপিএ-জমানার শেষ পর্বে তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরমের ঘুম কেড়েছিল রাজকোষ ও চালু খাতে বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের ঘাটতি। সমীক্ষা বলছে, এখন বড় বিপদ দুই হিসেবের খাতা। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ঘাড়ে চেপে বসা অনুৎপাদক সম্পদের বিপুল বোঝার। অন্যটি বেসরকারি শিল্প সংস্থাগুলির লাভ-লোকসানের। দেখা যাচ্ছে, চাহিদায় ভাটার কারণে মুনাফার মুখ দেখতে হিমশিম খাচ্ছে শিল্প। বিপাকে পড়ছে ব্যাঙ্কের ধার শোধ করতেও।

যে-সংস্থার ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোনও সম্ভাবনা নেই, নতুন দেউলিয়া আইন যে তার জন্য কত জরুরি, তা-ও স্পষ্ট করেছেন সুব্রহ্মণ্যন। তাঁর মতে, আগে কারখানা খোলার পথে লাইসেন্স-রাজের বাধা ছিল। এখন আবার কোনও সংস্থা ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যবসার পাট গোটাতে চাইলে, সেই রাস্তা কার্যত বন্ধ। ফলে ব্যাঙ্কও তার বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামে তুলে ঋণের টাকা ফেরাতে পারছে না। সমস্যা মোকাবিলায় ব্যাঙ্ক এবং সংস্থার মধ্যে বিবাদের সমাধান ও দেউলিয়া আইনে জোর দেন তিনি।

উপদেষ্টার মতে, টানা চার বছর অনাবৃষ্টি, দু’বছরের খরার ধাক্কা কাটিয়ে এ বছর কৃষি কিছুটা ভাল করলে বৃদ্ধি ৭.৭৫ শতাংশে পৌঁছবে। গ্রামের মানুষের আয় বাড়লে বাজার বাড়বে। অর্থনীতিতে গতি আসবে। মূল্যবৃদ্ধিতে ছাপ না ফেলেও সেই কাজে সাহায্য করবে সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হওয়া। তবে শুধু গ্রামের বাজারে ভর করে যে বৃদ্ধি ১০ শতাংশের দিকে ছুটবে না, তা মেনে নিয়েছেন তিনি। তার জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে টানা সঙ্কুচিত হওয়া রফতানি ঘুরে দাঁড়ানোর দিকে। যে কারণে চিন-সহ এশীয় দেশগুলি তাদের মুদ্রার দাম কমানোর লড়াইয়ে নামলে, তার জন্য ভারতকে তৈরি থাকার কথা বলেছেন সুব্রহ্মণ্যন।

এই পরিস্থিতিতে জেটলি বাজেটে কতটা সাহসী হবেন, এখন সেটাই প্রশ্ন। রেল বাজেটে সুরেশ প্রভু যে ভাবে সেই পথ এড়িয়েছেন, তাতে সংস্কারের সাহস নিয়ে সংশয় স্বাভাবিক। সুব্রহ্মণ্যনও বলছেন, অবাস্তব ‘বিগ ব্যাং’ সংস্কারের আশা করা উচিত নয়। বরং জরুরি ধাপে ধাপে সংস্কার। অনেকের আশঙ্কা, তার মানে সেই গজেন্দ্রগমন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement