নগদ হস্তান্তরের প্রাবল্য কি পরিকাঠামো খাতে উন্নয়নে বাধা
West Bengal Government

রাজ্যের ভিত এখনও দুর্বল

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে পেরিয়েছে প্রায় দেড় দশক। পরিকাঠামোয় কত দূর এগোল এ রাজ্য? এর বিশ্লেষণ মোটামুটি দু’টি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথমটি, তৃণমূল সরকারের প্রথম পাঁচ বছর (২০১১-২০১৬)। দ্বিতীয়টি এক দশকের (২০১৬-২০২৬)।

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:০৯
Share:

বাড়ির ভিত দুর্বল হলে, বাড়ি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ঠিক তেমনই পরিকাঠামো। এর উপরেই প্রধানত দাঁড়িয়ে থাকে একটা গোটা দেশ বা রাজ্যের যাবতীয় অগ্রগতি। যার পরিকাঠামো মজবুত, তার আর্থিক বৃদ্ধি তত বেশি গতিশীল এবং দীর্ঘস্থায়ী। অথচ, এই পরিকাঠামোই বরাবর আটকে গিয়েছে রাজনৈতিক তরজার জালে। যেমন, বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিরোধী পক্ষ যে সব কারণে সরব ছিল, তার মধ্যে অন্যতম এই পরিকাঠামোই। স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের প্রত্যাশা ছিল, আগের জমানাকে ছাপিয়ে যাবে এ জমানা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে পেরিয়েছে প্রায় দেড় দশক। পরিকাঠামোয় কত দূর এগোল এ রাজ্য?

এর বিশ্লেষণ মোটামুটি দু’টি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথমটি, তৃণমূল সরকারের প্রথম পাঁচ বছর (২০১১-২০১৬)। দ্বিতীয়টি এক দশকের (২০১৬-২০২৬)। প্রথম দফায় রাজ্যে সড়ক পরিকাঠামোয় একটা চোখে পড়ার মতো তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। নতুন নতুন রাজ্য সড়ক, গ্রামীণ সড়ক ইত্যাদি তৈরি হয় বিপুল হারে। রাস্তার গুণমান নিয়ে স্বস্তি ফিরেছিল পথচারীদের মধ্যে। নতুন ভবন-প্রেক্ষাগৃহ, সেতু এবং রেল ওভারব্রিজের সংখ্যাও বাড়তে থাকে ক্রমশ। দ্বিতীয় দফায় জোর পড়ে নানা ধরনের অনুদান প্রকল্পের উপরে। টান পড়তে থাকে পরিকাঠামোর বরাদ্দে। একই সঙ্গে বাম আমলের ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’ শব্দবন্ধটি ফিরে আসে রাজনৈতিক ভাষ্যে। রাজনৈতিক সেই বিভাজনের প্রভাব পড়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের উপর। এক দিকে দুর্নীতি-সহ একাধিক অভিযোগে বন্ধ হয় একাধিক কেন্দ্রীয় অনুদানভুক্ত প্রকল্প। অন্য দিকে, কেন্দ্রের অনেক প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় রাজ্যও। ফলে খরচের বোঝা আরও বাড়ে নবান্নের কোষাগারের উপরে।

গোটা রাজ্যে এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই আমলেরই গোড়ায় তৈরি ঝাঁ-চকচকে রাস্তাগুলির হাড়গোড় বেরিয়ে পড়েছে। তাপ্পি দেওয়া ছাড়া পূর্ণাঙ্গ মেরামত প্রায় নেই বললেই চলে। পূর্ত দফতর রাজ্যের বেশির ভাগ রাস্তা সারাই বা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত দফতর। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্র এবং রাজ্য মিলিয়ে ওই দফতরের বাজেট ছিল ৫৪২৭ কোটি টাকা। তার মধ্যে অর্থ দফতর ১৭৯৮ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছিল। পূর্ত দফতর খরচ করেছিল প্রায় ৭৭৭ কোটি টাকা— এর বেশির ভাগই আগের বছরের নানা ধরনের বিল (প্রধানত ঠিকাদারদের) মেটাতে। শুধু পূর্ত দফতর কেন, প্রশাসনের অন্দরের ফিসফাস: বেশিরভাগ দফতরই তাদের বাজেটের অর্ধেকও বরাদ্দ পায়নি।

বড় পরিকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে কেন্দ্র বরাদ্দ দিলেও, রাজ্যের অসহযোগিতার অভিযোগ উঠছে। এমন কয়েকটি প্রকল্প মিলিয়ে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ২৯০০ কোটি টাকা। আরও প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প এগোচ্ছে শম্বুক গতিতে। স্থির হয়েছিল, বারাণসী-কলকাতা আর্থিক করিডর প্রকল্পের পরিধি বেড়ে তা পৌঁছবে জাতীয় সড়ক ১১৭ বা ডায়মন্ড হারবার রোড পর্যন্ত। তাতে হুগলি নদীর উপর আরও একটি সেতু পেত রাজ্য, তা-ও পুরোপুরি কেন্দ্রের টাকায়। কিন্তু সেই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি জোগাড় করাই এখন অন্তরায়। ফলে প্রকল্পটি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। অথচ প্রতিবেশী বিহারে শুধু গঙ্গার উপর দিয়েই ৪০ কিলোমিটার অন্তর ১৮টি সেতু তৈরি হচ্ছে। এর কিছু হয়ে গিয়েছে, কিছুর কাজ চলছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ সে রাজ্যের সরকার সেরে ফেলেছে সময়ের মধ্যেই। কেন্দ্রের তথ্য— গত প্রায় ২০ বছরের মধ্যে ছ’হাজার সেতু তৈরির কাজ শেষ। ২০১৪ সালে ৪,৪৪৭ কিলোমিটার জাতীয় সড়কের দৈর্ঘ্য চার বছরের মধ্যে পৌঁছেছে ৮,৮৯৮ কিলোমিটারে। বিনিয়োগ হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আরও প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাবে রয়েছে।

প্রশ্ন ওঠে, এ দেশের অনেক রাজ্যেই অ-বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক বৈরও আছে। তবু সে সব রাজ্যে পরিকাঠামো গড়ার প্রশ্নে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয়ে খামতি নেই। অথচ, বিগত দেড় দশক ধরে বকেয়ার প্রশ্নে কেন্দ্রের সঙ্গে শুধু টানাপড়েনই অব্যাহত এ রাজ্যের। যদিও, তৃণমূল সরকারের বরাবরের দাবি, লক্ষাধিক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হয়েছে তাদের আমলেই। প্রস্তাবিত ছ’টি আর্থিক করিডরে হবে বিপুল বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান ইত্যাদি। কিন্তু, অমৃতসর থেকে শুরু হওয়া রেলের পণ্য-করিডর নির্মাণের কাজ বাধামুক্ত রাজ্য করতে পারেনি বলে দফায় দফায় চিঠি পাঠাচ্ছে রেল মন্ত্রক। আবার কেন্দ্রের অন্তত তিনটি আর্থিক করিডর প্রকল্পের কাজ অন্য সব রাজ্যে শুরু হয়ে গেলেও, এ রাজ্যে তা এখনও হয়নি বলেই অভিযোগ। তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির কাজও কার্যত বিশ বাঁও জলে। ডেউচা-পাঁচামির প্রচার থাকলেও, মূল কাজ কবে শুরু হবে, তার দিশা নেই। অন্যান্য রাজ্যে যেখানে মোট্রো-পথ বিস্তার বাড়াচ্ছে ক্রমশ, সেখানে গড়িয়া-বিমানবন্দর মেট্রো-পথের মধ্যে চিংড়িঘাটায় স্টেশন তৈরিই করা যাচ্ছে না রাজ্য-রেলের টানাপড়েনে। পরিস্থিতি এমনই, জট কাটাতে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে কলকাতা হাই কোর্টকে। এ রাজ্যের নদী-পথ ‘ওয়াটারওয়ে-১’এর মর্যাদাসম্পন্ন। অথচ মালদহ, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, দুই ২৪ পরগনা দিয়ে বয়ে আসা হুগলি নদীতে পণ্য পরিবহণের পরিকাঠামো নির্মাণ নিয়ে নেই কোনও ভাবনাচিন্তা, কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা। অথচ গোয়া, কেরল অসমে এমন পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে বড় বহরে।

এ নিয়ে প্রশাসনের অন্দরে উদ্বেগ আছে কি? দাবি করা হচ্ছে, বেশির ভাগ কাজই শেষ হয়ে গিয়েছে। বিপুল কর্মসংস্থানে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার উপরে উঠে এসেছেন। বেকারত্বে হার কমছে উল্লেখযোগ্য গতিতে। তবু ঘুরে-ফিরে সরকারের শীর্ষমহল থেকে নাগরিকদের উদ্দেশে আসছে চা-চপ-ঘুগনি বিক্রির বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রস্তাব। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনও নীতি এখনও তৈরি হয়নি। গত মার্চের মাঝামাঝি শিল্পে সব ধরনের উৎসাহ ছাড় (ইনসেন্টিভ) দেওয়ার চালু সুবিধা আচমকাই প্রত্যাহার করে রাজ্য। অনুদান-প্রকল্পগুলি চালিয়ে যাওয়াই যে উদ্দেশ্য, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে রাজ্য।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে, পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত, দীর্ঘ না স্বল্প মেয়াদের? বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথটি কঠিন, কিন্তু ফল হয় ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী। তাতে অর্থনীতির চাকা ঘোরে, বাড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও। ব্যবসা এবং বিকল্প আয় বৃদ্ধিরও সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ভোট-রাজনীতির স্বার্থে অনেক সময়ে স্বল্পমেয়াদে খয়রাতির জনপ্রিয় পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন ধারের বোঝা ছিল প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা। এখন তা প্রায় ৭.৭১ লক্ষ কোটি টাকা। বাড়ছে রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণও। অনেকের মতে, ২০১১ সালে পালাবদলের পরেও যদি বিনিয়োগ টানার লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য পরিকাঠামো গড়ায় মন দিত সরকার, তা হলে খরচের অনেক গুণ অর্থ ফিরে আসত স্থায়ী সম্পদ হয়ে। সে ক্ষেত্রে ধার বাড়লেও তা মোকাবিলার মতো রাজকোষ শক্তিশালী হত। অর্থনীতিবিদেরাও মনে করেন, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে ধার করা দরকার, কিন্তু প্রধানত পরিকাঠামো খাতের জন্য। তাতে অর্থ ফিরে আসে অনেক গুণ হয়ে।

এ রাজ্যের নাম না-করলেও, মাসখানেক আগেই একটি অনুষ্ঠানে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর ডি সুব্বারাও সতর্ক করে বলেছেন, “অনুদান বা তার প্রতিশ্রুতি কোনও রাজনৈতিক দলকে ভোটে জেতাতে পারে, কিন্তু তা দেশ গড়তে পারে না।” পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে চলা এই ‘অনুদান-রাজনীতি’ সম্পর্কে সুব্বারাওয়ের স্পষ্ট মনোভাব— “রাজনৈতিক নেতারা নাগরিককে তবে বলতে চাইছে— আমি তোমাকে মর্যাদা, উন্নত জীবিকা এবং স্থায়ী আয় নিশ্চিত করতে পারছি না। ফলে আপাতত সামান্য কিছু (অনুদান) দিয়েই কাজ চালিয়ে নাও।” প্রশ্ন থেকে যায়, খয়রাতি রাজনীতিতে বিপুল সংখ্যক উপভোক্তা তৈরি এবং নানাবিধ সরকারি প্রকল্পের উপর তাঁদের নির্ভরশীল করে ফেলা কি ভবিষ্যতের পক্ষে শুভ! না কি, এমন পরিবেশ কাঙ্ক্ষিত যেখানে যোগ্যতার মানদণ্ডে মিলবে কাজ; কাজের খোঁজে পাড়ি দিতে হবে না ভিন রাজ্য বা দেশে; শিল্প-বিনিয়োগ-পরিকাঠামোকে কেন্দ্র করে তৈরি আর্থিক কর্মকাণ্ডে সম্মানজনক পেশা বেছে নিতে পারবেন যে কোনও স্তরের মানুষ?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন