ভরসা: লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা বাড়ায় প্রকল্পের প্রাপকদের আনন্দ-মিছিল। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বালুরঘাট। ছবি: অমিত মোহান্ত।
এখনও কারা তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেন? নির্বাচনের মুখে বঙ্গ রাজনীতি সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তো বটেই। সামাজিক ইতিহাস যে শ্রেণিকে ‘ভদ্রলোক’ হিসাবে চেনে, বরাবর যাঁরা রাজ্য-রাজনীতির ভাষ্য স্থির করে এসেছেন, সেই ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থ পুরুষদের একটা বড় অংশ অন্তত গত দু’টি নির্বাচনে— ২০২৪-এর লোকসভা, এবং ২০২১-এর বিধানসভা— বিজেপির দিকেই ভোট দিয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে। ঐতিহাসিক কারণে এই শ্রেণির সিংহভাগ ‘হোয়াইট কলার’ চাকরি করেন, অথবা অন্তত মাঝারি মাপের ব্যবসা বা কৃষিজমির মালিক। ‘ভদ্রলোক’রা গায়েগতরে খাটেন না। আর, তৃণমূলকে কারা ভোট দেয়? বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশ তৃণমূলের দিকে গিয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে যে, তার বাইরেও প্রান্তিক কৃষক বা দরিদ্র শ্রমজীবী হিন্দু পুরুষরা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক, যাঁদের সিংহভাগই তথাকথিত নিম্নবর্ণের। কিছু উদারবাদী, হিন্দুত্বের আগ্রাসনে বিরক্ত ও ভীত মানুষও বিলক্ষণ ভোট দিয়েছেন তৃণমূলকে— তবে, এই জনগোষ্ঠীকে আজকের লেখার বাইরে রাখব।
অন্য ভাবে বললে, বাজার যাঁদের সহায় হয়নি, সরকারি সাহায্যের উপরে যাঁদের নির্ভর করতে হয়, তাঁদের অনেকেই এখনও তৃণমূলের ভোটার। কেন, সে প্রশ্নের দুটো উত্তর সম্ভব— এক, তৃণমূল একটা পেট্রন-ক্লায়েন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছে, যেখানে নাগরিক পরিণত হয়েছেন অনুগৃহীত-য়, আর রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে অনুগ্রহকারীতে; এবং এই ব্যবস্থা চলছে মূলত দলের কাঠামোর বাইরে, প্রশাসনিকতার মাধ্যমে। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী নেটওয়ার্কও— যেখানে শাসক দলের ঠিক গোষ্ঠীতে নাম লেখানো থাকলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খানিক অর্থোপার্জন করা সম্ভব। দ্বিতীয় উত্তর হল, বাজার যাঁদের কর্মসংস্থান করতে ব্যর্থ হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাষ্ট্রের কর্তব্য পালন করে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাঁদের জীবনযাত্রার ন্যূনতম অধিকার রক্ষা করতে সক্রিয় হয়েছে।
এই দুটো উত্তরের মধ্যে কোনটা কার ঠিক বলে মনে হবে, সেটা নির্ভর করছে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানের উপরে। কোন উত্তরটা গ্রহণযোগ্য, আর কোনটা নয়, এ লেখায় সে তর্কে ঢুকব না। শুধু মনে করিয়ে দেব, বাজারের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সম্পর্কের যে ব্যাখ্যাই করা হোক, সে সম্পর্ককে ভাঙতে বিজেপির ‘চার্জশিট’-এর অধিকাংশ যুক্তিই অক্ষম। যাঁরা বাজার ব্যবস্থার অনেক বাইরে রয়ে গিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে দুর্নীতি অথবা ডিএ দেওয়া না-দেওয়ায় তাঁদের খুব কিছু যায়-আসে কি? এ সম্পর্ক ভাঙার একটা অস্ত্র অবশ্যই ধর্মীয় মেরুকরণ। অস্বীকার করার উপায় নেই, যে কাজে বিজেপি ইতিমধ্যেই অনেকাংশে সফল।
অনুপ্রবেশ নিয়ে ভিত্তিহীন হইচই এবং আতঙ্ক ছড়ানো তার একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। তবে, যত দূর অবধি মেরুকরণ ইতিমধ্যেই হয়েছে, তার চেয়েও অনেক দূর যাওয়া সম্ভব কি না, সে সংশয় রয়েছে। আর একটি অস্ত্র ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া— অন্তত এই নির্বাচনের জন্য। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের চলন দেখে সন্দেহ হয়, সে অস্ত্রও যথেষ্ট প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু, চাকরিতে দুর্নীতি অথবা রাজ্যর অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মতো প্রশ্ন এই জনগোষ্ঠীর কাছে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
বাজারের অবলম্বনহীন এক বিপুল জনগোষ্ঠী নিজেদের বেঁচে থাকার রসদ নিশ্চিত করতেই এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে রয়েছে, এই কথাটা পনেরো বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা একটা দলের পক্ষে সম্মানজনক কি না, সে প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উন্নয়ননীতি শেষ অবধি মানুষকে রাষ্ট্রের উপরে নির্ভরশীলই করে রাখল, এমন অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। কিন্তু, এই জনগোষ্ঠী এখন তৃণমূল কংগ্রেসের বৃহত্তম রাজনৈতিক পুঁজি— সে কথাও অনস্বীকার্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিলক্ষণ জানেন যে, বাঙালি ‘ভদ্রলোক’, অথবা ভদ্রলোক-হয়ে-উঠতে-চাওয়া সমাজ তাঁকে কখনও গ্রহণ করেনি। এবং, তাঁর রাজনীতি ‘ভদ্রলোক’-এর অনুমোদনের তোয়াক্কাও করেনি। তিনি মঞ্চে বাংলা বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্তদের গান-নাচে যোগ দিতে পারেন, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে বসে পড়তে পারেন চপ ভাজতে; আবার, দেশ জুড়ে যখন বাঙালি-বিদ্বেষ তীব্র হয়েছে, তখন এক বারের জন্যও তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেননি, কারণ তাঁর প্রধান ভোটব্যাঙ্ক সেই সংজ্ঞায় ধরা পড়বে না। ‘শাইনিং’ হয়ে ওঠার চক্করে চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কাছে টানতে গিয়ে সিপিএম যাঁদের বাতিল করেছিল, মমতা ঠিক তাঁদেরই নিজের মূল সমর্থক-ভিত্তি হিসাবে পেয়েছেন, এবং ধরে রেখেছেন। গত পনেরো বছরে তাঁর রাজনীতি, এবং সরকারের উন্নয়ন-নীতির অভিমুখ থেকে এই জনগোষ্ঠী সরেনি।
সেই অনুগত, নিশ্চিত কিন্তু হেলাফেলার ভোটব্যাঙ্ক বেদখল করে নেওয়ায় মমতার প্রতি বামপন্থীদের একটি অকৃত্রিম রাগ রয়েছে। তার তীব্রতা এমনই যে, দলের বড়-মেজো নেতারা এখনও বিজেপির বিদ্বেষী হিন্দুত্বকে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ বলে চিহ্নিত করতে পারেন না; আর, বাম ভোট চুপচাপ রামে চলে যায়। বিজেপির সে রাগ নেই, কিন্তু এখনও এই ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ভাঙন ধরাতে না-পারার হতাশা বিলক্ষণ রয়েছে। ফলে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে দু’পক্ষের রাজনৈতিক আক্রমণই শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় একটি বিন্দুতে— যার মোদ্দা কথা হল, তুলনায় অবস্থাপন্নদের বঞ্চিত করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার খয়রাতি করে চলেছে। সরকারি কর্মীদের ডিএ দেওয়ার বদলে লক্ষ্মীর ভান্ডারে বরাদ্দ বাড়ছে; শিল্পায়নে মন না দিয়ে সরকার বেকার ভাতা দিচ্ছে; সরকারি ঋণের পরিমাণ লাগামছাড়া হয়ে রাজ্যের অর্থনীতি গোল্লায় যাচ্ছে। বিজেপি এই প্রচারে মন ঢেলে দিলে অবাক হওয়ার কারণ থাকে না; কিন্তু ক’দিন আগে অবধিও যে বামপন্থীরা লক্ষ্মীর ভান্ডারকে ‘ভিক্ষা’ হিসাবে চিহ্নিত করছিলেন, শুধু সেটুকুই বলে দেয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আজও ধর্ম বা জাতপাতের চেয়ে বেশি বিভাজিত শ্রেণির অক্ষেই— শুধু ফারাক হল, আর্থিক ভাবে প্রান্তিক মানুষের পাশে থাকার বয়ানটি আর বামপন্থীদের দখলে নেই, জনবাদী রাজনীতি তাকে নিজের ছাঁচে ফেলে গড়ে নিয়েছে। এবং, তার ফলেই তৈরি হয়েছে শ্রেণির বিবিধ অক্ষ, প্রচলিত বাম রাজনীতি দিয়ে যাকে ধরা এবং বোঝা অসম্ভব।
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য ভাল, এমন দাবি করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু, তা একেবারে গোল্লায় গিয়েছে, এমন কথাও একই রকম অ-কারণ। অর্থনীতি নিয়ে বয়ান তৈরির একটা মস্ত সুবিধা, বিষয়টা অধিকাংশ মানুষেরই আয়ত্তের বাইরে— ফলে, কোন দল অর্থনীতি নিয়ে কোন কারণে নিজস্ব বয়ান তৈরি করছে, তা বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন। যে কথা হাওয়ায় ভাসতে থাকে, মানুষ ক্রমে তাতেই বিশ্বাস করে। পশ্চিমবঙ্গ ঋণে নিমজ্জিত, এবং সেটাই তার সর্বনাশের কারণ, এমন অবস্থানের পিছনেও রাজনীতি রয়েছে। সরকারি ব্যয়ের অভিমুখ ‘শাইনিং’ রাজ্য গড়ার বদলে গরিবের দিকে— ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির এই রাজনীতিই রাজ্যের অর্থনৈতিক সর্বনাশের বয়ান তৈরি করেছে। সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার চেয়ে কোনও দরিদ্র মহিলাকে লক্ষ্মীর ভান্ডার দেওয়ার পক্ষে আর্থিক এবং নৈতিক যুক্তি বেশি জোরদার, এ কথাটি এই রাজনীতি স্বীকারই করে না। আর্থিক সর্বনাশের যুক্তি ব্যবহার করার সময় তাই তার শ্রেণিচরিত্র সম্বন্ধে সচেতন থাকা ভাল।
কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হওয়ায় বিজেপি পাশাপাশি আরও একটি কাজ করতে পেরেছে। গরিব মানুষ যে সব সরকারি প্রকল্পের উপরে নির্ভরশীল, একেবারে কাঠামোগত ভাবে পশ্চিমবঙ্গকে সে সব খাতে বঞ্চিত করেছে। একশো দিনের কাজ প্রকল্পের টাকা বন্ধ হয়েছে; জল জীবন মিশন ও সমগ্র শিক্ষা মিশনের মতো প্রকল্পেও পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্তি তার জনসংখ্যার অনুপাতে ঢের কম। অর্থাৎ, যে জনগোষ্ঠী ভোট দেয় না, তাদের জন্য কেন্দ্রের টাকাও আসে না। রাজ্যের স্বার্থেই বামপন্থীদের উচিত ছিল এই বঞ্চনার প্রতিবাদ করা। কিন্তু, তাঁরা নিজেদের জন্য শ্রেণি-রাজনীতির যে অবস্থান বেছে নিয়েছেন, তা তাঁদের এই প্রতিবাদ করতে দেয়নি। কারণ, প্রকল্পের টাকা আটকে থাকায় ক্ষতি হয়েছে গরিব মানুষের, ‘ভদ্রলোক’-এর নয়।
বর্ণহিন্দু ভদ্রলোকের কাছে মুসলমানও অপর, আবার অশিক্ষিত গরিব নিম্নবর্ণের হিন্দুও অপর। মমতার রাজনীতি তাই ভদ্রলোক-সেন্সিবিলিটির বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আছে। ‘ভদ্রলোকের রাগ’ বস্তুটি শেষ পর্যন্ত কী মারাত্মক পরিণতিতে পৌঁছতে পারে, দেশভাগের সময় বাংলা তা প্রত্যক্ষ করেছিল। তার পরের আট দশকে সেই রাগ রাজ্য-রাজনীতিতে আর কখনও এত প্রকট হয়ে ওঠেনি। শ্রেণি-রাজনীতির এই অধ্যায়টি শেষ অবধি নির্ণায়ক হবে কি?
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে