গত দু’দশকে সমাজমাধ্যম বিশ্ব জুড়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। শুরুতে মনে হয়েছিল, এই মাধ্যম সব সীমানা মুছে পৃথিবীকে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বানাবে। কিন্তু কালে কালে সেই স্বপ্ন অতি বিচিত্র ও জটিল রূপ নিয়েছে। জটিলতা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘আস্থার অবক্ষয়’।
সময়ের সঙ্গে নানা ভাবে এই আস্থাহীনতার জন্ম হয়েছে। সমাজমাধ্যমে সাম্প্রতিক উপদ্রব— ‘এআই স্লপ’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি অতি-আবেগপ্রবণ ছবি বা অর্থহীন ভিডিয়ো ইন্টারনেট ছেয়ে ফেলেছে। মৌলিকতার ধার না-ধারা এই সব ডিজিটাল আবর্জনার প্রধান উদ্দেশ্য সহজে ‘ভিউ’, ‘লাইক’ কামানো। ফলে সমাজমাধ্যমে যখন কোনও বাস্তব অভিজ্ঞতা বা গঠনমূলক চিন্তা কেউ খুঁজতে চাইছেন, তখন তাঁদের এমন অগুনতি পোস্টের জঞ্জাল ডিঙিয়ে যেতে হয়। এই নিরন্তর লড়াইয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘ডিজিটাল ক্লান্তি’ তৈরি হয়। সঙ্গে জুড়েছে ‘ডিপফেক’-এর উপদ্রব। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ডিপফেক’ এখন হুমকি স্বরূপ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কারও কণ্ঠস্বর বা চেহারা হুবহু নকল করে ভিডিয়ো তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ‘ডিপফেক’ দিয়ে মিথ্যেকে সত্যি বলে চালানোর উদাহরণ অজস্র। উল্টোটা, অর্থাৎ সত্যিকে মিথ্যে বলে চালানোর প্রবণতাও বাড়ছে। একে বলা হচ্ছে ‘লায়ার’স ডিভিডেন্ড’। আমেরিকার দুই গবেষক রবার্ট চেসনি এবং ড্যানিয়েল সিট্রন এই ‘লায়ার’স ডিভিডেন্ড’ ধারণার প্রবর্তক। প্রায় যে কোনও ভিডিয়ো অথবা অডিয়ো এখন এআই দিয়ে জাল করা সম্ভব। কিন্তু আসল অপরাধীরাও তাদের বিরুদ্ধে থাকা অকাট্য তথ্য-প্রমাণকে ‘এআই দিয়ে তৈরি’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে সত্যি-মিথ্যের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে সামাজিক আস্থার ভিতও দুর্বল হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি বিপজ্জনক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সঙ্কটের সঙ্কেত দেয় বলে গবেষকদের ধারণা।
এরই সঙ্গে ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশা পৌঁছেছে বিপজ্জনক স্তরে। সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরাট অংশ যেন তেন প্রকারেণ ‘বিষয়’ তৈরি করে ভিউ, লাইক কুড়োনোয় এতটাই মনোযোগী যে, ঠিক-ভুলের সীমারেখা তাঁদের মন থেকে মুছে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, এ হল অসুস্থতার নামান্তর। উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিষয়স্রষ্টাদের মধ্যে অন্যান্য ‘কনটেন্ট’ বানানোর পাশাপাশি ‘ডিজ়াস্টার টুরিজ়ম’-এরও (বিপর্যয় পর্যটন) প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা দুর্ঘটনার এলাকায় গিয়ে ‘রিল’ বা ভিডিয়ো তৈরি করছেন তাঁরা। হিমাচল প্রদেশ, সিকিমের মতো এলাকায় আইনকানুনকে স্রেফ অগ্রাহ্য করে, স্থানীয় সংস্কৃতির কথা না ভেবে, এই রিল বানানোর প্রবণতা এখনকার ডিজিটাল সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিক। আনন্দপুরে মোমোর গুদামে অগ্নিকাণ্ড এবং মৃত্যুতেও আমরা এই প্রবণতা দেখেছি। আগে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে দুর্ঘটনাগ্রস্তদের উদ্ধারের জন্য উপস্থিত মানুষরা তৎপর হতেন। এখন ঘটনার ভিডিয়ো কখন সমাজমাধ্যমে দেবেন, তাই নিয়েই চূড়ান্ত আগ্রহ। এই ‘ডিজিটাল হুলিগানিজ়ম’ বাস্তব জীবনের শান্তি-শৃঙ্খলাকেও বিঘ্নিত করছে।
সমাজমাধ্যমের অ্যালগরিদমের নকশা এমন ভাবে তৈরি করা হচ্ছে যা মানুষের নেতিবাচক পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। রাগ, ঘৃণা বা ভয় ছড়ায়— এমন বিষয় বেশি শেয়ার করা হচ্ছে। আর মানুষ কেবল তার নিজের পছন্দের কথাই শুনছে— ইকো-চেম্বারে বন্দি দশা। অন্য পক্ষের যুক্তি শোনার বা বোঝার ক্ষমতা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক খবর বা ভিডিয়ো দেখার ফলে মানুষের মধ্যে ‘ডুমস্ক্রোলিং’-এর প্রবণতা বাড়ছে। ‘ডুমস্ক্রোলিং’ শব্দটি ২০২০-তে, কোভিড কালে সামনে আসে। সেই সময় মানুষ ক্রমাগত ফোন, টেলিভিশনে নেতিবাচক খবর পাচ্ছিলেন। গবেষকরা দেখেছেন, এই ধরনের তথ্য সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল। এক জন সম্পূর্ণ সুস্থ ও ইতিবাচক মানুষও ক্রমাগত মৃত্যুর কথা শুনে হতাশ হয়ে পড়েন। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া শুধু ডুমস্ক্রোলিং করলে তা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা গ্রাস করতে পারে। আমেরিকার ভারমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ প্রাইস এবং তাঁর সহগবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ডুমস্ক্রোলিং-এর সময় প্রতিটি নেতিবাচক তথ্য মানুষের উদ্বেগের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায়। এমারেল্ড পাবলিশিং-এর সমীক্ষা বলছে, এই ধরনের ডিজিটাল অভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলে। দেখা যাচ্ছে, এই ডিজিটাল অরাজকতার থেকে বাঁচতে অনেকেই বড় প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ছোট ‘কমিউনিটি’র দিকে ঝুঁকছেন। ওয়টস্যাপ, ডিসকর্ড-এর মতো অ্যাপকে তথ্য আদানপ্রদানে বেশি বিশ্বাস করছেন।
এই পরিস্থিতিতে বাস্তবতা বুঝে ডিজিটাল সাক্ষরতাকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ করার সময় এসেছে। পড়ুয়াদের শেখানো দরকার এআই-এর যুগে কী ভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হয়। কেমন করে চোখকান খোলা রেখে ঘটনার বিশ্লেষণ করতে হয়। সমাজমাধ্যম আজ এক সন্ধিক্ষণে। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ যেমন অসীম সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনই সঙ্গে তৈরি করেছে আস্থার সঙ্কট। ডিজিটাল জগতের এই বিশৃঙ্খলা কাটানো যাবে কি না, ভবিষ্যৎ বলবে। চেষ্টা জারি থাক। প্রয়োজন আরও বেশি মানবিকতা, স্বচ্ছতা এবং তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে