Pollution

দূষণের সমাধান কোন পথে

স্বাস্থ্য-ঝুঁকি শুধু বায়ুতেই সীমাবদ্ধ নয়। হুগলি নদীর ‘টার্বিডিটি’ বা ঘোলাটে ভাব বৃদ্ধি জল শোধনাগারগুলির কার্যকারিতা ব্যাহত করছে। ফলে পানীয় জলের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে।

অমিতাভ সরকার

শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৯
Share:

কলকাতা শহরের বাতাস যে আর নিছক পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন— এই উপলব্ধিই সাম্প্রতিক স্বতঃপ্রণোদিত মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের হস্তক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। রেস্পায়ারার লিভিং সায়েন্সেস-এর ‘টুওয়ার্ডস ক্লিয়ার স্কাইজ় ২০২৫’ রিপোর্ট জানাচ্ছে, পিএম ২.৫-এর দীর্ঘমেয়াদি সান্নিধ্য কলকাতায় শ্বাসরোগ, হৃদ্‌রোগ এবং শিশুদের ফুসফুসের বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। গবেষণা সংস্থা ‘দি এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট’ (টেরি)-এর ‘এয়ার পলিউশন এমিশন ইনভেন্টরিজ়’ অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ বায়ুদূষণ আসে যানবাহন ও শিল্পক্ষেত্র থেকে। আরও উদ্বেগজনক হল, গবেষণায় দেখা গিয়েছে পিএম ১০ ও নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড-এর সম্মিলিত প্রভাব শহরের অন্তত ২০-৩০ শতাংশ মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা তৈরি করেছে।

এই স্বাস্থ্য-ঝুঁকি শুধু বায়ুতেই সীমাবদ্ধ নয়। হুগলি নদীর ‘টার্বিডিটি’ বা ঘোলাটে ভাব বৃদ্ধি জল শোধনাগারগুলির কার্যকারিতা ব্যাহত করছে। ফলে পানীয় জলের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। শিল্প-বর্জ্যে ভূগর্ভস্থ জল দূষিত হচ্ছে, আর শহরে ৮০-৯০ ডেসিবেলের বেশি শব্দদূষণ মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ জানাচ্ছে, ভারতের বড় শহরগুলিতে কলকাতা-সহ দৈনিক মৃত্যুর ৭.২ শতাংশ পিএম ২.৫-এর দীর্ঘ সান্নিধ্যের সঙ্গে যুক্ত, যে পিএম ২.৫-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা বহু গুণ ছাড়িয়ে গিয়েছে। শীতকালে এই মাত্রা প্রায়ই ১০০ মাইক্রোগ্রাম/কিউবিক মিটার অতিক্রম করে। ফলে শহরের হাসপাতালগুলিতে শ্বাসজনিত রোগীর সংখ্যা গত কয়েক বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

গত পাঁচ বছরের ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ (একিউআই) বা বাতাসের গুণমান সূচকের পরিসংখ্যান আপাতদৃষ্টিতে কিছু উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও বাস্তব ঝুঁকি কমেনি। ২০১৯ সালে কলকাতার বার্ষিক গড় পিএম ২.৫ ছিল ৫৭.১ মাইক্রোগ্রাম/কিউবিক মিটার, যা ২০২৪-এ নেমে এসেছে ৪৪.৮-এ। কিন্তু এই উন্নতির আড়ালে রয়েছে এক কঠিন সত্য। প্রতি বছর ২২০ দিনেরও বেশি সময় শহরের বাতাস সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অ-নিরাপদ থেকেছে। শীতকালে একিউআই প্রায়ই ৩০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে।

এই দূষণের এক উপেক্ষিত উৎস— শহরের ভিতরে চলতে থাকা অনিয়ন্ত্রিত লোহা, ব্যাটারি ও পিতল পট্টি। অনিয়ন্ত্রিত স্ক্র্যাপ কাটাই ও শ্রেডিং থেকে প্রতি টন লোহার ছাঁটে ১-৫ কেজি পিএম ১০ ও পিএম ২.৫ নির্গত হয়। সঙ্গে সিসা, দস্তা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুও। নিয়ন্ত্রিত কারখানার তুলনায় এই খোলা ইউনিটে ৮০-৯০ শতাংশ বেশি ধুলো বাতাসে ছড়ায়। গ্যাস কাটার ও পেষাই মেশিনের শব্দ ৯০-১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছয়। ব্যাটারি পট্টিতে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ভাঙা ও গলানোর সময় প্রতি টনে ১০-৫০ গ্রাম শ্বাসযোগ্য সিসা-কণা নির্গত হয়। এর ফলে ১-২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে বসবাসকারীদের রক্তে সিসার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১০-১০০ গুণ বেড়ে যায় এবং শ্বাসজনিত রোগের হার ২০-৩০ শতাংশ বেশি হয়। উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় এই চিত্র আজও বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান। এগুলোকে শহরের প্রান্তে স্থানান্তর করে নিয়ন্ত্রিত ‘ক্লাস্টারিং’ বা গোষ্ঠীবদ্ধকরণ করলে অনেকটা সুরাহা সম্ভব।

পরিবহণ ব্যবস্থাও একটি বড় উৎস। এখনও শহরের বড় অংশ নির্ভর করে ডিজ়েলচালিত বাস, পুরনো ট্রাক ও অটোর উপর। যানজট, সিগন্যালহীন চলাচল ও অপরিকল্পিত রাস্তা নির্গমন বাড়ায়। গবেষণা বলছে, বর্তমান নীতি দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে পিএম ২.৫ ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের উল্লেখযোগ্য হ্রাস সম্ভব নয়। বিদ্যুৎচালিত পরিবহণ জরুরি। গণপরিবহণ শক্তিশালী করা, ট্রাম ফিরিয়ে আনা, নির্দিষ্ট বাস-লেন এবং হাঁটার পথ-সাইকেলবান্ধব নগরায়ণ অপরিহার্য। নির্মাণ সংক্রান্ত কার্যকলাপ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দূষণচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খোলা নির্মাণস্থল থেকে ধুলো, বালি ও সিমেন্টের কণা সরাসরি বাতাসে মিশছে, অথচ ধুলো ঢাকার পর্দা বা জল ছিটানোর ব্যবস্থা মানা হয় না। একই ভাবে, বর্জ্য পৃথকীকরণ ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকরণের অভাবের কারণেও দূষণ বাড়ছে। নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রে নির্মাণবিধি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে না আনলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান’ (জিআরএপি)-এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। এটি এমন এক কার্যপ্রণালী যা দূষণ চরমে পৌঁছনোর পর সক্রিয় হয়, আগাম প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। সাময়িক নিষেধাজ্ঞা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করতে পারে না। জিআরএপি দূষণের কাঠামোগত কারণ বদলাতে পারে না। দূষণকে উন্নয়নের বিপরীত হিসেবে দেখাই সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি। দূষণ কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি খারাপ নগর পরিকল্পনার ফল। যথার্থ পরিকল্পনা চাই। হাই কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের ফলে কি তা ঘটবে?

দ্য জেনিভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন