Global Warming Problems

এর পরে প্রত্যাবর্তন অসম্ভব

প্রমাণিত হয়েছে, গত ২৪০ কোটি বছরে পৃথিবী পাঁচটি হিমযুগ এবং অন্তর্বতী উষ্ণযুগের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে।

কল্যাণ রুদ্র

শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ ০৮:৫২
Share:

আমাদের সঙ্গে প্রকৃতি তর্ক করে না, আলোচনাও করে না। তবে ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। ফুলে-ফেঁপে ওঠা সাগরের জল, হিমবাহের সঙ্কোচন, হিমালয়ের ঢাল ভেঙে নেমে আসা ভয়ঙ্কর ভূমিধস, তীব্র দাবদাহ, দাবানল, খরা-বন্যা, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় এবং জীববৈচিত্রের অবক্ষয়— প্রকৃতির অশনিসঙ্কেত। বিংশ শতাব্দীর সূচনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৫ সালে প্যারিস সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন যে, ওই ভিত্তিমাত্রা থেকে উত্তাপ যদি আরও ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তবে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নানা ভাবে বিঘ্নিত হবে। কিন্তু আমরা সেই নির্ধারিত মাত্রার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছি। ২০২৫ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ভিত্তিমাত্রার তুলনায় ১.৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। মনে হচ্ছে, নির্ধারিত সীমা অতিক্রম অপ্রতিরোধ্য।

প্রমাণিত হয়েছে, গত ২৪০ কোটি বছরে পৃথিবী পাঁচটি হিমযুগ এবং অন্তর্বতী উষ্ণযুগের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু প্লেইস্টোসিন হিমযুগের অবসানের পর গত দশ হাজার বছর পৃথিবী আবহাওয়া ছিল মোটামুটি সহনশীল এবং এই স্থিতিশীলতা কৃষি সভ্যতা, স্থায়ী বসতি, শিল্পবিকাশ ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির অনুকূল ছিল। গত তিন শতাব্দীতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উন্নতির কারণে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক রূপ আমূল বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানুষের চাহিদা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অভূতপূর্ব অবক্ষয়।

২০০৯ সালে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে অধ্যাপক ওহান রকস্ট্রম ও তাঁর সহযোগী গবেষকরা বলেছিলেন, বাস্তুতন্ত্রে মানুষের নিরাপদ অবস্থান— জলবায়ুর পরিবর্তন, সাগরের অম্লতা, ওজ়োন স্তরের অবক্ষয়, নাইট্রোজেন-ফসফরাস চক্র, বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, বিশুদ্ধ জলের জোগান, ভূমি ব্যবহার, রাসায়নিক দূষণ এবং ভূ-জীববৈচিত্র— এই ন’টি ‘প্ল্যানেটারি লিমিট’-এর দ্বারা সীমায়িত। প্রকৃতি এই উপাদানগুলির ক্ষয়ক্ষতি কিছু দূর পর্যন্ত সামলে নেয়। গবেষকরা বলেছিলেন, মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের প্রভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন, নাইট্রোজেন-ফসফরাস চক্র এবং ভূ-জীববৈচিত্র তাদের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়েছে এবং ‘প্ল্যানেটারি লিমিট’ অতিক্রম করেছে। তবে পরবর্তী সময়ের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যাডভান্সেস পত্রিকায় প্রকাশিত অন্য এক নিবন্ধে অধ্যাপক ক্যাথরিন রিচার্ডসন, ওহান রকস্ট্রম ও সহযোগী গবেষকরা আবার বলেছেন— ইতিমধ্যে পরিবেশের কোনও উন্নতি হয়নি বরং জলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, অবৈজ্ঞানিক ভূমি ব্যবহার এবং রাসায়নিক দূষণ মানবজাতির পক্ষে নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উইলিয়াম জে রিপল এবং আরও সাত জন গবেষকের দ্য আর্থ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘দ্য রিস্ক অব আ হটহাউজ় আর্থ ট্র্যাজেকটরি’। আমাদের উদ্বেগ আরও গভীর করে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ১৮৮০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে উষ্ণতা বেড়েছিল প্রতি দশকে ০.০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে; ১৯৭০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ওই বৃদ্ধির হার ছিল ০.১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বেড়েছে ০.৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে। গত ২০ লক্ষ বছরের রেকর্ড ভেঙে বাতাসে ভাসমান কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা এখন ৪২২.৫ পিপিএম এবং গত ১.২৫ লক্ষ বছরের মধ্যে এই সময় উষ্ণতম। প্রতিটি বাস্তুতন্ত্রের উত্তাপ সহ্য করার একটি সর্বোচ্চ মাত্রা বা ‘টিপিং পয়েন্ট’ থাকে। এক বার নির্ধারিত মাত্রা বা টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করলে তার প্রভাব বহুমুখী। বিজ্ঞানীরা এমন ষোলোটি স্থান চিহ্নিত করেছেন, যার দশটি ক্ষেত্রে ‘টিপিং পয়েন্ট’ অতিক্রম করা মানে আরও উষ্ণ বলয়ে প্রবেশ করা। দুই মেরু প্রদেশ, হিমালয় ও অন্যান্য পর্বতে জমে থাকা হিমবাহের সঙ্কোচনের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কার্বন ও মিথেন মুক্ত হয়ে বাতাসে মিশছে, প্রতিফলিত সৌরশক্তির ঊর্ধ্বমুখী প্রত্যাবর্তন কমে যাওয়ার ফলে পৃথিবী আরও উষ্ণ হচ্ছে। কানাডা, সাইবেরিয়া এবং আলাস্কায় হাজার হাজার বছর ধরে জমে থাকা হিমায়িত মাটি বা ‘বোরিয়াল পার্মাফ্রস্ট’ ইতিমধ্যেই গলতে শুরু করেছে; আঘাত লেগেছে জীববৈচিত্রে।

উষ্ণায়নের প্রভাব পড়েছে সাগর-মহাসাগরেও। অতলান্তিক মহাসাগরে বহমান উত্তর ও দক্ষিণমুখী স্রোত পৃথিবীর উষ্ণতার ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, এই মহাসাগরীয় স্রোতের কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে ইউরোপের আবহাওয়া আরও শীতল হবে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে সাগরের জলস্তর দ্রুত ফুলে উঠবে এবং এশিয়া ও আফ্রিকার মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার ফলে শুখা এলাকার বিস্তৃতি বাড়বে। আরও উষ্ণ হয়ে উঠবে দক্ষিণ গোলার্ধ। বিপন্ন হবে আমাদের কৃষিব্যবস্থা ও খাদ্যসুরক্ষা।

হিমালয়ের হিমবাহ যে গলছে, সে কথা বহু আলোচিত। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভলপমেন্ট’ থেকে ২০২৬ সালে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, হিমালয়ের ৫৫,৭৮২ বর্গকিমি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে ৬৩,৭০০টি ছোট-বড় হিমবাহ, যেখান থেকে জন্ম হয়েছে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধু-সহ এশিয়ার দশটি প্রধান নদীর। ওই নদী অববাহিকায় বাস করেন প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। ১৯৯০-২০২০ সালের মধ্য হিমবাহ-আবৃত এলাকা ১২% কমেছে এবং ১৯৭৫ সাল থেকে এই সময় পর্যন্ত হিমবাহগুলির উপরিভাগ থেকে ২৭ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বরফ গলে গিয়েছে। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত হিমালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা তুষার চাদরে ঢেকে যায়। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীরা সারা বছর যত জল বয়ে আনে, তার ২৫% হল হিমবাহের তুষার-গলা জল। এপ্রিল-মে মাসে এই তুষার-গলা জল সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ও অন্য নদীদের বাঁচিয়ে রাখে। প্রকাশিত গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, হিমালয়ের তুষারাবৃত এলাকা ক্রমশ কমছে। ২০২৫ সালে গঙ্গা অববাহিকার উজানে ২৪% কম তুষারপাত হয়েছে, যা গত ২৩ বছরে নিম্নতম। সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় তুষারপাত কমেছে ২৮%। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন প্রধান নদীতে এপ্রিল-মে মাসে জল থাকবে না। একই হাল হবে ইরাবতী, সালউইন, মেকং, আমুদরিয়া, পীত, ইয়াংসি ইত্যাদি নদীর। জল ভাগাভাগি নিয়ে দেশে দেশে মতান্তর অবশ্যম্ভাবী।

আমাদের সুন্দরবনের উপকূলে সাগরের জল যে প্রতি বছর চার মিলিমিটার হারে ফুলে উঠছে এবং নবসঞ্চিত পলিস্তর প্রায় তিন মিলিমিটার হারে বসে যাচ্ছে, সে কথা জানা ছিল। কিন্তু আরও বড় এক বিপদ ঘনীভূত হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে— জলের উষ্ণতা ক্রমশ বাড়ছে, যা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অন্যতম কারণ। গত দুই দশকে সারা পৃথিবীতে ঘনীভূত ৭৫% বিধ্বংসী ক্রান্তীয় ঝড় তিন দিকে স্থলবেষ্টিত বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ৬৫টি ছোট-বড় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, যার মধ্যে ২৬টি তীব্র এবং একটি অতি বিধ্বংসী (সুপার সাইক্লোন) রূপ নিয়েছিল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’এর তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে দেখছি, বঙ্গোপসাগরের জলের উষ্ণতা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার ফলে ধেয়ে এসেছিল নার্গিস (২০০৮), ফাইলিন (২০১৩), ফণি (২০১৯), আমপান (২০২০) এবং মোচা (২০২৩)। মোট মৃত্যু হয়েছিল ১,৩৮,৭২২ জনের।

তবু এই সঙ্কটকালে পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রনায়করা উদাসীন। ইউক্রেন, ভেনেজ়ুয়েলা বা পশ্চিম এশিয়ার ঘটনা পরম্পরার মূল লক্ষ্য— জীবাশ্ম জ্বালানির উপর আধিপত্য বিস্তার। উল্লেখ্য, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে পঞ্চাশ লক্ষ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড বাতাসে মিশেছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা যে জতুগৃহে প্রবেশ করতে চলেছি, সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন মানুষের সময়-সারণিতে অসম্ভব।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন