প্রধানমন্ত্রী এক বছর অপ্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ করতে বললেন
Dollar-Money

ডলার খরচ কমাতে

বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আসলে এমন একটি বিপদসঙ্কেত দিলেন, যা ভারতের কোনও সরকার অতীতে কখনও দেয়নি— এমনকি ১৯৯১ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ও নয়।

বিশ্বজিৎ ধর

শেষ আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ ০৫:১৬
Share:

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে পেট্রলিয়াম পণ্যে খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ভোজ্যতেলের ব্যবহার কমানো, জরুরি নয় এমন সোনার গয়না কেনা অন্তত এক বছরের জন্য স্থগিত রাখা, অপ্রয়োজনীয় বিদেশযাত্রা এড়ানো এবং দেশীয় পণ্য কেনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে গণপরিবহণ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কোভিড-পর্বের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর মতো ব্যবস্থাও ফের চালুর কথা বলেছেন— যার মূল লক্ষ্য পেট্রল ও ডিজ়েলের ব্যবহার কমানো। প্রধানমন্ত্রীর এই সমস্ত আহ্বানের কেন্দ্রে রয়েছে একটিই বিষয়— দেশে বৈদেশিক মুদ্রার খরচ কমানো।

এই বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আসলে এমন একটি বিপদসঙ্কেত দিলেন, যা ভারতের কোনও সরকার অতীতে কখনও দেয়নি— এমনকি ১৯৯১ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ও নয়। তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার একশো কোটি ডলারেরও নীচে নেমে গিয়েছিল— মাত্র পনেরো দিনের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো সঞ্চয় ছিল হাতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ককে দেশের সোনার ভান্ডার বন্ধক রাখতে হয়েছিল ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড, ব্যাঙ্ক অব জাপান, এবং পরে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব সুইৎজ়ারল্যান্ডের কাছে, যাতে আন্তর্জাতিক ঋণখেলাপির পরিস্থিতি এড়ানো যায়। সেই সময়ও দেশের মানুষকে এই ভাবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমানোর জন্য প্রকাশ্যে আবেদন করতে হয়নি। এই কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের তাৎপর্য এত গভীর।

প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তার পিছনে সম্ভবত রয়েছে ভারতের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতির ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ৩৩,৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে— আগের বছরের তুলনায় যা ১৭ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি। আমদানি ৭ শতাংশ বেড়ে ৭৭,৫০০ কোটি ডলারের সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, অথচ রফতানি কার্যত স্থির থেকেছে ৪৪,১৭৩ কোটি ডলারে। অর্থাৎ, রফতানির স্থবিরতার বিপরীতে আমদানির লাগামহীন বৃদ্ধি বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। তার উপরে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের ইরান যুদ্ধের পরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যে ভাবে বেড়েছে, তার পুরো প্রভাব এখনও আমদানি পরিসংখ্যানে ধরা পড়েনি। আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারের অপরিশোধিত তেল মূল্যসূচক অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধি যখন পুরোপুরি ভারতের আমদানি ব্যয়ে প্রতিফলিত হবে, তখন পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। সম্ভবত সেই আশঙ্কা থেকেই প্রধানমন্ত্রী আগাম সতর্কবার্তা দিলেন।

অপরিশোধিত তেল বাদে ২০২৫-২৬ সালে ভারতের আমদানির বড় অংশ ছিল চারটি প্রধান পণ্য-শ্রেণি— সোনা (এবং রুপো); ভোজ্যতেল; সার; এবং ইলেকট্রনিক উপাদান। ৯,০০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের সোনা ও রুপো আমদানি করা হয়েছে, যা ভারতের মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ১২ শতাংশ— অপরিশোধিত তেল ও ইলেকট্রনিক পণ্যের পর এটিই তৃতীয় বৃহত্তম আমদানি খাত। রত্ন ও গয়নার মোট আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে সোনার আমদানি বেড়েছে ২৪ শতাংশ, এবং রুপোর আমদানি বেড়েছে কার্যত অবিশ্বাস্য ১৫০ শতাংশ। অথচ রত্ন ও গয়নার রফতানি ৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে। অর্থাৎ, এই বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ধাতুর বড় অংশ রফতানিমুখী উৎপাদনে ব্যবহার না-হয়ে দেশীয় বাজারেই বিক্রি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের উপর তার সরাসরি চাপ পড়েছে।

নতুন অর্থবর্ষেও সোনা আমদানির এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থামেনি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সোনা আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে— প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন, অর্থাৎ নাগরিকদের জরুরি নয় এমন সোনা কেনা স্থগিত রাখার আহ্বান, এবং গত সপ্তাহে সোনা ও রুপোর আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করে এই অস্বাভাবিক সোনা আমদানির প্রবণতাকে আদৌ থামানো যাবে কি? বাস্তবে সোনা আমদানি কমবে, সেই সম্ভাবনা খুব প্রবল নয়। কারণ, শেয়ার বাজারে ধারাবাহিক অস্থিরতা ছোট বিনিয়োগকারীদের সোনায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছে— বাহ্যিক ভাবে, এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ-এর মাধ্যমে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাহ্যিক সোনার উপরে আমদানি শুল্ক বাড়ার ফলে ইটিএফ-ভিত্তিক সোনায় ঝোঁক আরও বাড়বে। অর্থাৎ, বিনিয়োগের নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে সোনার আকর্ষণ এতটাই প্রবল যে, কেবল নীতিগত আবেদন বা শুল্ক বৃদ্ধি দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের উপরে ভারতের নির্ভরতা দেশের কৃষি নীতির অন্যতম হতাশাজনক দিক। ২০২৫-২৬ সালে ভোজ্যতেল আমদানি ১২ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে আমদানি-নির্ভরতা আরও গভীর হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে ভারতের মোট ভোজ্যতেলের চাহিদার ৫৬ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়েছে। অর্থাৎ, দেশের খাদ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক অংশ এখনও বহুলাংশে বিদেশি বাজারের উপরে নির্ভরশীল। অথচ তেলবীজ উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর পথ সরকার এখনও খুঁজে বার করতে পারেনি। ফলে এখন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নাগরিকদেরই কম ভোজ্যতেল ব্যবহার করতে বলছে সরকার। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় যে, উৎপাদন বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি নীতি ছাড়া শুধুমাত্র ভোজ্যতেল ব্যবহার কমানোর আহ্বান কতটা কার্যকর হবে।

সারের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সমান উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম লাগামছাড়া ভাবে বেড়ে যাওয়ায় এক দিকে যেমন আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্য দিকে সারের ভর্তুকির চাপও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ভারতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার ইউরিয়ার দাম এই সময়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। গত পাঁচ বছরে দেশের মোট চাহিদার ৩১ থেকে ৩৭ শতাংশ সার আমদানির মাধ্যমে মেটানো হলেও ২০২৫-২৬ সালে তা ৫০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে— কারণ, ইউরিয়া আমদানি ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের অভিঘাতে ভারতের সার আমদানি বাবদ খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ভোজ্যতেলের মতো এখানেও একই প্রশ্ন— দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার কেন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে পারল না?

প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করলেও, ২০২০ সালে চালু হওয়া আত্মনির্ভর ভারত অভিযান প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি— বিশেষ করে চিনের উপরে আমদানি-নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে। ছ’বছর পেরিয়ে গিয়েছে, বিপুল বাজেট বরাদ্দ হয়েছে প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিম-এর মাধ্যমে, তবু ইলেকট্রনিক উপাদান আমদানির উপরে ভারতের নির্ভরতা রয়ে গেছে অনেকখানি। গত অর্থবর্ষে এই খাতে আমদানি ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে আমদানি-নির্ভরতা কমাতে ব্যাটারির দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালে এই পণ্যের আমদানি ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তিগত ভাবে আরও উন্নত অর্থনীতির দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আত্মনির্ভরতার রাজনৈতিক স্লোগান এবং বাস্তব আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির মধ্যে এই ফারাক ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির ফলে আরও একটি বড় সমস্যার সম্ভাবনা রয়েছে— ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া ভারতীয় টাকার আরও পতন ঘটতে পারে। গত কয়েক মাস ধরে ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক নিজস্ব বিবেচনা অনুসারে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে, যাতে টাকার মূল্যে ধস না নামে। কিন্তু এই হস্তক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে।কারণ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার ২,১০০ কোটি ডলারেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। এই সঞ্চয় যদি আরও দ্রুত হারে কমতে থাকে, তা হলে তা অর্থনীতির পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন