মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বের স্বাধীনতম সংবাদমাধ্যমের করা কিছু প্রশ্ন কি আপনি গ্রহণ করবেন?” অসলোয় নরওয়ে-ভারত যৌথ প্রেস বিবৃতি শেষে মঞ্চ থেকে প্রস্থানের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে নরওয়ের এক সাংবাদিকের ছোড়া এই প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর মেলেনি। এই প্রতিক্রিয়া অভাবিত নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জনগণের সামনে যত স্বচ্ছন্দ, সাংবাদিক-সান্নিধ্যে বা সংবাদ সম্মেলনে যে তত নন, এ কথা তাঁর বারো বছরের শাসনকালে ভারতের নাগরিকদের জানা। সমস্যা হল, তাঁর শাসনকালে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বিশ্ব তালিকায় ভারতের সাম্প্রতিক র্যাঙ্কিংও আশাপ্রদ নয়। ১৮০টি দেশের মধ্যে নরওয়ে যেখানে শীর্ষস্থানে, ভারতের স্থান সেখানে ১৫৭, তার আগে ও পরে প্যালেস্টাইন ও ভেনেজ়ুয়েলার মতো অধিকৃত ও অংশত-অধিকৃত দুই রাষ্ট্র, এমনকি প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানও ভারতের চেয়ে এগিয়ে। এ-হেন পরিস্থিতিতে বিদেশের মাটিতে প্রধানমন্ত্রী না হোক, ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা অন্তত বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিয়ে মুখরক্ষা করবেন, এটুকু কাম্য ছিল। কিন্তু, ‘ভারতকে কেন নরওয়ে বিশ্বাস করবে’, এই প্রশ্নের উত্তরে যে কূটনৈতিক সূক্ষ্মতা প্রয়োজন ছিল তা পাওয়া গেল না। বিদেশের মাটিতে সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ তীব্র প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসতেই পারে, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধি-দল তা কী ভাবে সামলাবেন, সেই দক্ষতা শুধু জরুরিই নয়, অপরিহার্যও— কারণ তার সঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক স্তরে ভাবমূর্তির প্রশ্নটিও জড়িয়ে। অসলোয় সেই ভাবমূর্তিটি উজ্জ্বল হল কি?
ভারতে এই প্রশ্ন-কাণ্ডের যে অভিঘাত হয়েছে তাও অপ্রত্যাশিত বলা যাবে না, কেন্দ্রে শাসক দলের সমর্থককুল সমাজমাধ্যমে সেই বিদেশি সাংবাদিককে তুলোধোনা করেছেন। এই ছকটি পরিচিত, আজকের ভারতে বহুব্যবহৃতও বলা চলে, শাসকের দিকে প্রশ্নের আঙুল তুললে সাংবাদিক কেন, যে কোনও নাগরিককেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অথচ যে গণতন্ত্রের পীঠস্থান বলে ভারতকে বারংবার তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী ঘরে-বাইরে সামান্য সুযোগটুকুও হাতছাড়া করেন না, সেই গণতন্ত্র দাঁড়িয়েই আছে ‘প্রশ্ন করার অধিকার’-এর উপরে। সেই পরিসরে নাগরিক প্রতিনিধি হয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা— এবং, তাঁদের বহু প্রশ্নই রাজনীতিকদের মনের মতো হয় না। কিন্তু, প্রশ্ন পছন্দ হোক বা না-ই হোক, নির্বাচনী গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রত্যেক জনপ্রতিনিধি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এবং জনগণের কাছে উত্তর দিতে দায়বদ্ধ। সেই দায় ক্রমাগত এড়িয়ে গেলে ঘরে-বাইরে দু’জায়গাতেই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
যে কোনও অভ্যাসই উপরের স্তর থেকে নীচের দিকে নামে। সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে না-চাওয়া, অথবা না-পারাও যে সরকারের বিবিধ স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে, বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিনিধির উত্তরে সেই বার্তাই কি আসলে ছড়িয়ে পড়ল না? নরওয়ের সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা-যা বলেছেন, পরিস্থিতির নিরিখে তা অপ্রাসঙ্গিক: প্রশ্নের মধ্যে যদি ভারতে নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাহীনতার মতো অস্বস্তিকর প্রসঙ্গও এসে থাকে, তার উত্তরে কী বলা হবে সে অন্য প্রশ্ন, কিন্তু কী ভাবে বলা হবে তা আরও জরুরি। সেটাই কূটনীতি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে