ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ জয়ের একটি বিশেষ প্রভাব পড়তে চলেছে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর। বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে বারংবার উচ্চারিত হয়েছিল তাদের দু’টি লক্ষ্য: রাজ্যের সমাজ-অর্থনীতির ‘ভোল পাল্টানো’র সঙ্গে সঙ্গে অনুপ্রবেশ সঙ্কটের মীমাংসা ও সার্বিক ভাবে বাংলাদেশ সীমান্ত-সমস্যা সমাধান। রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর থেকেই ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের স্পষ্ট প্রভাব সীমান্ত কার্যক্রমে। দুই দেশের মোট প্রায় ৪০১৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই ২২১৯ কিলোমিটার, অথচ ১৬৫০ কিলোমিটার ছাড়া বাকি অংশে কাঁটাতার আজও দেওয়া যায়নি জমির অভাবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় এসে প্রথমেই এর জন্য বরাদ্দ জমি বিএসএফ-কে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এত দিন সীমান্তে অপরাধদমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ অনেকাংশে আটকে যেত রাজ্য সরকারের অধীন পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন বিএসএফ-এর বোঝাপড়া কিংবা সমন্বয়ের অভাবে। এ বার সেই সমন্বয় সহজ ও নিশ্চিত, ফলে ৪৫ দিনে কাঁটাতার প্রস্তুতে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা সাফল্যের মুখ দেখতেই পারে। সীমান্ত পারাপারের অবৈধ ধারা সম্পূর্ণত বন্ধ হওয়া জরুরি, যা ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে কখনওই নিশ্চিত করা যায়নি। প্রসঙ্গত, এনসিআরবি-র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশিদের মধ্যে এ দেশের অপরাধের শীর্ষে বাংলাদেশিরা। এই দিক থেকেও অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করা প্রথম আবশ্যিক ধাপ। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ তাতে সরাসরি যুক্ত।
এ দিকে বাংলাদেশও শ্যেন নজর রাখছে রাজ্যে বিজেপির কার্যক্রমের দিকে। ইতিমধ্যে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে পরিমাণ অশান্তি ও সঙ্কটের মধ্য দিয়ে গিয়েছে প্রতিবেশী দেশটি, তার অবধারিত প্রভাব পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গে, বৃহত্তর ভারতেও। দুই দেশের সম্পর্ক বাংলা সীমান্ত ঘিরে ক্রমশই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছিল। এখনকার পালাবদল সেই পরিবেশকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী রূপে শপথ নেওয়ার পর ঢাকা নতুন কিছু পদক্ষেপ করেছে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে— যার মধ্যে আংশিক ভাবে হলেও এই নতুন পরিস্থিতির প্রভাব অনুমেয়। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই বাংলাদেশের বিএনপি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে পাকিস্তান, চিন ও আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমোন্নতিশীল। তার মধ্যে গত সপ্তাহে আমেরিকার সঙ্গে ‘মউ’ স্বাক্ষরিত হল, যার মধ্যে প্রতিরক্ষার জায়গাটি গুরুতর। আমেরিকার রণতরী ও যুদ্ধবিমানের জন্য বাংলাদেশ তার ভূমি উন্মুক্ত করে দেবে, এবং বঙ্গোপসাগরের উপর একটি ধারাবাহিক নজরদারি অঞ্চলও তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঢাকা-ইসলামাবাদ চুক্তিও সম্পন্ন হতে চলেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কূটনীতির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে, কেননা তার উপর সরাসরি নির্ভর করবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত পরিস্থিতি।
এ ছাড়া, গঙ্গা জলচুক্তি ও তিস্তা চুক্তির উপরেও নির্ভর করবে দুই দেশের সম্পর্ক। প্রসঙ্গত, এর আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জলবণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের স্বার্থ তাতে বিঘ্নিত হবে। এ আশঙ্কা কত দূর সত্য, এবং সত্য হলে তার মীমাংসা কী ভাবে সম্ভব, নতুন বিজেপি সরকারকে তা স্থির করতে হবে। এমতাবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের সরকার ও নাগরিক সমাজ উভয়েরই স্মরণীয় যে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার সঙ্গে অহেতুক উস্কানি বন্ধ করাও একটি জরুরি দায়িত্ব। অনেক দশক পর সীমান্ত-সঙ্কট মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। হঠকারিতা কিংবা অকারণ উত্তেজনায় সেই সুযোগ যেন নষ্ট না হয়, দেখা দরকার।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে