মনস্তত্ত্বের একটি তত্ত্ব বলে, কারও আগ্রাসী আচরণ আসলে তার লুকোনো লজ্জা ও অপরাধবোধ ঢাকার একটা বর্ম, ‘ডিফেন্স মেকানিজ়ম’। ‘বন্দে মাতরম্’ গান নিয়ে ভারতশাসকেরা যে ভাবে উঠেপড়ে লেগেছেন তাতে ধন্দ জাগতে পারে, তাঁদের যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত পূর্বজরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কখনও যুক্ত ছিলেন না, স্বাধীনতা-পূর্বকালে কোনও দিন বন্দে মাতরম্ গান বা স্লোগান নিয়ে যাঁদের বাক বা উৎসাহের স্ফূর্তি দেখা যায়নি, বন্দে মাতরম্-এর দেড়শো পূর্তি ঘিরে তাঁদের উত্তরসূরিরা এমন খেপে উঠলেন কেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ, এখন থেকে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দু’টি নয়, মোট ছ’টি স্তবক গাইতে হবে; যে সব অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় গান দু’টিই গাওয়া হয় সেখানে ‘বন্দে মাতরম্’ গাইতে হবে ‘জনগণমন’-রও আগে; জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময়, ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপাল ও উপরাজ্যপালের আগমন ও প্রস্থানে, রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে ও পরে, কুচকাওয়াজে জাতীয় পতাকা নিয়ে আসার সময় তো বটেই, বিদ্যালয়ের কাজ শুরুর আগেও হবে ‘বন্দে মাতরম্’; সবাইকে উঠে দাঁড়াতে ও গলা মেলাতে হবে।
রাজার আদেশ মানতেই হবে, সে অন্য কথা। তবে এও সত্য: এতকাল জাতীয় গান হিসেবে শুধু প্রথম দু’টি স্তবক গীত হলেও ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে ভারতবাসীর শ্রদ্ধাভক্তি এতটুকু কম পড়েনি। হঠাৎ এমন কী দরকার পড়ল যে তাকে জাতীয় ও জনজীবনের একেবারে কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করতে হবে— এমনকি যে জাতীয় সঙ্গীত একটি দেশের জাতীয় আবেগের গীতমূর্তি, তারও আগে? বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত গানের দেড়শো বছর পূর্তি উদ্যাপন ও তার গৌরব প্রচারই এর কারণ, বিশ্বাস হয় না। গত ডিসেম্বরে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি ও সঙ্গত প্রতিবাদও হয়েছিল বটে, তবে সেই ঘটনাই ইঙ্গিত ছিল, শাসক দল বিজেপি বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ বা নেতাজির পরে এ বার বঙ্কিমচন্দ্রকে আত্মসাৎ করার দুশ্চেষ্টায় প্রস্তুত। উপরন্তু, বঙ্কিমের লেখা গান নানা কারণে আজ বিজেপির ‘কাজ’-এ লাগতে পারে: এক, এই গানে দেশকে দেবীরূপে কল্পনা তাদের ‘হিন্দু ভারত’-কল্পনার কাছাকাছি; দুই, যে উপন্যাসে এ গান বঙ্কিমচন্দ্র ব্যবহার করেছিলেন, সেখানে ব্রিটিশের পাশাপাশি মুসলমানকেও ‘শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরা আজ তাদের মেরুকরণের রাজনীতিতে বিলক্ষণ কাজে দেবে; তিন, একা হিন্দু নয়, মুসলমান খ্রিস্টান ব্রাহ্ম যে কোনও ধর্মাবলম্বীই যাতে শ্রদ্ধাভক্তি-সহ গাইতে পারেন, সেই বিশ্বাস থেকেই যে গানের প্রথম দু’টি স্তবককে সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় গান করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ২০২৬-এ এসে সে গানের পুরোটাই জাতীয় জীবনে বাধ্যতামূলক করে আসলে ভারতের অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসবোধকেই অমান্য ও বিকৃত করা হল।
‘বন্দে মাতরম্’ গানের জাতীয় গান হয়ে ওঠার যাত্রায় যাঁদের আলোচনা ও তর্ক মিশে আছে, সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরুদের ভাবনায় এই গোড়ার কথাটি স্পষ্ট ছিল— জাতীয় গান এমন হবে যা নিয়ে দেশের একটি মানুষও অস্বস্তিতে পড়বেন না, কারও মনে আঘাত লাগবে না। আজকের ভারতশাসকেরা চাইছেন ঠিক তার উল্টো: মূর্তিরূপের ধারণাটি অবধি যাঁদের ধর্মতত্ত্বে নেই, তাঁদের দিয়ে ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী/ কমলা কমলদলবিহারিণী/ বাণী বিদ্যাদায়িনী’ জোর করে গাওয়াতে। গাওয়া হচ্ছে কি না, তার নজরদার লেঠেলরাও প্রকাশ্যে ও সমাজমাধ্যমে কোমর বাঁধছে নিশ্চয়ই। তবে অন্যকে গাইতে বাধ্য করার আগে বিজেপি-আরএসএস’এর নেতা-সমর্থককুলের ‘আপনি আচরি’র দৃষ্টান্ত স্থাপন বাঞ্ছনীয়— তিন মিনিট দশ সেকেন্ড একটানা, নির্ভুল ভাবে গোটা ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া, ‘দ্বিসপ্তকোটীভুজৈর্ধৃত খরকরবালে’ ইত্যাদি সমেত। বাকি ভারতবাসীর গাইবার ভার তাঁরা নিজেরাই বুঝে নেবেন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে