কলকাতা পুরসভা নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ভাবে না— এমন দুর্নাম দেওয়া চলে না। তাঁরা অনেক কিছুই ভাবেন, নানা সময়ে হরেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণাও করেন— সবই নাগরিক স্বার্থে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের সেই ভাবনাচিন্তার পরিণাম টের পেতে নাগরিকদের বহু সময় লেগে যায়, অথবা তাঁরা বুঝে উঠতেই পারেন না— পরিবর্তনটি ঠিক কোন দিক দিয়ে এল। এর জ্বলন্ত উদাহরণ কলকাতার বহু জায়গার ভাঙা রাস্তা। নাগরিক অভিজ্ঞতা বলে, পুজোর আগে, ভোটের আগে নিয়ম মেনে রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলে, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার একাংশ বন্ধ রেখে, গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পূর্ত দফতর যে জোরকদমে কাজ করছে— নাগরিকরা বিবিধ অসুবিধা সহ্য করে তা প্রত্যক্ষও করেন। কিন্তু সময় গড়ালেই রাস্তার হাঁ-করা দশাটি পূর্ত দফতরের কাজকেই ব্যঙ্গ করতে থাকে। সে সব সামলাতে এ বার কিছু অন্য উপায় ভাবা হয়েছে। পূর্ত দফতরের জারি করা নির্দেশিকায় পিচের আস্তরণ বসানোর ক্ষেত্রে দু’ধরনের পদ্ধতি অনুমোদন করা হয়েছে। যেমন— রাস্তার ভিতরের স্তরের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পিচ দেওয়ার সময় তার তিনটি স্তর— বেস কোর্স, সাব-বেস বা সাব-গ্রেডের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা যাবে না। যে-হেতু এই ভিতরের স্তরটিই রাস্তার মূল ভারটিকে ধরে রাখে, তাই তাকে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে প্রস্তুত করা জরুরি। আরও বলা হয়েছে, আলগা ফাঁকফোকর থাকা স্তর ব্যবহার না করার কথা। কলকাতার মতো শহরে, যেখানে বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক নিয়ম, সেখানে ভিতরের স্তরে জল ঢুকে রাস্তা বসে যাওয়া আটকানোর ভাবনাটিও ইতিবাচক। কিন্তু অচিরেই তার সুফল মিলবে, অভিজ্ঞতা তেমন সাক্ষ্য দেয় না।
ভাঙা রাস্তা নাগরিক যন্ত্রণার কারণ। গর্তবোঝাই পথকে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টাটিও ভয়ঙ্কর। এতে রাস্তা অসমান হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে। কলকাতার মতো সঙ্কীর্ণ ও জনবহুল শহরে দীর্ঘ সময় রাস্তার একাংশ বন্ধ রাখলে যানজট প্রবল হয়। এতে শুধু মূল্যবান সময় নষ্ট হয় না, গাড়ির গতি থমকালে তা থেকে দূষণের সম্ভাবনাও বাড়ে অনেক গুণ। রাস্তার গর্তে বৃষ্টির জল জমে পতঙ্গবাহিত রোগ সংক্রমণের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। চলতি বছরের শুরু থেকে শহরের প্রায় ১১২টি রাস্তায় সংস্কারের কাজ চলছে। যে কাজ ধাপে ধাপে সারা বছর জুড়ে করার কথা, তাকে এক সঙ্গে করতে গেলে হয়রানি বাড়বেই। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ— সেই দশাই প্রকট। অবশ্য নির্বাচন-সম্মুখে এই তৎপরতার কারণটি সহজবোধ্য। আপাতত হয়রানি সহ্য করাই সু-নাগরিকের দায়িত্ব— পুরকর্তাদের মনোভাব অনেকটা এমনই।
বহুব্যয়ে নির্মিত রাস্তা কিছু দিন অন্তর ভেঙে গেলে তার সারাই করতে যে পরিমাণ খরচ হয়, তার অনেকটাই সাশ্রয় হবে, যদি রাস্তা দীর্ঘ সময় ভাল অবস্থায় থাকে। কিন্তু, রাস্তা নির্মাণ, ফের তা ভেঙে যাওয়া, তাকে মেরামত করা— এ সব বার বার হতে থাকলে বরাদ্দ টাকা নয়ছয়ের সম্ভাবনাটিও প্রভূত বৃদ্ধি পায়। তৃণমূল শাসনের গোড়ায় রাস্তাঘাট উন্নত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। শহর জুড়ে রাস্তার হাল ফেরানো হয়েছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে। সে সব আপাতত অতীত। রাস্তার কঙ্কালের সঙ্গে বাম আমলের পুরাতন ঘুঘুর বাসাটিও স্বমহিমায় বেরিয়ে পড়েছে। সেই বাসা না-ভাঙলে শতেক বৈজ্ঞানিক পন্থাও জলে যাবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে