—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
কেলি নামক ২০ বছর বয়সি তরুণীকে ৬০ লক্ষ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালত। অভিযুক্ত পক্ষ হল মেটা এবং গুগল— যথাক্রমে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ওয়টস্যাপ, এবং ইউটিউবের চালক সংস্থা। কেলির অভিযোগকে স্বীকৃতি দিয়ে আদালত জানিয়েছে, সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলি তাদের অ্যাপগুলিকে এমন ভাবেই তৈরি করে, যাতে তা নেশায় পরিণত হয়। কেলিকে নেশাগ্রস্ত করা, এবং শেষ অবধি অবসাদের শিকার করে তোলার ‘অপরাধ’-এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। মেটা এবং গুগল অবশ্যই এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে যাবে— কিন্তু, সমাজমাধ্যমের সঙ্গে সমাজের সম্পর্কের পরিসরে এই রায়কে ইতিহাস সম্ভবত একটি মাইলফলক হিসাবে চিনবে। দুনিয়া জুড়েই সমাজমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে তোলপাড় চলছে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই জাতীয় অ্যাপের ব্যবহার কোথাও নিষিদ্ধ হয়েছে, কোথাও আবার অ্যাপ ব্যবহারের বিধি তৈরি করার কথাও ভাবা হচ্ছে। অত্যধিক সমাজমাধ্যম ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, এই কথাটি মেনে নিলেও অবশ্য একটা প্রশ্ন তোলা যায়— অপ্রাপ্তবয়স্করা যদি বা এই ক্ষতির স্বরূপ বুঝতে না-ও পারে, প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক কেন তা বুঝবেন না? নিজের ক্ষতি হচ্ছে জেনেও তাঁরা যদি এই অ্যাপ ব্যবহার করতে থাকেন, তা হলে সেই সিদ্ধান্তের দায়ও কি তাঁদেরই নয়? তার জন্য যদি সংস্থাগুলিকে বিপুল আর্থিক শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়, বা কোনও দেশে যদি এই সংস্থাগুলির ব্যবসার উপরে বাধানিষেধ আরোপিত হয়, তবে কি তা উদারবাদী স্বাধীন বাজারের শর্তকে লঙ্ঘন করে না? নাগরিককে ‘চির-অপ্রাপ্তবয়স্ক’, এবং বাজারকে সর্বদাই নিয়ন্ত্রণের অধীন ভাবার অভ্যাসটি রাষ্ট্রের বহু পুরনো। তাকে আরও উস্কানি দেওয়ার ফল কী হবে, সেটাও ভাবা জরুরি।
তবে কিনা, এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, বাজারের সার্বভৌমত্বের যুক্তিটি নেশার দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ইচ্ছা হলেও তাঁকে হেরোয়িন বা গাঁজা-চরসের নেশা করার অনুমতি দিতে পারে না রাষ্ট্র, এবং এই জাতীয় পণ্যকে খোলা বাজারে বেচতে দেওয়া যায় না। সমাজমাধ্যম অ্যাপগুলিকে সচেতন ভাবেই তৈরি করা হয়েছে নেশার দ্রব্য হিসাবে। মাদক মস্তিষ্কের যে ‘রিওয়ার্ড পাথওয়ে’ ব্যবহার করে কাজ করে, সমাজমাধ্যমও ঠিক সে পথটিই ব্যবহার করে। ডোপামিন ক্ষরণের মাধ্যমে নেশার চাহিদা তৈরি করে, এবং ক্রমাগত তাকে বাড়িয়েই যায়। এই কথাটি তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র থেকে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা— সব ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরাই কার্যত এক কথায় স্বীকার করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতের রায় কথাটিকে আইনি, অতএব রাষ্ট্রীয়, স্বীকৃতি দিল। সমাজমাধ্যমকে অতঃপর পরিচিত নেশার দ্রব্য হিসাবে দেখাই বিধেয়। মাদক না হোক, অন্তত তামাকের মতো নেশা— রাষ্ট্র যাকে নিষিদ্ধ করে না, কিন্তু যার কুপ্রভাব সম্পর্কে জনগণকে অভিহিত করতে থাকে, নেশার সামাজিক বৈধতা নষ্ট করে। আজকের দুনিয়ায় সমাজমাধ্যম অ্যাপকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা অর্থহীন— খোলা বাজারে না মিললেও চোরাপথে তার জোগান অব্যাহতই থাকবে। তার বদলে, এই অ্যাপগুলির বিপদের কথা বারে বারে প্রচার করা যেমন জরুরি, তেমনই সংস্থাগুলিকেও নেশার উপাদান কমাতে বাধ্য করা বিধেয়। কড়া পদক্ষেপ ছাড়া এই বিপদের সঙ্গে লড়া অসম্ভব। ক্যালিফোর্নিয়ার আদালত সে পথটি দেখাল।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে