Coronavirus

দুই সংস্কৃতি

কালক্রমে ইংল্যান্ডের ব্যাধি আমেরিকাকেও গ্রাস করিয়াছে। ব্যাধির মূলে কলাবিদ্যারই এক শাখা, পোস্টমডার্নিজ়ম বা উত্তর-আধুনিকতাবাদ।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২০ ০০:২১
Share:

প্রতীকী ছবি

কোভিড-১৯’এর অভিশাপ সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করিয়াছে। এই সময় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় বিজ্ঞানী যে পদক্ষেপ করিয়াছেন, তাহা সাধুবাদের যোগ্য। তাঁহাদের মনে হইয়াছে, মানুষের মনে বিজ্ঞানের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাভক্তি আছে, উহা যাচাই করিবার ইহাই প্রকৃষ্ট সময়। ভাইরাসটির সহিত যুদ্ধে বিজ্ঞানীগণ কী ভাবে প্রাণপাত পরিশ্রম করিতেছেন তাহা কাহারও অবিদিত নাই। এই সময়েই উক্ত বিজ্ঞানীগণ জনমত সমীক্ষায় নামিয়াছিলেন। ৩৩৭ জন মার্কিন নাগরিক ওই সমীক্ষায় যোগদান করেন। কোভিড-১৯ মানুষের মনে বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা বাড়াইল কি না, বাড়াইলে পূর্বের তুলনায় কতটা বাড়াইল, তাহা নিরূপণ করাই বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য ছিল। গত বৎসর অগস্ট মাসে কৃত সমীক্ষার সহিত এখনকার সমীক্ষার ফলাফলের তুলনা করিয়া দেখা গিয়াছে, বিজ্ঞানে আস্থা ৪১ হইতে ৪৮ শতাংশে পৌঁছাইয়াছে। জনমানসে বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা বা শ্রদ্ধা প্রসঙ্গে দুইটি ঘটনা মনে পড়িয়া যাওয়া স্বাভাবিক।

Advertisement

ইংরাজ পণ্ডিত চার্লস পার্সি স্নো প্রয়াত হইয়াছেন ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে। মৃত্যু চার দশক পূর্বে ঘটিলেও, স্নো-এর খ্যাতি কিছুমাত্র কমে নাই। জীবিতকালে পেশায় আমলা এবং নেশায় রাজনীতিক হইলেও, স্নো মূলত ছিলেন ঔপন্যাসিক। তথাপি এ কথা সত্য যে, স্নো-এর খ্যাতির কারণ তাঁহার সাহিত্য নহে, তাঁহার প্রদত্ত এক ভাষণ। ১৯৫৯ সালে তিনি আহূত হন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বিখ্যাত ‘রিড লেকচার’ দিবার জন্য। বহু পণ্ডিত নানা বিষয়ে উক্ত ভাষণ দিয়া চিন্তাজগতে দাগ কাটিয়াছেন। বিজ্ঞানী স্টিফেন উইলিয়াম হকিং ২০১৬ সালে ওই বক্তৃতায় তাঁহার জীবনের প্রধান গবেষণা কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে বলিয়াছিলেন। ১৯৫৯ সালে স্নো প্রদত্ত উক্ত ভাষণের শিরোনাম ছিল, ‘দ্য টু কালচার্স অ্যান্ড দ্য সায়েন্টিফিক রেভলিউশন’। বক্তৃতাটি হইতে ইংরাজি ভাষা নূতন শব্দবন্ধ লাভ করে: ‘টু কালচার্স’। বক্তৃতাটিতে স্নো যাহা আলোচনা করিয়াছিলেন, তাহা হইল দ্বিবিধ সংস্কৃতি— বিজ্ঞান এবং কলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে ব্রিটিশ সমাজের পশ্চাৎপদতা ব্যাখ্যা করিতে গিয়া স্নো যে উৎসটি অনুসন্ধান করেন, তাহা উক্ত দুই সংস্কৃতির ব্যবধান। জ্ঞানার্জনের দুই মাধ্যম বিজ্ঞান এবং কলা। তথাপি স্নো ইহা দেখিয়া পীড়িত হইয়াছিলেন যে, ব্রিটিশ সমাজে ওই দুই সংস্কৃতির কোনও রকম আদানপ্রদান নাই। দুই সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত পণ্ডিতরা একে অপরকে পরিহার করিয়া চলিতে পছন্দ করেন। স্নো তাঁহার ভাষণে ইহাও ইঙ্গিত করেন যে, ব্রিটিশ সমাজে কলাবিদ্যায় বিশেষজ্ঞরাই কেবল পণ্ডিত বলিয়া গণ্য হন, বিজ্ঞানীরা নহেন। বিজ্ঞানী— এবং বিজ্ঞান গবেষণা— এ হেন অধম অপ্রধান গণ্য হইলে, প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতায় অগ্রগতি অসম্ভব। স্নো আমেরিকার প্রশংসা করিয়া বলেন, তথায় দ্বিবিধ সংস্কৃতি ব্রিটিশ সমাজের ন্যায় প্রকট নহে।

কালক্রমে ইংল্যান্ডের ব্যাধি আমেরিকাকেও গ্রাস করিয়াছে। ব্যাধির মূলে কলাবিদ্যারই এক শাখা, পোস্টমডার্নিজ়ম বা উত্তর-আধুনিকতাবাদ। কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাহা ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। আধুনিকতা অপেক্ষা আধুনিক এই চিন্তাধারার মূল কথা, নূতন দৃষ্টিভঙ্গিতে সব কিছুর— ফলত বিজ্ঞানেরও— বিচার। পোস্টমডার্নিস্টগণ ইহাকে বিনির্মাণ আখ্যা দিয়া থাকেন। এ হেন বিনির্মাণের পাল্লায় পড়িয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সবিশেষ দুর্গতি। বিনির্মাণ প্রমাণে উদ্যত: ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে যে সব সত্য বিজ্ঞান আবিষ্কার করে, সে সব প্রকৃতই সত্য নহে, সামাজিক নির্মাণ মাত্র। পোস্টমডার্নিস্টদের এবংবিধ দাবিতে বিরক্ত হইয়া, তাঁহাদের শিক্ষা দিবার জন্য, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালান সোকাল ১৯৯৬ সালে এক চাল চালেন। উনি এক প্রবন্ধ রচনা করেন, যাহাতে পোস্টমডার্নিস্টদের দাবির সমর্থনে প্রচুর কথা এবং ফুটনোট থাকে। এমন সব কথাও থাকে, যাহা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভুল। অতঃপর সোকাল নিবন্ধটি প্রকাশের জন্য পোস্টমডার্নিস্টদিগের জার্নাল ‘সোশ্যাল টেক্সট’-এ প্রেরণ করেন। বিজ্ঞানের ভুল থাকা সত্ত্বেও জার্নাল প্রবন্ধটি ছাপে। তখন সোকাল আর এক জার্নাল ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’য় অন্য এক প্রবন্ধ প্রকাশ করিয়া, নিজ ধাপ্পা জনসমক্ষে আনেন। অধ্যাপকপ্রবর ইহা প্রমাণ করিয়া উল্লসিত হন যে, পোস্টমডার্নিস্টগণ বিজ্ঞান কিছুমাত্র না জানিয়া বিজ্ঞানের নিন্দা করিয়া থাকেন। পণ্ডিত বলিয়া যাঁহারা স্বীকৃত, তাঁহাদেরই যদি এই দশা হয়, সাধারণ মানুষের কথা না বলাই ভাল।

Advertisement

যৎকিঞ্চিত

একটু কীটনাশক নিয়ে, মধু গুলে খেলেই কোভিড-১৯ সেরে যাবে, আর বিজ্ঞানীরা কিনা হাতড়ে মরছেন। ট্রাম্পের মতো ক’জন পারেন, মৃত্যুমিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে নির্বোধ উক্তি শানাতে, তার পর সাফাই দিতে: রসিকতা করছিলাম! এটা ইয়ার্কির সময় নয়, বললে হয়তো স্বামী বিবেকামুন্ননের নয়া কোটেশন আবিষ্কার করে বসবেন! অবশ্য তার আগে কোনও হিন্দু ওস্তাদ চেঁচাতে পারেন, ঋগ্বেদে ‘করোনাঘাতী কীটনাশকম্’ লেখা ছিল, কেমনে ব্যাটা পেরেছে সেটা জানতে!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement