অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের দাম ব্যারেলপ্রতি চল্লিশ টাকার কাছাকাছি আসিয়া ঠেকিয়াছে। এই সুযোগে অরুণ জেটলি মুচকি হাসিতে পারেন। তাঁহার চলতি খাতায় ঘাটতি লইয়া চিন্তা আরও কিছু দিনের জন্য দূর হইল। শুধু সেইটুকুই নহে। বাজেটের সময় তাঁহারা ধরিয়া লইয়াছিলেন, অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের দাম গড়ে সত্তর ডলারের কাছাকাছি থাকিবে। তাহার পর ছয় মাস গড়াইয়াছে, পেট্রোলিয়ামের গড় দাম পঞ্চান্ন ডলারও ছাড়ায় নাই। বরং, তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদরের ন্যায় হড়কাইয়া নামিতেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে সব কারণে পেট্রোলিয়ামের দামের ওঠাপড়া চলে, সেগুলি দেখিলে অনুমান করা যায়, আগামী কিছু দিন দাম ৪০ ডলারের আশেপাশেই থাকিবে। অর্থাৎ, জেটলির হাতে বাড়তি টাকা থাকিবে। প্রশ্ন হইল, ভাগ্যদেবীর এই আশীর্বাদ লইয়া তিনি কী করিবেন? হাত-পা ছড়াইয়া এই সাময়িক সমৃদ্ধি উপভোগ করিবেন, নাকি এই সুযোগ ব্যবহার করিয়া পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্রে সংস্কারের বকেয়া এবং অতি জরুরি কাজটি সারিয়া রাখিবেন?
প্রশ্নটির কোন উত্তর গ্রহণযোগ্য, তাহা বলা বাহুল্য। ভারতে পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্রে যতখানি সংস্কার হইয়াছে, তাহার সুফল সম্বন্ধে অরুণ জেটলি বিলক্ষণ অবগত। ২০১০ সালের জুন মাসে তৎকালীন ইউপিএ সরকার পেট্রোলের দাম হইতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলিয়া লয়। ২০১৪ সালের অক্টোবরে ডিজেলের দামও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। তাহাতে বিপুল লাভ হইয়াছে। পেট্রোলিয়াম ভর্তুকি বাবদ সরকারের খরচ প্রায় অর্ধেক হইয়া গিয়াছে। পেট্রোলিয়াম বিপণন সংস্থাগুলির ক্ষতির পরিমাণও বহুলাংশে কমিতেছে। অন্য দিকে, ডিজেলখেকো স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল-এর চাহিদাতেও ধাক্কা লাগিয়াছে। পরিবেশের পক্ষে তাহা অতি সুসংবাদ। এই বৎসর জানুয়ারি হইতে এলপিজি-র ভর্তুকি সরাসরি গ্রাহকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা হইয়াছে। তাহাতেও ভর্তুকির অপচয় কমিয়াছে। এই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রজন্মের সংস্কারের গুরুত্ব বিষয়ে সংশয় নাই।
সংস্কারের প্রক্রিয়া আরম্ভ করিতে হইবে কেরোসিনের ভর্তুকি রদ করিবার মাধ্যমে। কেহ আপত্তি করিয়া বলিতে পারেন, গণবণ্টন ব্যবস্থায় ভর্তুকিপ্রাপ্ত দামে যে কেরোসিন বিক্রয় হয়, তাহার মূল উপভোক্তা দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। এই ঝোলাওয়ালা আপত্তির উত্তর সরল— এই ভর্তুকি দরিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছাইতেছে না। এখন খোলা বাজারে, অনিয়ন্ত্রিত দামে, কেরোসিন বিক্রয় হয়। কাজেই, ভর্তুকিপ্রাপ্ত কেরোসিন চোরাপথে খোলাবাজারে পৌঁছাইবার সম্ভাবনা অতি উচ্চ। কেরোসিনে ভর্তুকি দেওয়া যদি সরকারের নিকট গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে এলপিজি-র ভর্তুকির পন্থাটি গ্রহণীয়। অবশ্য, এলপিজি-র ক্ষেত্রে পথটি পরিত্যাজ্য। প্রতি সিলিন্ডারে দুই শতাধিক টাকা যাঁহাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ভর্তুকিবাবদ ঢুকিতেছে, তাঁহারা মূলত মধ্যবিত্ত। যাঁহারা প্রকৃতই দরিদ্র, এবং শুধু যাঁহাদের জন্যই ভর্তুকি দেওয়া চলিতে পারে, তাঁহারা এলপিজি-র বাকি দামটি চুকাইতেও অসমর্থ। রাজকোষ খালি করিয়া মধ্যবিত্ত তোষণের খেলাটি বন্ধ হওয়া বিধেয়। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় সরকার একটি ক্ষেত্রে এলপিজি ভর্তুকি প্রত্যাহার করিয়া লইয়াছে— যে ক্ষেত্রে এই ভর্তুকি অতি জরুরি, সেই ক্ষেত্রে। মিড ডে মিলে এলপিজি ভর্তুকি বন্ধ করা মারাত্মক ভুল। তাহাতে শিশুগুলির ক্ষতি। অরুণ জেটলি এই ভুলটি সংশোধনের ব্যবস্থা করিবেন, আশা করা চলে।