প্রবন্ধ ২

গোল শোধ দেব না?

নিউটনের তৃতীয় সূত্রটা সাংঘাতিক কাজে লাগে নিজের লাথি সাপোর্ট করতে। সাধারণ লোক ‘জাস্টিস’ বলতে বোঝে থাপ্পড়ের বদলে থাপ্পড়কেই।আমরা বাচ্চাদের খুন করেছি বলে খুব নিন্দে হবে, জানি। কিন্তু আমরা তো সোজাসাপটা যুক্তি দেখিয়েছি। তোমরা আমাদের বাচ্চাদের মারছ। তাই আমরা তোমাদের বাচ্চাদের মেরে বোঝাতে চাই, এটা কেমন যন্ত্রণার।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ ০০:০০
Share:

আমরা বাচ্চাদের খুন করেছি বলে খুব নিন্দে হবে, জানি। কিন্তু আমরা তো সোজাসাপটা যুক্তি দেখিয়েছি। তোমরা আমাদের বাচ্চাদের মারছ। তাই আমরা তোমাদের বাচ্চাদের মেরে বোঝাতে চাই, এটা কেমন যন্ত্রণার। পৃথিবী এই মহান তত্ত্বের ভিত্তিতেই চলেছে: তুমি যা করবে, তোমার প্রতি তা-ই করা হবে। যেমন কর্ম, তেমনি ফল। তুমি মেরেছ, তোমায় মেরে আমি বলব, ‘দ্যাখ কেমন লাগে।’

Advertisement

সারা পৃথিবীর যে সাধারণ মানুষরা আজ ছিছিছি, আহাআহাআহা, চুকচুকচুক করে ফাটিয়ে দিচ্ছে, ভারতের যে-আমজনতা আমাদের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলছে শত্তুর দেশটাতেই এমন পিশাচ জন্মায়, তারা নিজেরা কী মনে করে? চলতে চলতে সহসা তাদের পা কেউ খুব বিচ্ছিরি ভাবে মাড়িয়ে দিলে, তারা কি ফিরে এসে ওই লোকটার পা-টাও ওই রকমই জঘন্য ভাবে মাড়িয়ে দিতে চায় না? তারা কি বাসেট্রামে ঝগড়ায় গসিপে গল্পে কোটি কোটি বার বলে চলে না, যে যা করেছে, তাকে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ বলে সেটাই ঠুসে গেলানো উচিত? সিপিয়েমরা তৃণমূলদের, তৃণমূলরা বিজেপিদের, বিজেপিরা কংগ্রেসদের, এই থিয়োরিতেই মোকাবিলা করে না? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এই জঙ্গি হানার পর যখন শুনবেন, জঙ্গিগুলোকেও হিংস্র নির্মম বিমান-হানায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, আপনার মধ্যে ‘আঃ, বেশ হয়েছে, দ্যাখ কেমন লাগে’ জেগে উঠবে না?

হ্যঁা, বড় বড় মানুষেরা অন্য রকম কথা বলে গেছিলেন। তা, বড় বড় মানুষরা জন্মেইছেন তো কোটেশন সাপ্লাই করার জন্য। যখনই তাঁরা বুঝে যান, ক্যালেন্ডারে তাঁদের ছবি সাঁটা হবেই, তখনই তাঁদের ভেতর থেকে কয়েকটা অ্যাবসার্ড, ন্যাকাচণ্ডী, ক্লিশেক্লিষ্ট বাক্য ভড়ভড় করে বেরিয়ে আসে। গাঁধী বলে গেছেন: ‘একটা চোখের বদলে আর একটা চোখ’ এই নীতিতে চললে পৃথিবীতে সবাই অন্ধ হয়ে যাবে। যিশু তো অন্যের পাপ ঘাড়ে নিয়ে নিজে ক্রুশে চড়ে বসলেন। আর খুঁজলে নির্ঘাত রবীন্দ্রনাথ, গ্যেটে, মায় মালালা ইউসুফজাইয়েরও গুচ্ছের ফুল-তোলা গ্রিটিংস কার্ড মার্কা বাণী পাওয়া যাবে। যার মূল কথা হল, যে অন্যায় করেছে, তাকেও বুঝতে চেষ্টা করো। বোঝাতে চেষ্টা করো। তার প্রতি অন্যায় কোরো না। হাহাহা। আর এই লোকগুলোর ছবি ঘরে টাঙিয়ে বা মূর্তি উন্মোচন করে যারা রাজনীতির মঞ্চ আলো করে বসে আছে, তারা কী বিশ্বাস করছে? মুখে ‘বদলা নয় বদল চাই’ শানালেও আসলে তারা কী বলছে? বলছে, ওরা আমাদের দলের এতগুলো লোককে খুন করেছে, আর আমরা বসে বসে কুমড়ো ভাজব? মার শালাদের। ওর ডবল লোককে খুন করব। কয়েক জন তো টক শো-তে গিয়ে অবধি বলছে, সব অ্যাকশনের সমান ও উলটো রি-অ্যাকশন থাকে। তোমরা যখন আমাদের কুড়ি জন সমর্থককে পুঁতে দিলে তখন মনে ছিল না? এখন মহাপুরুষ সাজতে এসেছ? ‘মহাপুরুষ’ কথাটা ব্যঙ্গ করতে ব্যবহার হয়। ‘গাঁধীগিরি’ কথাটা বিদ্রুপ করতে কাজে লাগে। আর নিউটনের তৃতীয় সূত্রটা সাংঘাতিক কাজে লাগে নিজের লাথি সাপোর্ট করতে। সাধারণ লোক ‘ন্যায়’ বা ‘জাস্টিস’ বলতে বোঝে থাপ্পড়ের বদলে বেধড়ক থাপ্পড়কেই।

Advertisement

ভারতের সাধারণ মানুষ কি মনে করে না, এক্ষুনি পাকিস্তানে বোম ফেলে গোটা দেশটা ধ্বংস করে দেওয়া উচিত? তাতে তারই মতো লাখ লাখ সাধারণ মানুষ মারা যাবে জেনেও? আলবাত মনে করে। তার পর তারাই আবার পাকিস্তানি জঙ্গিদের নিন্দে করে, কারণ তারা সাধারণ মানুষদের খুন করেছে। হাঃ। এই লোকগুলোর সঙ্গে আমাদের তফাত কী জানেন? তারা যা ভাবে তা করে ওঠার মুরোদ নেই, আর তারা যা ভাবতেও পারে না, আমরা তা করে দেখাই।

দৈনন্দিনের প্রত্যেকটা মুহূর্তে প্রতিটি মানুষ অন্যকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে দাঁত কিড়মিড়োচ্ছে। বাড়িওয়ালা একতলার বারান্দায় পায়খানা ছুড়ছে। তখন ভাড়াটে প্ল্যান করছে, কোন গুলতিতে দোতলায় পায়খানা ছোড়া যায়। এক মহিলা পারিবারিক ঝগড়ার জেরে পাশের বাড়ির ছোট ছেলেটাকে ডেকে এনে খুন করেছে। জানতে পেরে তাকে পাড়ার লোকেরা পুড়িয়ে মারছে। কলকাতার ম্যাওদিদার ঘটনা, এখনও কারও মনে থাকতে পারে। যে মানুষটা রূঢ় দোকানির সঙ্গে সমান দুর্ব্যবহার করতে পারেনি, সে-ও মনে মনে ছ’মাস গুমরোচ্ছে, কেন মোক্ষম খিস্তি করে ব্যাটার থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিলাম না? ধনঞ্জয় রেপ করেছিল ও খুন, তাই রাষ্ট্র যাতে তাকে খুন করে, সে জন্যে লোকে মিছিল করছে। কেউ কি ‘ক্ষমা’কে একটা অপশন মনে করছে? কেউ কি ধুলোর মতো ঝেড়ে ফেলতে পারছে ঘটনাগুলো?

এমনকী আড্ডায় কাউকে নিয়ে ইয়ার্কি হলে, সে ওত পেতে থাকছে, কখন ফিরতি দেবে। সক্কলে এক-এক শোধ করতে তড়পাচ্ছে। এরই একটা চূড়ান্ত রূপ হল আমরা যেটা করেছি। চূড়ান্ত, উগ্রতম, কিন্তু শেকড়টা একদম এইটাই। সব্বাই যা ভাবে, আমরা তা-ই ভাবি, আমরা অমানুষ জানোয়ার নই, মগজধোলাই হওয়া মনস্টারও নই। আমাদের বাচ্চাগুলো যখন পাহাড়ি রাস্তায় আপনমনে খেলে বেড়াচ্ছে, জল আনছে, খুনসুটি করছে, আকাশ থেকে আচমকা তাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়ছে কালান্তক বোম, তারা মুহূর্তে ধুলোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ধুলো হয়ে। তারা আমাদের বিশ্বাস ও আদর্শের দাম দিচ্ছে তাদের কচি প্রাণ দিয়ে। হ্যঁা, ঠিকই, তোমরা তাদের মারবে বলে বোম ফেলছ না, ওরা মূল লক্ষ্য নয়, মৃত্যুগুলো কো-ল্যাটারাল, কিন্তু মরছে তো? ব্যস, এ বার, তোমাদের বিশ্বাস আর আদর্শের দাম তোমাদের বাচ্চারা দেবে। তাই আমরা আর্মি-স্কুলের বাচ্চাদের মারলাম। সিম্পল, এবং সঙ্গত গণিত। এবং অঙ্কই বলে, আমরা মরছি, আমরা আবার গজাব। কোন মন্তরে? হা। ঘুমিয়ে আছে সব টেররিস্ট পাবলিকেরই অন্তরে।

লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement