— প্রতীকী চিত্র।
‘তরুণের স্বপ্ন’ কি অব্যাহত থাকবে? রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসতেই শুরু হয়েছে জল্পনা। ২০২১-এর পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের হাতে ট্যাবলেট তুলে দিতে ১০ হাজার টাকার অনুদান দেওয়া শুরু করে। সরকার বদলের পরই প্রকল্পের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকদের একাংশ। সম্প্রতি বিকাশ ভবনের বৈঠকেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
২০২০ সালের পর থেকে আমূল বদলে গিয়েছিল সামাজিক পরিস্থিতি। টানা দু’তিন বছরের করোনা অতিমারি জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত করেছিল। ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল শিক্ষাব্যবস্থায়। বাড়িতে বসেও যে স্কুলে উপস্থিতি দেওয়া যায়, সেই প্রথম জেনেছিল এ দেশের পড়ুয়ারা। সৌজন্যে প্রযুক্তির উন্নতি। কিন্তু সমস্যা ছিল সেখানেই। শহুরে বেসরকারি স্কুলের সম্পন্ন পড়ুয়ারা প্রযুক্তির সাহায্য যতখানি পাচ্ছিল, তার সিকিভাগও জুটছিল না গ্রামীণ বা শহুরে নিম্নবিত্ত এলাকার পড়ুয়াদের। এই পরিস্থিতিতেই রাজ্য সরকার একাদশের পড়ুয়াদের জন্য ট্যাবলেট কেনার টাকা দেওয়ার কথা ভেবেছিল।
পশ্চিমবঙ্গে ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প চালু হওয়ার পর দেশের অনেক রাজ্যেই এই ধরনের প্রকল্প জনপ্রিয় হয়। যেমন উত্তরপ্রদেশে চালু হয়েছে ‘স্বামী বিবেকানন্দ ইউথ এমপাওয়ারমেন্ট স্কিম’ (২০২১), হরিয়ানায় ‘ই-অধিগ্রাম’ (২০২২), দিল্লিতেও এই প্রকল্প চালু হয়েছে। গুজরাতে ‘নমো ই-ট্যাবলেট’ প্রকল্প অবশ্য চালু ছিল ২০১৭ সাল থেকেই।
পালাবদলের পর প্রতি বছর একাদশ শ্রেণির প়ড়ুয়াদের ট্যাব দেওয়া ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প বন্ধ করার দাবি তুলেছেন শিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, এই টাকা বরং স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ করা হোক। সূত্রের খবর, গত সোমবার বিকাশ ভবনে বিজেপি বিধায়ক দলের সঙ্গে শিক্ষা দফতরের বৈঠকেও এই প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তবে শিক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
প্রকল্পের বিরুদ্ধে যাঁরা দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা মনে করছেন, সরকারি টাকায় স্মার্টফোন বা ট্যাব কিনলে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে পড়ুয়াদের। এমনকি সারা রাজ্যে এমন বহু পড়ুয়ার কথা তাঁরা বলেছেন, যাঁরা শুধু মাত্র ট্যাবের ১০ হাজার টাকা পাওয়ার জন্য একাদশে ভর্তি হচ্ছেন। ২০২৪ উচ্চ মাধ্যমিকের হিসাব বলেছিল, টেস্ট বা উচ্চ মাধ্যমিকে মোট পড়ুয়ার তুলনায় পরীক্ষার্থী কমেছিল প্রায় ১৫-২০ শতাংশ।
পড়ুয়াদের মোবাইলের টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। ২০২৪-এর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫-এ শুরু হয় কড়াকড়ি। অ্যাকাউন্টের বিবরণ নিয়ে সমস্যা থাকায় বহু পড়ুয়া নভেম্বর মাসেও টাকা হাতে পাননি বলে অভিযোগ তোলেন। কর্তৃপক্ষ সে বার জানিয়েছিলেন, দুর্নীতি রোধে কড়া প্রশাসন। তারই জন্য সময় লেগেছে বেশি।
এরই পাশাপাশি মূল্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকদের একাংশ। পড়াশোনার নামে ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে পড়ুয়ারা শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাই ভুলতে বসেছে বলে অভিযোগ। বাড়ছি ‘রিল’ বানানোর ঝোঁক। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘‘এমন বহু পড়ুয়া রয়েছে যাঁরা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় শুধু ট্যাবের এই টাকা পাওয়ার জন্যে। অ্যাকাউন্টে টাকা পাওয়ার পরে তাঁরা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।’’
আবার অনেক পড়ুয়ার পারিবারিক সামর্থ রয়েছে ট্যাব কেনার। তারাও এই বিশেষ সুবিধা নিচ্ছে সরকারের থেকে, এমনই অভিযোগ। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “এই খাতে যে বড় অঙ্কের টাকা সরকারের ব্যয় হয় সেখানে স্কুলের পরিকাঠামো উন্নত করা উচিত।” তাঁরা এই মর্মে স্মারকলিপিও বেশ করেছেন স্কুলশিক্ষা দফতরের কাছে।
তবে রাজ্যের ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকার জানিয়েছিল, সমাজকল্যাণমূলক কোনও প্রকল্প বন্ধ করা হবে না। কলকাতার এক স্কুলশিক্ষক দাবি করেন, “প্রযুক্তির উন্নতির যুগে বৈদ্যুতিন যন্ত্রের নির্ভরতা বাড়ছে। লকডাউন আমাদের শিখিয়েছে কী ভাবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। সে ক্ষেত্রে সঙ্গতিহীন পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা কি পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়বে? সেই জায়গা থেকেই সরকারের পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। ট্যাবের টাকা পাওয়ার অধিকার পড়ুয়াদের থাকা উচিত।”
বাস্তবও সায় দিচ্ছে সেই পক্ষেই। চলতি বছর উচ্চ মাধ্যমিকে নবম স্থানে রয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের শুভঙ্কর সামন্ত। তাঁর পারিবারিক সামর্থ ছিল না একটি স্মার্টফোন বা ট্যাব কেনার। সরকারি অনুদানেই সেটি কিনতে পেরেছিলেন শুভঙ্কর। সুরাহাও হয়েছে অনেকখানি।
তাই শিক্ষা মহলের মত, পারিবারিক আয় বুঝেই এই প্রকল্পের বণ্টনের প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এই পদক্ষেপ করলে অধিকাংশ শিক্ষকই তা সমর্থন করবেন বলে দাবি।