ISC result 2026

হৃদ্‌যন্ত্রে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে দ্বাদশে সফল থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পিতৃহারা সৃজনী! স্বপ্ন মনোবিদ হওয়ার

এ বছর আইএসসি পরীক্ষায় পাশ করেছেন কলকাতার মেয়ে সৃজনী সাহু। বাংলা ও ইংরেজিতে পেয়েছেন ৮৮ এবং ৮২। কিন্তু এই ফল সহজে আসেনি। প্রতি ১৫ দিন অন্তর দু’বোতল রক্ত নিতে হয় তাঁকে। পরীক্ষার একেবারে আগেও ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে।

Advertisement

সুপ্রিয় তরফদার

শেষ আপডেট: ০২ মে ২০২৬ ০৮:৫৯
Share:

মায়ের সঙ্গে সৃজনী সাহু। ছবি: সংগৃহীত।

মুখাগ্নি করবে মেয়ে, চেয়েছিলেন বাবা। মৃত্যু কী— বুঝে ওঠার আগেই শ্মশানে গিয়ে সে কাজ সেরেছিল পাঁচ বছরের মেয়ে। সে সব অনেক দিনের কথা, তবু আজও টাটকা সৃজনীর স্মৃতিতে। থ্যালাসেমিয়াকে পরাজিত করে আইএসসি-তে ভাল ফল করার পরও বাবার কথা মনে করেই এগিয়ে যাওয়ার সাহস পান তিনি।

Advertisement

জীবন মানে ল়ড়াই। আর সে লড়াই জিতে যাওয়ার নাম সৃজনী সাহু, এমন বললে বোধহয় অত্যুক্তি হয় না। বাবা ছিলেন ওড়িশার বাসিন্দা, মা বাঙালি। তাঁদের প্রেমে গল্পে থেকে গিয়েছিল কাঁটা, তবু পরিবারের আপত্তি উড়িয়ে ঘর বেঁধেছিলেন। কোলে এসেছিল কন্যা। কিন্তু তার বুকেও যে অসুখ। মাত্র তিন মাস বয়সেই হৃদ্‌যন্ত্রে অস্ত্রোপচার করতে হয় সৃজনীর। আর সে সময়ই ধরা পড়ে থ্যালাসেমিয়া।

ছোট্ট মেয়ের চিকিৎসা আর সংসার আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন বাবা সুশান্ত সাহু। কিন্তু নিয়তি তাঁর প্রতি সদয় ছিল না। কয়েক বছরের মধ্যেই মুখগহ্বরে ধরা পড়ে ক্যানসার। মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের চিকিৎসা বন্ধ করে দেন সুশান্ত। প্রায় এক যুগ পার করে বাবার কথা বলতে থাকেন সৃজনী নিজেই, ‘‘বাবা বলত আমিই ওঁর মেয়ে, আমিই ওঁর ছেলে। তাই বাবার ইচ্ছা মতোই আমিই মুখাগ্নি করি। বাবা আমাকে খুব ভালবাসত। অত ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কাটানো প্রতি মুহূর্ত আমার মনে রয়েছে।’’

Advertisement

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম

সে সময় থেকে ‘বড়’ হয়ে যাওয়া সৃজনীর। মা আর মেয়ের ছোট্ট সংসার। লড়াই শরীরে, সমাজে। তাঁর কথায়, ‘‘জন্ম থেকে আমার যে লড়াই শুরু হয়েছে, সেটাই আমাকে বাড়তি সাহস জুগিয়েছে।’’ কলকাতার রামমোহন মিশন হাইস্কুল থেকে আইএসসি পরীক্ষায় পাশ করেছেন। বাংলা ও ইংরেজিতে পেয়েছেন ৮৮ এবং ৮২, ইতিহাস ও ভূগোলে ৬০ এবং ৬১। কিন্তু এই ফল পাওয়া সহজ ছিল না। প্রতি ১৫ দিন অন্তর দু’বোতল রক্ত নিতে হয় তাঁকে। পরীক্ষার একেবারে আগেও ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে।

লড়াই ছাড়তে নারাজ সৃজনী বলেন, “বাবা যখন অসুস্থ, আমি তখন খুব ছোট। তবু বাবাকে কথা দিয়েছিলাম পড়াশোনা করব মন দিয়ে। কখনও পিছিয়ে পড়ব না। সে কথা আমি রাখব।” কিন্তু শুধু তো শরীর নয়। এই লড়াইয়ে মনের জোর বজায় রাখাও খুব জরুরি। তাই মনের যত্ন নিয়ে বিশেষ ভাবে ভাবিত সৃজনী। তিনি চান মনোবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে। ভবিষ্যতে মনোবিদ হয়েই মানুষের সেবা করতে চান।

কলকাতার দক্ষিণ কলকাতার আজ়াদগড়ের ফ্ল্যাটে মা মধুমিতা সাহুর সঙ্গে থাকেন সৃজনী। বাবার মৃত্যুর পর থেকে মধুমিতার বাবা-মা তাঁদের আগলে রেখেছিলেন। ২০১৯ সালে মৃত্যু হয়েছে সৃজনীর দাদু-দিদিমারও। তার পর থেকে একটি ফিজ়িয়োথেরাপি কেন্দ্রে কাজ করে সংসার চালান মধুমিতা। অতীতের শোক, অভাব-অনটন, মেয়ের নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি তিনিও বজায় রেখেছেন অদম্য জেদ। মেয়ে তাঁর নিজের পায়ে দাঁড়াবেই। সৃজনী বলেন, “মা আমাকে আগলে রেখেছেন। এখন দাদু-দিদিমা নেই। আমিই মাকে দেখে রাখব। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমার শক্তি। তাঁরাই পথ দেখিয়েছেন।” মা-মেয়ের সংসার, পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসা। কী ভাবে চলে এত কিছু? এত দিন কষ্ট করেই চলেছে। মধুমিতার সামান্য আয়, সঙ্গে কাছের জনেরা যেমন পারেন, সাহায্য করেন। চোয়াল শক্ত করে সৃজনী বলেন, “এ বার থেকে আমি মায়ের পাশে দাঁড়াব। টিউশন পড়িয়ে কিছু টাকা তো এখনই রোজগার করতে পারি। তা দিয়েই চালাব। ঠিক পারব। পারতেই হবে। না হলে বাবাকে উপহার দেব কী করে?”

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম

ছাত্রীর সাফল্যে খুশি স্কুলর শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। রামমোহন মিশন হাই স্কুলের অধ্যক্ষ সুজয় বিশ্বাস বলেন, ‘‘এমন ছাত্রছাত্রীরা আমাদের গর্ব। পড়াশোনার পাশাপাশি ওরা এত ভাল মনের মানুষ হয়ে উঠতে পারছে, এটাই সমাজের বাড়তি পাওনা। এ ভাবেই ওরা বেড়ে উঠুক।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement