কূটনৈতিক বৈঠক প্রণব-পুতিনের। ছবি: রয়টার্স।
রাশিয়ার সহযোগিতায় পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুরে প্রস্তাবিত পরমাণু বিদ্যুত উত্পাদন কেন্দ্রটাই শুধু যা স্থানীয় রাজনৈতিক বাধায় হল না! কে জানে বাঙালি হিসাবে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের এ ব্যাপারে কতটা আক্ষেপ রয়েছে বা নেই! তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর দীর্ঘ দিনের বন্ধু ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে নয়াদিল্লি-মস্কো কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আজ আরও গতি দেওয়ার চেষ্টা করলেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসানের সাত দশক পূর্তি উপলক্ষে মস্কো-র বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সামিল হতেই মূলত পাঁচ দিনের রাশিয়া সফরে এসেছেন প্রণববাবু। ক্রেমলিনের প্রাসাদ লাগোয়া রেড স্কোয়ারে আজ সকালে সেই অনুষ্ঠানে পুতিনের সঙ্গে এক মঞ্চে ছিলেন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি। তবে এই বিজয়োতসবে সামিল হওয়ার মোড়কে নয়াদিল্লি সাজিয়ে রেখেছিল কূটনীতির বাকি সব উপকরণ। বিকেলে ক্রেমলিনের প্রাসাদে পুতিন-প্রণব দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। তার পর সাংবাদিক বৈঠক করে বিদেশ সচিব জয়শঙ্কর বলেন, ‘‘দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নয়াদিল্লির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে রাশিয়া। সেই সঙ্গে ভারতে পরমাণু বিদ্যুত উতপাদনের প্রসার, শক্তি ক্ষেত্রে সুরক্ষা বাড়াতে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক শান্তি কায়েম রাখতে সুষ্ঠু বোঝাপড়া অটুট রাখার বার্তাও দিয়েছে মস্কো।’’
সংবিধান অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আসলে কেন্দ্রে মোদী সরকারের কর্মসূচি ও নীতিকে সামনে রেখেই দৌত্য চালালেন তিনি। আবার নয়াদিল্লি পুঁজি করল পুতিনের সঙ্গে প্রণবের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সখ্যকে। যে বন্ধু সম্পর্কের বয়স প্রায় দু’দশক ছুঁতে চলেছে।
ক্রেমলিনের এই প্রাসাদেই পাঁচ বছর আগে রাশিয়ার ততকালীন প্রেসিডেন্ট মেডভেডের সঙ্গে ভারতে পরমাণু চুল্লি নির্মাণ সংক্রান্ত সমঝোতা করেছিলেন সমসাময়িক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। মেডভেডেভ-মনমোহন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা হয়েছিল, মেদিনীপুরের হরিপুরে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় একটি পরমাণু চুল্লি তৈরি হবে। অন্তত দশ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু হরিপুরে জমি অধিগ্রহণে আপত্তি করেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। সাউথ ব্লক সূত্র জানাচ্ছে, ভারত-রাশিয়া পরমাণু সহযোগিতার ক্ষেত্রে হরিপুর একটা যতি চিহ্ন তৈরি করেছিল ঠিকই। তবে তা এখন অতীত। হরিপুর পর্ব ছাড়াও পরমাণু দায়বদ্ধতার শর্ত চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রেও কিছুটা দেরি হয়। তবে এখন চাকা ফের গড়াতে শুরু করেছে। গত ডিসেম্বরে ভারতে পুতিনের সফর কালে এ ব্যাপারে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি হয়েছে। প্রণব-পুতিন বৈঠকে সেই ওয়ার্কিং গ্রুপের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘ভারতে পরমাণু শক্তি উতপাদনে রাশিয়ার মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। তবে ভারতে শক্তি চাহিদা বিপুল। রাশিয়া প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাস উতপাদনে বিশ্বে প্রথম সারিতে রয়েছে। তেল ও গ্যাস উতপাদনে রাশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বিনিয়োগও রয়েছে। এই সহযোগিতার পরিধি বাড়িয়ে উভয়েরই আর্থিক শ্রীবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য দু’দেশই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’’
সূত্রের খবর, শক্তি ক্ষেত্রে এই আদানপ্রদানের সঙ্গেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে উঠে আসে মেক ইন ইন্ডিয়া প্রসঙ্গ। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এখনও রাশিয়াই বৃহত্তম রফতানি দেশ। ক্রেতা-বিক্রেতার থেকে সেই সম্পর্ককে অংশীদারিত্বে তুলে আনার ব্যাপারে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে আজ প্রস্তাব রাখে নয়াদিল্লি। পরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে বলা হয়, নয়াদিল্লির মেক ইন্ডিয়া প্রকল্পে বিশেষ উতসাহ দেখিয়েছে মস্কো। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির রাস্তা ইতিমধ্যে খুলে দিয়েছে মোদী সরকার। ভারতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উতপাদন, যৌথ উতপাদন, রেলের আধুনিকীকরণ, স্মার্ট সিটি নির্মাণ, শিল্প তালুক নির্মাণে আগ্রহী রাশিয়া। ভারতে উচ্চ প্রযুক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে রাশিয়ার প্রযুক্তি সংস্থা রুশানো। তাছাড়া, রাশিয়া ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, সিসটেমা, রেনোভা গোষ্ঠীও বিনিয়োগে উতসাহী।
কূটনীতিকদের মতে এ ব্যাপারে পুতিন প্রশাসনের উতসাহের কারণও রয়েছে। ইউক্রেণ বিবাদের জেরে রাশিয়ার ওপরে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে কার্যত গোটা পশ্চিম। এমনকি ঘরোয়া মহলেও তাঁর সমালোচনা চলছে। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমে কেউ কেউ এমনকি তাঁকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে নাম দিয়েছেন, অ্যাডল্ফ পুতিন। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলির কেউ বা ইতালির স্বৈরাচারী নেতা মুসোলিনির সঙ্গে তাঁর তুলনা টানছেন। তাই আরও বেশি করে পূবে তাকাচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
মজার ব্যাপার হল, সাবেক বন্ধুর এই দুঃসময়ে নয়াদিল্লিও কৌশলগত ভাবেই সহানুভূতির অবস্থান নিচ্ছে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যাযের কথায়, ‘‘পুতিনকে ভারতের মহান বন্ধু হিসাবেই স্বীকৃতি দেয় নয়াদিল্লি।’’ ইরানের পরমাণু প্রকল্পে রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে ওয়াশিংটন সমালোচনা করছে, তখন প্রণব আজ বলেন, ‘‘সিরিয়ায় রাজনৈতিক স্থিরতা আনা ও ইরানের পরমাণু বিতর্কের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির জন্য রাশিয়াকে অভিনন্দন জানাচ্ছে ভারত।’’
অন্যদিকে বিদেশ মন্ত্রকের শীর্ষ সারির এক কূটনীতিক বলেন, ‘‘ভারত রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অনন্য এবং গতিশীল। অন্য কোনও সম্পর্কের সঙ্গে এর তুলনা হয় না। রাষ্ট্রপতির চলতি সফর সেই সম্পর্ককে আরও মজবুত করল। এর পর চলতি বছরেই ভারত-রাশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে মস্কো সফরে আসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সম্ভবত, সেই সফরে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রসারে সুনির্দিষ্ট কিছু চুক্তি সাক্ষর হবে।’’