Bengali New Year

আসুন বাঙালি হই! কেউ হাতে মাছ নিয়ে রাস্তায়, কেউ ইলিশ বেছে খাইয়ে দিতে চান! পয়লা বৈশাখের ‘আমি বাঙালি’ যুদ্ধ

কেউ ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ আয়োজন করে সকাল থেকে হেঁটে বেড়ালেন কলকাতার পথে পথে। কেউ ডালায় রুইমাছ সাজিয়ে রাস্তায় নামলেন। কারও আয়োজনে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। কেউ আবার বাংলা ব্যান্ডকে দিয়ে জলসা করালেন।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:৫৯
Share:

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তুম বাঙালি তো হম ভি বাঙালি! যে ভোটের মূল সুর এই, সেই ভোটে বাংলা নববর্ষ যে ভোট মহড়ার মূল নাট্যমঞ্চ হয়ে উঠবে, তাতে আর সন্দেহ কী!

Advertisement

কেউ ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ আয়োজন করে সকাল থেকে হেঁটে বেড়ালেন কলকাতার পথে পথে। কেউ ডালায় রুইমাছ সাজিয়ে রাস্তায় নামলেন। কারও আয়োজনে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। কেউ আবার বাংলা ব্যান্ডকে দিয়ে জলসা করালেন। দিনভর তৃণমূল বলল, ‘‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে।’’ বিজেপি পাল্টা বলল, ‘‘বাঙালি আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাইলে তৃণমূলকে বিদায় দিক।’’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নববর্ষের সকালেই ভিডিয়ো বার্তা প্রকাশ করে বললেন, ‘‘বাংলার একটা ঐতিহ্য, গরিমা আছে। এটা আমাদের বাংলার নববর্ষ। বাংলা সম্প্রীতি, সংহতির, সংস্কৃতির পীঠস্থান। আসুন, শান্তি-সম্প্রীতি-সংস্কৃতির বার্তা দিয়ে আমরা নতুন ভোর নিয়ে আসি।’’ দিদি যদি এই বার্তা দেন, মোদী কী করে পিছিয়ে থাকেন! প্রধানমন্ত্রী প্রথমে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালেন। তাতে ‘পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের’ জয়গান। তার পরে একে একে অমিত শাহ এবং বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীন। অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর ‘খোলা চিঠি’। নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদী লেখেন, ‘‘বিগত ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গবাসী অপশাসন, বিশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতির শিকার। এই সব বিষয় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, সম্মান এবং পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির উপর চরম আঘাত হেনেছে।’’

Advertisement

শুভেন্দু অধিকারী সকাল সকাল ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ শুরু করেছিলেন ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে। প্রায় দু’কিলোমিটার হাঁটেন তিনি। মিছিলে বিজেপির পতাকা কম। বরং হাতে-হাতে বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি। একটু বেলার দিকে উত্তর কলকাতায়ও একই কায়দায় শোভাযাত্রা করেন শুভেন্দু। সঙ্গে জোড়াসাঁকো, চৌরঙ্গি, মানিকতলা ও শ্যামপুকুর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থীরা। সে মিছিলেও দলীয় স্লোগান নয়, বেজেছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত।

অরূপ বিশ্বাস পুজো সংগঠনে প্রথম পাঁচে। নববর্ষে দেখা গেল, তিনি পুজোর বাইরেও অভিনব। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বাঙালি পোশাকে সেজে পদযাত্রা। সঙ্গে ডালায় বিশালকায় রুই মাছ। টালিগঞ্জের প্রার্থী তথা রাজ্যের মন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আমরা হলাম মাছে-ভাতে বাঙালি। মাছ-ভাত ছাড়া আমাদের চলে না। কিন্তু বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তাই পথে নেমেছি। বাঙালিকে সচেতন করছি, বিজেপি কিন্তু বাঙালির মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেবে।’’

Advertisement

পাল্টা দিতে দেরি করেনি বিজেপি। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি অরূপের মিছিল এবং অভিযোগ শুনে বলেছেন, ‘‘ইলিশ মাছ নিয়ে আসুন! আমি বেছে খাইয়ে দিচ্ছি।’’ সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা-কর্মীদের অধিকাংশই তো মাছ-মাংস খান। আমি নিজেই তো মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারি না। মাছ বন্ধ করার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?’’ তাঁর কথায়, ‘‘তৃণমূল আসলে বিজেপির বিরুদ্ধে বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। তাই মাছ-মাংস নিয়ে কথা বলে ভোটের বৈতরণী পার হতে চাইছে।’’

স্মৃতি-সুকান্ত বাক্যবাণ ছুড়েছেন। আর অরূপের পাল্টা ছবি তৈরি করেছেন রাকেশ সিংহ। কলকাতা বন্দর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রাকেশ খিদিরপুর এলাকায় বর্ষবরণের পদযাত্রায় নেমেছিলেন ধুতি-পাঞ্জাবিতে শোভিত হয়ে। অবাঙালি রাকেশের দু’হাতে দু’টি মাছ। যে ছবি দেখিয়ে বিজেপি প্রশ্ন তুলেছে, ‘‘আমাদের রাকেশ সিংহ তো মাছ হাতে নিয়ে পথে নামলেন! তৃণমূলের শত্রুঘ্ন সিন্‌হা কবে নামবেন?’’ ব্যারাকপুরের বিজেপি প্রার্থী কৌস্তভ বাগচিও ধুতি-পাঞ্জাবি পরে মাছ হাতে পথে নেমেছিলেন।

নববর্ষে বাঙালিয়ানাকে প্রচারের ‘হাতিয়ার’ করা কলকাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। শহরতলি, গ্রাম, উত্তরবঙ্গে একই ছবি। শিলিগুড়িতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় নেতৃত্ব দেন বিজেপি নেতা-প্রার্থী শঙ্কর ঘোষ। তিনি পরেছিলেন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। শোভাযাত্রায় বাকিদের পরনে ছিল লাল পাঞ্জাবি-সাদা ধুতি। মহিলাদের পরনে লালপেড়ে সাদা শাড়ি। কুলো, শঙ্খ, মঙ্গলঘটের মতো নানা মাঙ্গলিক সামগ্রীও ছিল শোভাযাত্রায়। সঙ্গে ঢাকের বাদ্যি। সন্ধ্যায় ‘মুখ্যমন্ত্রীর পাড়া’ হিসাবে পরিচিত হাজরায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন শুভেন্দু। রাজারহাট-গোপালপুরের বিজেপি প্রার্থী তরুণজ্যোতি তিওয়ারি কেষ্টপুরে আয়োজন করেন একটি নামী বাংলা ব্যান্ডের অনুষ্ঠানের।

তৃণমূলের অন্য প্রার্থীরাও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করেছেন। উলুবেড়িয়া পূর্বে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আসানসোল উত্তরে মলয় ঘটক তাঁদের অন্যতম। তবে নেতৃত্বের নির্দেশে বা কোনও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সে সব হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় নেতা-কর্মীরা নাকি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই বর্ষবরণের আয়োজন করেছিলেন। তবে মূলত বাঙালি হিন্দুবহুল এলাকাতেই তৃণমূল ওই কর্মসূচির আয়োজন করেছিল। অবাঙালিপ্রধান এলাকায় নয়। দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘তৃণমূলের নতুন করে বাঙালি হওয়ার ব্যাপার নেই। আমরা সারা বছরই বাংলা ও বাঙালির অধিকারের পক্ষে লড়ি। যারা বাংলার টাকা বন্ধ করে বাঙালিকে ভাতে মারতে চাইছে, সেই বিজেপি-ই বরং জোর করে বাঙালি সাজার চেষ্টা করাছে।’’

সিপিএম অবশ্য এমন প্রচারের সমালোচনাই করেছে। দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য, ‘‘বাংলাকে লাটে তুলে এখন দুটো দল মাছ হাতে রাস্তায় নেমে বাঙালি সাজতে চাইছে! কী মাছ জিজ্ঞাসা করলেই উল্টো দিকে ছুটবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement