WB Elections 2026

লড়তে হবে নিজেদেরই, বুঝেছেন ভোটছুট-রা

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অসম্মান ও ক্ষোভ ক্রমেই ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বনগাঁ, গাইঘাটা, বাগদার অসংখ্য গ্রামে।

রবিশঙ্কর দত্ত

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০১
Share:

নথি থাকা সত্ত্বেও বাদ গিয়েছে নাম। ট্রাইবুনালে সরিয়ত মণ্ডল। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

তুলসীমালা, শাঁখাপলা, সিঁদুর, ঘোমটা। শান্ত মণিকা বিশ্বাস মুহূর্তে অস্থির। কানে এসে বিঁধল তাঁর গলা, ‘‘কে বাদ দিল আমার নাম? কেন করল আমার সর্বনাশ?’’

উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। মধ্য চল্লিশের বধূ তবু ছুটে চলেছেন। এ বাড়ি, ও অফিস ঘুরেঘুরে ক্লান্ত মহিলা উনুনে রান্না ঢেকে রেখে উদভ্রান্তের মতো আরও একবার ছুটে এসেছিলেন বাগদার সিন্দ্রানী হাইস্কুলের মাঠে। বললেন, ‘‘এই মাটিতেই আমার জীবন কেটে গেল, ছেলেমেয়ের নাম তুলল আর আমার নামটাই বাদ! এত বড় বেআইনি কাজ!’’

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অসম্মান ও ক্ষোভ ক্রমেই ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বনগাঁ, গাইঘাটা, বাগদার অসংখ্য গ্রামে। ভয় আরও গভীর হচ্ছে চারপাশের প্রাতিষ্ঠানিক ভরসাকেন্দ্রগুলির নিস্পৃহতায়। বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া শুরুর সময় থেকে যে রাজনৈতিক দলগুলি মণিকাদের মতো সাধারণ মানুষকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিল, আজ তাদের ভোটের ব্যস্ততা। তাই নতুন করে নাম তোলা নিয়ে এখন অন্ধকারে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ।

মণিকার প্রতিবেশী শ্যামল বালা দাদা সমরকে সঙ্গে এনেছিলেন। ভাইবোনেদের ‘ছায়া’ দিতে কখনও ওড়িশায়, কখনও মহারাষ্ট্রে কাজ করেছেন সমর। শ্যামলের আক্ষেপ, ‘‘বাড়ির ১২ জনের নাম আছে। শুধু যে দাদার জন্য সব, তাঁর নামটাই নেই। ঘুমোতে পারছি না আমরা।’’ ২৫ বছর ব্যবসা করছেন সমর। আয়কর দিয়েছেন, তার পরেও দেশের মাটিতে পরিচয় নিয়ে এই টানাহেঁচড়ায় কথাই কমে গিয়েছে তাঁর। হঠাৎ মনে পড়ায় প্রায় ছুটে গিয়ে এক বন্ধুকে ধরে এনে শ্যামল বললেন, ‘‘রমজান। ছোট্টবেলা থেকে আমরা একসঙ্গে। নাম ওরও নেই।’’ মাথা নেড়ে সায় দিলেও এখনও কিছুই করে উঠতে পারেননি চল্লিশোর্ধ্ব।

ট্রাইবুনাল পর্যন্ত পৌঁছলেও মণিকাদের মতো এই ভয় থেকে বেরোনোর পথ হাতড়াচ্ছেন ঊর্মিলা মণ্ডল, কার্তিক অধিকারী, কাদের মণ্ডল, জামাল মণ্ডলরা। বনগাঁ মহকুমা শাসকের দফতর লাগোয়া ট্রাইবুনালের দরজার সামনে ৮২ বছরের কার্তিকবাবু যেমন বুঝেছেন, প্রতিষ্ঠানের সামনে আবেগ টিকবে না। বিচার শুধু কাগজে। তবু এ শহরের সঙ্গে নাড়ির বাঁধনের আবেগে গলার স্বর তুলেই বলেছিলেন, ‘‘আরে বাপ, বনগাঁ শহরের কোন বাড়ির ভিত কবে, তা-ও আমার জানা।’’ তার পরেই অসহায়তায় রাশ। বললেন, ‘‘ভ্যান চালাইয়া খাইসি। যে বারান্দায় দাঁড়ায়ে আছি, তিরিশ-চল্লিশ বচ্ছর এই খানেই রাখসি সাইকেলভ্যান। বাড়িতে শুধু আমিই বাদ?’’

ব্যক্তিগত, সামাজিক সব স্তরেই বিচ্ছিন্নতার বোধে সিঁটিয়ে রয়েছেন গাইঘাটার কাদের। এক ঘণ্টার পথ গাড়ি ভাড়া দিয়ে আসতেই তাঁর দিনের শক্তি শেষ। ‘দলছুট’ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় বলছেন, ‘‘বাবা, মা, ভাইবোন সবার নাম আছে। শুধু আমার নেই।’’ জীবনে আড়াল করে রাখা পাতাও খুলে ধরলেন রাস্তার উপরেই। মাথা নামিয়ে বললেন, ‘‘কম বয়সে মাথার অসুখ ছিল। ওষুধবিষুধ করে এখন আমি ঠিক। দেখুন। কিন্তু নামটা না থাকলে যাব কোথায়?’’

তবে সকলেই এখন বুঝছেন, এ লড়াই তাঁদের, লড়তেও হবে শুধু তাঁদেরই। যে রাজনৈতিক নেতারা ভোটের সময় মতুয়াদের কোলে না মাথায় রাখবে বুঝতে পারে না, তাদের কাউকেই দেখা গেল না বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত চার বিধানসভা আসন গাইঘাটা, বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ এবং বাগদায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের জন্য তৈরি ট্রাইবুনালের ত্রিসীমানায়। বাগদার পুরনো হেলেঞ্চায় মতুয়াদের মিলন উৎসবের আয়োজনেও চাপা পড়েছে বাদ পড়া মানুষের দুশ্চিন্তা।

প্রচারের মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের এক প্রার্থীকে ধরতে চাইলেন ধর্মপুকুরিয়ার তরুণী। চায়ের দোকানে আর্তনাদের মতো শোনাল, ‘‘দাদা, আমি নীতুরানি বিশ্বাস। তৃণমূল করি। ওই যে বউ, তাঁকে পঞ্চায়েতে সদস্য করতে কত খেটেছি। আমার নামই বাদ।’’ ‘নাম পরে উঠে যাবে’ বলে প্রার্থী বেরিয়ে গেলেন। পিচ রাস্তায় মিলিয়ে যাওয়া তাঁর গাড়ি, ভিড় আর দলের দিকে তাকিয়ে রইলেন নীতুরানি। বিজেপির প্রার্থী ঘুরছেন তখন কাঁটাতার লাগোয়া চড়ুইগাছিতে। মতুয়া আর তফসিলি জাতি-জনজাতির মানুষের এই ভাবনা থেকে অনেক দূরে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন