ভোটের মুখে বন্ধ আইপ্যাকের দফতর। সোমবার কলকাতায়। —নিজস্ব চিত্র।
গমগম করার সময়ে সুনসান। ঝলমল করার সময়ে ঘুটঘুটে।
সোমবার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের দফতরের ছবি এমনটাই। অন্ধকারে ডুবে রয়েছে প্রকাণ্ড ফ্লোরটি। বিকেল ৫টা নাগাদ লিফট বেয়ে ১১ তলায় ওঠার পর দেখা গেল অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত মহাত্মা গান্ধী। রিসেপশন টেবিলের বাঁ দিকে গান্ধীজির হাসিমুখের ছবি। তার উপরে লেখা, ‘দ্য বেস্ট পলিটিক্স ইজ রাইট অ্যাকশন’! গান্ধীজির মুখের উপর স্পটলাইট পড়েছে। কিন্তু দফতরে প্রবেশের কাচের দরজার স্টিলের হাতলে শিকল দিয়ে বাঁধা তালা। অর্থাৎ, আইপ্যাকের কলকাতার দফতর বন্ধ। রবিবারও যেমন ছিল।
ভিতরে কি কেউ নেই? বাইরে থেকে দেখা গেল একজোড়া পা হেঁটে গেল বাঁ দিক থেকে ডান দিকে। সাড়া পাওয়ার চেষ্টা করা হল। সাড়া পাওয়াও গেল। এক জন দরজার সামনে এগিয়ে এসে জানালেন, রবিবার দিনভর অফিস বন্ধ ছিল। সোমবার কর্তৃপক্ষের তরফে তাঁদের আসতে বলা হয়েছে, তাই তাঁরা দু’জন এসেছেন তদারকি করতে। ভিতরে হাউস কিপিংয়ের আরও কয়েক জন ধুলো ঝেড়ে দফতর পরিষ্কার রাখার কাজ করছেন। বিকেল পাঁচটা নাগাদ নিজের নাম বলতে না-চাওয়া ওই কর্মীর কথায়, ‘‘পরিষ্কার হয়ে গেলেই চলে যাব!’’ তিনি আর কথা বাড়াতে চাননি।
দরজায় উঁকি দিয়ে ভিতরটা দেখার চেষ্টা করতে প্রথমেই চোখে পড়ল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি। তার ঠিক পাশেই অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগনমোহন রেড্ডির প্রতিকৃতি। আইপ্যাক এক সময়ে মোদীর হয়ে কাজ করেছে। যুক্ত ছিল জগনের দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা হিসাবেও। কিন্তু ডেস্কগুলি সব খালি। একটি মাত্র ডেস্কটপের মনিটরে আলো জ্বলছে। সামনে রাখা একটি হেলমেট। বাকিটা ফাঁকা। খাঁ-খাঁ করছে দফতর।
তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক পশ্চিমবঙ্গে তাদের কাজে ২০ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। সংস্থার কর্মীদের ইমেল মারফত সেই কথা জানানো হয় শনিবার গভীর রাতে। তার পর থেকে রবিবার দিনভর ঘটনার ঘনঘটা চলেছে। আইপ্যাক তাদের কর্মীদের পাঠানো ইমেল বার্তায় লিখিত ভাবে ২০ দিনের ছুটির কথা বললেও, মৌখিক ভাবে ভিন্ন বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে খবর। সূত্রের খবর, এই বার্তা গিয়েছে, কেউ চাইলে ভোট পর্যন্ত নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কেউ চাইলে ২০ দিনের ছুটি ‘উপভোগ’ও করতে পারেন। তবে এ হেন ইমেল আইপ্যাক কর্মীদের অনেকের মধ্যেই অনিশ্চয়তার বাতাবরণ তৈরি করেছে। বেশ কিছু জেলায় আইপ্যাক কর্মীদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হয়তো সে কারণেই সেই বাহিনীকে অভয় দিতে রবিবার দুপুরে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘আমি কাউকে চাকরি হারা হতে দেব না।’’ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কর্মী জুড়ে রয়েছেন তৃণমূলের হয়ে ভোটের কাজে। মূলত পুরনো এবং সংস্থার আস্থাভাজনেরাই তৃণমূলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছেন। যদিও সংযোগের ক্ষেত্রে আইপ্যাকের ইমেল আইডি বা অফিশিয়াল হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার না-করেই সেই কাজ করছেন তাঁরা।
খাঁ-খাঁ করছে অফিসের রিসেপশন। —নিজস্ব চিত্র।
শনিবার গভীর রাতে মেল করে পশ্চিমবঙ্গে প্রচারের কাজে কর্মরত কর্মীদের ২০ দিনের ছুটিতে যাওয়ার কথা জানায় আইপ্যাক। সেই ইমেলের প্রতিলিপি আনন্দবাজার ডট কমের হেফাজতে রয়েছে। যেখানে ‘সিসি’তে রাখা হয়েছে দু’জনকে। এক জন প্রতীক জৈন, অন্য জন অর্জুন দত্ত। ইমেল উল্লেখ করা হয়েছে, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই ‘অপারেশন’ বন্ধ রাখা হচ্ছে। লেখা হয়েছে, ‘আইনকে আমরা শ্রদ্ধা করি এবং গোটা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছি। নির্দিষ্ট সময়ে বিচার মিলবে, আমরা নিশ্চিত।’
রবিবার সকাল ১০টা ১৪ মিনিটে আইপ্যাকের ২০ দিনের ছুটির খবর প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার ডট কমে। ইমেলের প্রতিলিপিও ব্যবহার করা হয়েছিল প্রতিবেদনের ছবিতে। কিন্তু বেলা ১২টা নাগাদ তৃণমূলের তরফে বিবৃতি দিয়ে দাবি করা হয়, আইপ্যাকের কাজ বন্ধের খবর ‘ভিত্তিহীন’। তৃণমূল বিবৃতিতে লেখে, ‘‘বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে’ এই ধরনের খবর ছড়ানো হচ্ছে। এ-ও লেখে, ‘আমরা সংবাদমাধ্যমের একটি রিপোর্ট দেখেছি যেখানে বলা হচ্ছে, আই-প্যাক পশ্চিমবঙ্গে ২০ দিনের জন্য তাদের কাজ স্থগিত রেখেছে। এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। আই-প্যাকের পশ্চিমবঙ্গের দল তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। রাজ্য জুড়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রচারের কাজ চলছে। ময়দান থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য ইচ্ছা করা এই বয়ান ছড়ানো হচ্ছে।’’ যদিও এই বিবৃতি দলের এক্স হ্যান্ডল বা ফেসবুক পেজে পোস্ট করেনি তৃণমূল।
অন্ধকার আইপ্যাকের অন্দরমহল। —নিজস্ব চিত্র।
তৃণমূল ওই খবর ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করলেও আই-প্যাকের তরফে সেই মর্মে কিন্তু কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি বা খবরটিকে কোনও ভাবে, কোনও স্তর থেকেই অস্বীকার করা হয়নি সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত। অনেকের বক্তব্য, আনন্দবাজার ডট কম-এর হেফাজতে-থাকা আই-প্যাকের ওই ইমেলটি যদি ‘ভুয়ো’ হত, তা হলে তো আই-প্যাকের তরফেই সেটি আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানোর কথা। কিন্তু সংস্থার তরফে তেমন কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। যা থেকে স্পষ্ট যে, ইমেলটি আসল। তার মধ্যে কোনও ‘অসত্য’ বা ‘ভিত্তিহীনতা’ নেই। মমতা রবিবার তারকেশ্বর তেকে যা বলেছিলেন, সেই সুরেই সোমবার রাজ্যসভায় তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন জানিয়েছেন, তাঁরা কারও কেরিয়ার নষ্ট হতে দেবেন না। দায়িত্বশীল দল হিসাবে, সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূল এ ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
আইপ্যাক দফতরের বাইরে দেওয়ালের একটি অংশে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত নানা ধরনের ছবি সাঁটা রয়েছে। লেখা রয়েছে বিভিন্ন স্লোগান এবং পংক্তিও। একটি অংশে রয়েছে জীবনানন্দের লেখা, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে’। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে জলাভূমির তীরের এই বহুতলে আইপ্যাক কবে ফেরে, সেটাই এখন দেখার।