তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
মমতা বলেন, “তৃণমূল না জিতলে আপনার ভাষা, বাসস্থান, ঠিকানা, ব্যবসা, মাছ-ভাত, আপনার নিজের খাদ্য থাকবে না। সব কেড়ে নেবে। রাজ্যটাকেই কেড়ে নেবে। কোথায় যাবেন? তখন ডিটেনশন ক্যাম্প করবে। আমরা থাকতে কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প, কোনও এনআরসি করতে দেব না। এসআইআর-টা ভোটের তিন মাস আগে চালাকি করে করেছে।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “ছলনাধারী, ভোটকাটারি, অত্যাচারী, স্বৈরাচারী বাংলাবিরোধী এই বিজেপি-কে একটি ভোটও দেবেন না।” দলীয় নেতাদের উদ্দেশে মমতা বলেন, “সকলকে নিয়ে কাজ করুন। এটা আমার নির্দেশ।”
তৃণমূলনেত্রী বলেন, “খেলা তো হবেই। খেলা তো শুরু হয়ে গিয়েছে। খেলাটা বাকি কোথায়!” বিজেপি-কে আক্রমণ শানিয়ে মমতা আরও অভিযোগ করেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যে ‘মাছ-মাংস-ডিম খাওয়া বন্ধ’।
মমতা বলেন, “আমরা যা বলি, সেটি করি। বলেছি, কিন্তু করিনি— এমন একটাও দেখাতে পারবেন না। সব কাঁচাবাড়ি পাকা করে দেব। প্রতি ঘরে ঘরে নলবাহিত জল পৌঁছে দেব। কৃষকদের জন্য আলাদা বাজেট হবে। দুয়ারে স্বাস্থ্য ক্যাম্প করব।”
মমতা বলেন, “সিপিএমের আমলে কবে মাইনে পাবেন কেউ জানতেন না। এখন তো সরকারি কর্মচারীরা ২৫ শতাংশ ডিএ-ও পেয়ে গিয়েছেন। আমাদের আমলে তৈরি করা নয়। আগেকার যে এরিয়ার পড়ে ছিল, সেইগুলো।”
মমতা বলেন, “আমরা প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা করে দিয়েছি। রাস্তার টাকা বন্ধ। গ্রামীণ কাঁচাবাড়ি নতুন করে তৈরি করার টাকা বন্ধ। ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ। জলস্বপ্নের টাকা বন্ধ। ২ লক্ষ কোটি টাকার উপর আমরা পাই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। ওরা নাকি পশ্চিমবঙ্গকে ভাতে মারবে। আমি বলি ক্ষমতা থাকলে চেষ্টা করো।”
মমতা বলেন, “যুবসাথী ভিক্ষা বা ভাতা নয়। এটা পকেটখরচা। তাঁদের চাকরির জীবিকার সন্ধান, আমরা আস্তে আস্তে করে দেব। যাঁরা এখনও পাননি, তাঁরাও পেয়ে যাবেন। সারা দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে আমরা বেকারত্ব কমিয়েছি।”
কমিশন এবং বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “গতকাল ৩০ হাজার নাম ঢুকিয়েছে আলাদা। অনেক ভোটারের নামে অবজেকশনও দিয়েছে। সেটা যেন কিছু করতে না পারে, সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে।” ওই ৩০ হাজার নাম আসলে ভিন্রাজ্যের বাসিন্দাদের নাম।
মমতা বলেন, “আমি সেই কর্মীকে ভালবাসি যে নেতাগিরি না করে, মানুষের পায়ে বসে থাকে। মানুষের সাথে, মানুষের দুঃখে সুখে কাজ করে। তাদের আমি বিশ্বাস করি। তারা আমাদের সম্পদ।”
মমতা বলেন, “২০২৪ সালে আপনারা সকলে ভোট দিয়েছেন। মোদীজি ওই ভোটে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। অমিত শাহ নির্বাচিত হয়েছেন ওই লিস্টে। তা হলে পশ্চিমবঙ্গকে টার্গেট করে ভোটের তিন মাস আগে আপনাকে স্পেশাল রিভিশন করতে হল কেন! ২০০২ সালের পরে আপনি এত বছর কেন করেননি।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “বছরে ২ কোটি বেকারকে চাকরি দেবে বলেছিলে। একটাও দিয়েছো? কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আমরা ২ কোটি ছেলেমেয়ের চাকরি দিয়েছি। চাকরি দিতে গেলেই কোর্টে চলে যাচ্ছে। আর পিল (পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন) খাচ্ছে। কোনও বিচার পাওয়ার জায়গা আজকে নেই। আজ মানুষকে পদে পদে ধাক্কা খেতে হয়। সংবিধান মানে না। অমিত শাহ, মোদী যে কী সাংঘাতিক নেতা কল্পনা করতে পারবেন না। এরা মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না।”
মমতা বলেন, “লক্ষ্মীর ভান্ডার যাঁরা নাম লিখিয়েও এখনও পাননি, তাঁরা পেয়ে যাবেন। যত দিন বাঁচবেন মায়েরা-বোনেরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পাবেন। এখানে কোনও ধর্ম-বর্ণ নেই। কোনও জাত-পাত নেই।” এ প্রসঙ্গে বিহারে ভোটের আগে বিজেপির আট হাজার টাকা করে যে আর্থিক সুবিধা ঘোষণা করেছে, সে কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সেই জায়গায় পশ্চিমবঙ্গে প্রতি মাসে ১৫০০ টাকার হিসাবে পাঁচ বছরে কত টাকা হয়, সেই প্রশ্ন করেন মমতা।
মমতা বলেন, “আলুচাষিরা অনেকেই প্রবেলেমে আছেন। মনে রাখবেন, আপনাদের চিন্তা করার কোনও কারণ নেই। কৃষকদের যেমন শস্যবিমা আছে, তেমন আলুচাষিদের জন্যও আমরা শস্যবিমা করেছি। কারও একটি আলুও নষ্ট হলে, তিনি ক্ষতিপূরণ পাবেন। মনে রাখবেন, কেউ চাষির পেটের ভাত মারবেন না। তা হলে কিন্তু আমি ভয়ানক হয়ে যাই।”
গড়বেতা বিধানসভা কেন্দ্রে কী কী উন্নয়নমূল কাজকর্ম হয়েছে, সেই খতিয়ান তুলে ধরেন মমতা। আইটিআই, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তা এবং সেতু নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন তিনি। জানান, গড়বেতায় জলস্বপ্ন প্রকল্পে ৩৫টি কাজ হয়েছে। বাস টার্মিনাস তৈরির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
মমতা বলেন, “লালগড়ের দিনগুলো আমি কোনও দিন ভুলি না, আমার মাথায় থাকে।” তিনি আরও বলেন, “একসময় এই সব অঞ্চল সন্ত্রাসের অঞ্চল ছিল। মানুষ বেরোতে পারতেন না। চার দিকে রক্ত আর রক্ত। বছরে ৪০০-র বেশি মানুষ মারাও গিয়েছেন। আমাদের অনেক পুলিশকর্মীকেও একসঙ্গে খুন করা হয়েছিল। আমি তার পর গিয়েছিলাম। আপনারা সকলে লালগড়ের ঘটনা জানেন। নেতাইয়ের ঘটনা জানেন।”
মমতা আরও বলেন, “গড়বেতার একটি ঘটনা আপনাদের কাছে বলি। একজন বিধবা মা আমাকে বললেন, মা আমাকে একটা তৃণমূলের পতাকা আর একটা বন্দুক দিতে পারো! আমি বললাম, কেন মা, বন্দুকের কথা কেন বলছো? উনি বললেন, আমার দুটো ছেলেকে খুন করেছে। আমি এক হাতে তৃণমূলের পতাকা নিয়ে, আর এক হাতে বন্দুক নিয়ে এর প্রতিশোধ নেব। আমি বললাম, তুমি মাথা ঠান্ডা করো। কিন্তু তুমি এক দিন না এক দিন বিচার পাবে।”
গড়বেতার মাঠে পৌঁছোলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
চন্দ্রকোনার সভার পরে গড়বেতার দলীয় প্রার্থী উত্তরা সিংহের হয়ে প্রচারসভায় বক্তৃতা করবেন মমতা। গড়বেতা হাই স্কুলের মাঠে এই জনসভা থেকে তৃণমূলনেত্রী কী বার্তা দেন, তা শোনার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন দলের কর্মী-সমর্থকেরা।