গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
দেওয়ালে জাফরির নকশা। তবে রং দুধ সাদা নয়, খানিক লালচে পাথুরে ভাব। নেপথ্যে আখতারি গজ়ল। সে দিকে কান পেতে একটু পাশে তাকাতেই চোখে পড়বে ঝলমলে গয়না আর ঘের দেওয়া নাচের পোশাকে বাঈজির পেন্টিং। সিলিংয়ে কাশ্মীরি কাঠের কারুকাজ করা প্যানেল। তা থেকে ঝুলছে ঝাড়বাতি। তার নরম আলো এসে পড়েছে সাদা-কালো চক মেলানো মেঝেয়। ঘড়ি বলছে, সময় সকাল সাড়ে আটটা। আর এই পরিবেশ তৈরি হয়েছে এক রাজকীয় প্রাতরাশের জন্য।
ফাইন বোন চায়নায় কাঁটা চামচের টুং টাং শব্দ তোলা প্রাতরাশের টেবিল নয়। যেমনটা গত কয়েক যুগ ধরে বাঙালি ‘রাজকীয় প্রাতরাশ’ ভেবে খেয়ে এসেছে। এই প্রাতরাশ পরিবেশন করা হয় কাঁসার থালা-বাটি-গ্লাসে। সসেজ-সালামি-বেকন, বেকড বিনস, হ্যাশব্রাউন বা টোস্ট-চিজ়-ওমলেটের কোনও জায়গা নেই সেখানে। আধঘণ্টার মধ্যে ঝটপট তৈরি করে ফেলাও যায় না। এ প্রাতরাশ খেতে এবং খাওয়াতে হলে হাঁড়ি চড়াতে হয় আগের রাত থেকে। সারা রাত ধরে ঢিমে আঁচে রান্না না হলে স্বাদ আসে না। ‘ইংলিশ ব্রেকফাস্ট’ নয়। এটি খাঁটি ভারতীয় ‘অওধি প্রাতরাশ’।
যেমন যে কোনও ভাল জিনিসের জন্যই কিছু বেশি সময় দিতে হয়। রাজকীয়তা এবং আভিজাত্য যেমন তিলে তিলে তৈরি হয়, এ খাবারও তেমনই। শুধু বাইরে থেকে দেখতে বাহারি নয়। এর আসল বাহার-এর জন্য ব্যয় করা হয় সময়, পরিশ্রম আর আন্তরিকতা।
২০২৬ সালে দুনিয়া যখন ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে আবার ‘স্লো লিভিংয়ে’ ফিরতে চাইছে, তখন ভারতীয় স্লো কুকিংয়ের এই খাবারই নতুন করে ফিরছে বাংলার খাদ্য মানচিত্রে। যে বাংলার ইতিহাস অওধের নবাবিয়ানায় সমৃদ্ধ।
এ দেশের বিলাসিতাকে রূপক অর্থে বলা হয় নবাবিয়ানা। এ খাবারও সেই নবাবদেরই ভোজ্য ছিল। লখনউ হোক বা হায়দরাবাদ— নবাবদের সাত সকালের উপোস ভাঙার জন্য রাত জেগে খাবার বানাতেন তাঁর পাকশালের সেরা রাঁধুনিরা। মেনুতে থাকত নিহারী, পায়া সোরবা, হালিম, বাদামের হালুয়া-সহ আরও নানা খাবার।
মনে হতেই পারে, সাত সকালে অত তেল-মশলাদার খাবার! অস্বাস্থ্যকর নয়? কিন্তু ভেবে দেখুন তো, এ যুগে সকালে রাজকীয় এবং স্বাস্থ্যকর প্রাতরাশ ভেবে যে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট খাচ্ছেন, তাও কি অস্বাস্থ্যকর নয়? প্রক্রিয়াজাত মাংস দিয়ে তৈরি সসেজ, বেকন, সালামিকে তো কবেই ক্যানসারপ্রবণ বলে দেগে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’! তা ছাড়া সাত সকালে পুঁটিরামের দোকানের সামনে কচুরি-জিলিপির লাইন-ই বলে দেয়, বাঙালি সকালবেলায় তেল-মশলা খেতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই।
ফলে কোনও এক ছুটির সকালে যদি আখতারি গজ়ল শুনতে শুনতে, ঝাড়লণ্ঠনের আলোয়, চকমেলানো ফ্লোরিংয়ের উপর কালো কাঠের টেবিলে সাজানো হয় কাঁসার থালা-বাটি। একে একে তাতে পরিবেশন করা হয়, শাহি নিজামি হালিম, নিহারি খাস, পায়া সোরবা, কিমা কলেজি, ব্রেন মশালা— তবে অবাক হবে না। জানবেন বাঙালির নবাবিয়ানা আর বিরিয়ানি কাবাবে আটকে নেই। তা প্রাতরাশের টেবিলও দখল করতে পেরেছে। আর এমন প্রাতরাশের লক্ষ্য কেবল পেট ভরানো নয়, বরং স্বাদের গ্রন্থির মাধ্যমে খাদ্যরসিককে এক অন্য দুনিয়ায় সফর করানো।
শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর ইমেল-নোটিফিকেশনের ব্যস্ততাকে সরিয়ে রেখে যদি ছুটির সকালে নিজেকে একটু ‘নবাবী’ মেজাজে দেখতে চান, তবে এই অওধি প্রাতরাশ একই সঙ্গে প্রাতর্ভ্রমণ এবং উপোস ভঙ্গ— দুই-ই করাবে। শহরে এখন সে সুযোগও রয়েছে। প্রতি রবিবার দেশপ্রিয় পার্কের ‘অওধ ১৫৯০’-এ বসছে অওধি প্রাতরাশের আসর। সেই সাদা পাথুরে রঙের জাফরি, ঝাড়লণ্ঠন, চকমেলানো মেঝে আর কাশ্মীরী কাঠের প্যানেলের নকশাওয়ালা খাবার টেবিলে পেতে ফেলুন আপনার প্রাতরাশের আসর।