এর চেয়ে মাধ্যমিক দেওয়া ভাল

ভোট খতম। কিন্তু টেনশন তো এখনও তালাবন্ধ ভোট মেশিনে। তাই কর গুনে দিন কাটছে ওঁদের, আর কত দিন! হাপিত্যেশ করে বসে থাকা প্রার্থীদের কথা আনন্দবাজারের পাতায়। মনে ভিতরে ধুকপুকুনি আছে যথেষ্টই। যত দিন যাচ্ছে, সেই ধুকপুকুনি বাড়ছে বই কমছে না। সেই কবে ভোট শেষ হয়েছে। কিন্তু, রেজাল্ট বেরনোর নামই নেই! কিছুদিন আগেও ভোটের প্রচারে পরস্পরের মুন্ডুপাত করা মিনতি মিশ্র ও শম্পা দরিপা অন্তত একটা বিষয়ে একমত— ‘মাঝের সমময়টা আর পেরোতে চাইছে না’!

Advertisement

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০১৬ ০২:২১
Share:

দুই প্রার্থীর এক দিন। সিরিয়ালে চোখ তৃণমূলের মিনতি মিশ্রের। (ডান দিকে) ঘর গোছাতে ব্যস্ত জোটের শম্পা দরিপা। ছবি: অভিজিৎ সিংহ।

মনে ভিতরে ধুকপুকুনি আছে যথেষ্টই। যত দিন যাচ্ছে, সেই ধুকপুকুনি বাড়ছে বই কমছে না। সেই কবে ভোট শেষ হয়েছে। কিন্তু, রেজাল্ট বেরনোর নামই নেই! কিছুদিন আগেও ভোটের প্রচারে পরস্পরের মুন্ডুপাত করা মিনতি মিশ্র ও শম্পা দরিপা অন্তত একটা বিষয়ে একমত— ‘মাঝের সমময়টা আর পেরোতে চাইছে না’!

Advertisement

টিভিতে একটার পর একটা সিরিয়াল শুরু হচ্ছে আর শেষ হয়ে যাচ্ছে! দিনগুলো খুব বড় মনে হচ্ছে বাঁকুড়া বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী, বিদায়ী বিধায়ক মিনতি মিশ্রের। “কী করব? কোথায় যাব? যে আত্মীয়ের বাড়িতেই যাই না কেন, আমার টেনশন দেখে তাদেরও তাল কেটে যাচ্ছে!”— বাঁকুড়া শহরের ফার্স্ট ফিডার রোডের বাড়িতে বসে এক নাগাড়ে কথাগুলো বললেন মিনতিদেবী। একরাশ বিরক্তি নিয়ে তিনি যুক্ত করছেন, “এত দেরিতে কেউ রেজাল্ট বের করে! আরে বাবা, যা হওয়ার হবে। আর ও-সব ভাবতে ভাল লাগছে না।’’

ভোট ঘোষণা হওয়ার পর প্রায় একটা মাস কেটেছে বিপুল ব্যস্ততার মধ্যে। ভোটও হয়েছে সেই ১১ তারিখ। তার পর থেকেই কোনও কাজ নেই। ফল বেরোতে এখনও ২০ দিন। ভোট শেষ হওয়ার পর প্রথম দিকে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরছিলেন। এখন তা-ও আর হচ্ছে না। দিনভর কী করছেন এখন? মিনতিদেবী জানাচ্ছেন, সকাল থেকে টিভিতে সিরিয়াল দেখে দিন কাটছে তাঁর। সন্ধ্যের দিকে দলীয় অফিসে গিয়ে বসছেন। সারাক্ষণই বাড়িতে একের পর এক কর্মী আসছেন। বাড়ি বয়ে এসে তাঁরা কোন অঞ্চল থেকে কত লিড মিলবে, তার হিসাব জানিয়ে যাচ্ছেন। তবে, এই সবও এখন একঘেয়ে ঠেকছে প্রার্থীর কাছে! সারাক্ষণ ভোটের কথা শুনতেও ভাল লাগছে না। আবার টিভির সিরিয়ালেও মন বসছে না। প্রার্থীর মন যে পড়ে আছে স্ট্রং রুমে! সেখানে রাখা ইভিএম-গুলো কার পক্ষে কথা বলে, তা ১৯ মে-র আগে জানার উপায় নেই। অস্বস্তির কারণ এখন এটাই। মিনতিদেবী নিজেই বলছেন, “রেজাল্ট নিয়ে ভাবতে চাইছি না। আবার না ভেবেও তো পারছি না। মনের মধ্যে সবসময় একটা কী যেন খচখচ করছে। কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না।’’

Advertisement

ফার্স্ট ফিডাররোডের বাসিন্দার মনে যখন টেনশন, তখন স্কুলডাঙার বাসিন্দাও নিজের নার্ভাস ভাব বিশেষ লুকিয়ে রাখতে পারছেন না। ড্রেসিং টেবিল ভরে পড়ে রয়েছে দামি ব্র্যান্ডের নেলপলিশ, লিপস্টিকে। কিন্তু, সে সব আর মন টানতে পারছে না বাঁকুড়ার জোট প্রার্থী শম্পা দরিপার। বরং কিছুটা হলেও শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন ‘ছত্রপতি শিবাজী’ বা রবীন্দ্রনাথের জীবনী বিষয়ক বইয়ে। তবে তার বাইরেও পড়ে থাকছে অনেকটা সময়! কখনও ফাইলপত্রের থাক গোছাচ্ছেন, কখনও অগোছাল আলমারি ঘাঁটছেন। সন্ধ্যের দিকে বাড়ির দলীয় অফিসে কর্মীদের সঙ্গে বসছেন। তবে তাঁরও মন চলে যাচ্ছে খ্রিস্টান কলেজের স্ট্রং রুমের দিকে। “মাঝে মাঝে যখন ওই কলেজের পাশ দিয়ে পার হচ্ছি, মনটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে”— জানাচ্ছেন বাঁকুড়ার প্রাক্তন পুরপ্রধান শম্পাদেবী। বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন গ্রামের মানুষজন বাড়ি বয়ে এসে জানিয়ে যাচ্ছেন ‘আপনাকেই ভোট দিয়েছি’। সে-সব শুনেও মুখে হাসি ফুটছে না তাঁর।

শম্পাদেবীর এক কথা, “মানুষ কাকে সমর্থন করেছেন, তার আগাম অনুমান করা কঠিন। আমার দলের কর্মীরা লিডের নানা পরিসংখ্যান দিচ্ছেন। তবে, আমি তাকিয়ে আছি ১৯ মে-র দিকে। ওটাই আসল দিন।’’ তবে সেই দিন তো এখনও অনেক দূর! মাঝের এই সময়টা তাই পার হতেই হচ্ছে না! শম্পাদেবী বলছেন, “ভোটের কথা আর শুনতে ভাল লাগছে না। টিভিতে খবর দেখাও ইদানীং বন্ধ করে দিয়েছি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দিনভর একটা অস্বস্তি ভাব রয়েছে মনের মধ্যে। হাজার চেষ্টাতেও সেটাকে কাটিয়ে উঠতে পারছি না।’’

মিনতিদেবী বা শম্পাদেবী টেনশনে ভুগলেও অনেকটাই অন্যরকম দিন কাটাচ্ছেন বাঁকুড়া কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সুভাষ সরকার। মোদীর দলের এই রাজ্য নেতার ঘরে কড়া নাড়তে জানা গেল, ‘ডাক্তারবাবু’ বাড়িতে নেই! ফোনে সুভাষবাবু জানালেন, তিনি ভোট প্রচারে কলকাতায় রয়েছেন। রেজাল্ট নিয়ে টেনশন হচ্ছে না? সুভাষবাবুর জবাব, “আমার সময়ই নেই টেনশন করার। গোটা রাজ্যে ভোট প্রচারে যেতে হচ্ছে। নিজের ফল নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?’’ জানালেন, বাঁকুড়ায় ভোট পর্ব শেষ হওয়ার পর থেকেই তিনি রাজ্যের অন্য কেন্দ্রগুলিতে নজর দিয়েছেন। কার্যত চষে বেড়িয়েছেন বীরভূম থেকে উত্তরবঙ্গ, হাওড়া, কলকাতা। সুভাষবাবুর কথায়, “আমার এখন দম ফেলারই ফুরসত নেই। দিনগুলো যে কী ভাবে পার হয়ে যাচ্ছে, টেরই পাচ্ছি না।’’

কর্মব্যস্ততার জেরে সুভাষবাবু পার পেয়ে গেলেও তাঁর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মিনতিদেবী ও শম্পাদেবীর অস্বস্তি থাকছেই। দুই প্রার্থীর এক রা— “ভোট পরীক্ষার চেয়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক দেওয়া ঢের ভাল।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement