West Bengal Assembly Election 2026

ভোটকুশলী অমল বিজেপিতে, মানসের সবংয়ে রামায়ণের ছায়া?

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১২
Share:

— প্রতীকী চিত্র।

আপনজন বেরিয়ে গিয়ে যোগ দিয়েছেন ‘শত্রু’ শিবিরে। ফলে, এ যেন লঙ্কা দখলের লড়াই!

পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ে গত চার দশকেরও বেশি সময়ের বিধায়ক তথা রাজ্যের বিদায়ীমন্ত্রী মানস ভুঁইয়ার অন্যতম ভোট-কারিগর অমল পান্ডাকে মানসের বিরুদ্ধেই প্রার্থী করেছে বিজেপি। আর অমলের দোসর হয়েছেন প্রাক্তন তৃণমূল নেতা অমূল্যমাইতি। যিনি ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে সবংয়ে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে মানসেরকাছে হেরে গিয়েছিলেন। বিজেপির দাবি, তৃণমূলের অস্ত্রেই এ বার মানসকে কাত করা হবে। যদিও সেই দাবিকে ‘...পথ চাওয়াতেইআনন্দ’ বলে ঠাট্টা করছেন মানসের ঘনিষ্ঠেরা।

সবং থেকে মোহাড় যাওয়ারপ্রধান রাস্তা ছেড়ে দুবরাজপুরের ভিতরে গাড়ি ঘোরাতেই টের পাওয়া গেল, বিজেপি কেন এ বার মানসকে বেগ দেওয়ার কথা জোরগলায় বলছে। খাল দিয়ে ঘেরা, ঢালাই চটে যাওয়া সঙ্কীর্ণ রাস্তা ধরেদুবরাজপুর বাজারের কাছে গ্রামে পৌঁছতেই গাড়ির ঝাঁকুনিতে রীতিমতো কাহিল দশা। রামনবমীর পরদিন দুপুরে সেখানে এক দলীয় কর্মীর বাড়িতেই মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। অমল এবং এ বার তাঁর নির্বাচনী এজেন্টঅমূল্যের দেখাও মিলল সেখানে। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন অমূল্য। হাসতে হাসতেবললেন, ‘‘রাস্তা দিয়ে কি খুব আরামে এলেন? দেখুন, গ্রামের ভিতরেররাস্তার কী হাল! চার-পাঁচ বছরেই ঢালাই রাস্তা কী ভাবে খারাপহল? আমি হাসতে হাসতে অমলদাকে খোঁটা দিই, তৃণমূলের এমন উন্নয়ন নিয়ে। ২০২১ সালে আমি স্বল্প ব্যবধানে মানসবাবুরকাছে হেরেছিলাম। আমাকেহারানোর অন্যতম কারিগর ছিলেন অমলদা। মনে সেই জ্বালা তোআছেই। তা-ও অমলদা এ বার আমাদের দলে। একসঙ্গে লড়ব তৃণমূলের বিরুদ্ধে।’’

জ্বলছেন অমলও। তাঁর অভিযোগ, ২০২১-এ মানসকে জেতানোর পরেও তাঁর নামের পাশে‘গদ্দার’ তকমা সেঁটে দিয়েছিলেন মানসই। এর পরে আচমকাই তাঁকে ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যানের পদ থেকে সহ-সভাপতির পদে নামিয়ে দেওয়া হয়। অমলের কথায়, ‘‘সবংয়ে মানসবাবুর উপরে কেউ কথা বলতে পারেন না। ওঁর যেটা মনে হয়, সেটাই করেন। ২০২১-এ ওঁকেজিতিয়ে আনার পরেও ওঁর মনে হল, বিজেপির সঙ্গে আঁতাঁত করে ভোট কমিয়েছি। আমাকে সহ-সভাপতির পদে নামিয়ে দেওয়া হল। সেই অসম্মান মানতে পারিনি। তৃণমূলের সর্বস্তরে জানিয়েও বিচার পাইনি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘এখানে কোনওদিনই বিরাট ব্যবধানে মানসবাবু জেতেননি। রেকর্ড ভোট পেয়েছিলেন ২০১৬ সালে কংগ্রেসে জোটের প্রার্থী হয়ে। তার পরে উনি রাজ্যসভায় গেলেন। উপ-নির্বাচনে ওঁর স্ত্রীকেও জিতিয়ে এনেছি।’’

কাছের লোক গিয়েছেন রাম-শিবিরে। এ বারের সবং কি তা হলে রামায়ণের মতো? আগের দিন রামনবমী উপলক্ষে উদয়াস্ত ব্যস্ত থাকলেও পরদিন অবশ্য রামায়ণের গল্প নিয়ে আগ্রহ শোনা গেল না রাজ্যের বিদায়ীসেচমন্ত্রী তথা তৃণমূল প্রার্থী মানসের গলায়। বললেন, ‘‘আমি সবংয়ের মাটিতে বসে কে বিভীষণ, কে রাম, কে রাবণ— এই সব গল্পের চরিত্র নিয়ে কথা বলতে রাজি নই। যাঁর কথা বলতে চাইছেন, তাঁকে আমাদের দলঅনেক সম্মান দিয়েছে। তাঁকে বলা হয়েছিল, মন দিয়ে দল করতে। কিন্তু তিনি বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। বিজেপিতে চলে গিয়েছেন।’’ বিজেপি কি আপনার অস্ত্রেই আপনাকে মাত দেওয়ার কথা ভাবছে?মানসের জবাব, ‘‘বিজেপি কী ভাবছে, তা নিয়ে ভাবি না। আমার কাছে সবংয়ের মানুষের কথার গুরুত্ব অনেক বেশি। এ বার আমার ৪৬ বছর হবে বিধায়ক হিসেবে। এখানে আমাকে ‘দাদু, জেঠু, কাকু’ বলে লোকজন সম্বোধন করেন। এঁরাআমার পরিবার। আমি সকালে গরিব মানুষের চিকিৎসা করি। তার পরে নির্বাচনের প্রচারে বেরোই।’’

ভোটের সময়ে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে সবংয়ে দলীয় কার্যালয়ের পাশে এক আইনজীবীর অ্যাসবেস্টসের চালের বাড়িই আপাতত মানসের ঠিকানা। দলীয় কার্যালয়ে অপেক্ষা করার সময়ে দেখা গেল, এক বৃদ্ধ ও এক ব্যক্তি এসেছেন শ্মশান এলাকায় মোরামের রাস্তা তৈরির জন্যদরবার করতে। প্রচারে বেরোনোর আগে অ্যাসবেস্টসের চালের বাড়িতে বসে মানস যখন রুটি, আলু-কুমড়োর তরকারি ও টক দই দিয়ে খাওয়া সারছেন, তখনসেখানে ‘প্রবেশাধিকার’ পেল সংবাদমাধ্যম। মানস খাওয়া সেরে এসে বসলেন দলীয় কার্যালয়ে।সবংয়ে রাস্তা, খালের উপরে সেতু, বাস স্ট্যান্ড তৈরি-সহ উন্নয়নের দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরার ফাঁকে উত্তেজিতহয়ে টেবিল চাপড়ে বললেন, ‘‘এগারোশো বিবেচনাধীন ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে সবংয়ে। তাঁদের মধ্যে মহিলা, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীরা রয়েছেন। তাঁদের অপরাধ, তাঁরা আমার নেত্রীকে ভালবাসেন। আমি ওঁদের নিয়ে আইনের দ্বারস্থ হচ্ছি।’’

এ বারের ভোটেও জয় এক প্রকার নিশ্চিত ধরে নিয়ে মানসসবংয়ের রুইনানে বাস স্ট্যান্ড, অজস্র রাস্তা আর সেতু তৈরির কথা জানালেন। পাশাপাশি, নিজের এলাকায় একটি ২০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। বললেন, ‘‘মেদিনীপুর শহরকে চিকিৎসার দিকথেকে উন্নত করাই আগামীদিনের লক্ষ্য। এখানকার লোকজন দালালের মাধ্যমে বাইরের রাজ্যে চিকিৎসা করাতে গিয়েসর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এখানে জমি রয়েছে। ২০০ শয্যার একটি হাসপাতাল করার জন্য আগামী সরকারেরকাছে আবেদন জানাব। সরকারসাহায্য না করলে পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেলে হাসপাতাল তৈরি করব।’’ সবংয়ে ৫২টি এবং পিংলায় ১৮টি জল প্রকল্পের কথাও জানান মানস।

এলাকায় মানসের উন্নয়নের কাজ বলতে প্রথমেই উল্লেখ্য,কেলেঘাই-কপালেশ্বরী নদী সংস্কার প্রকল্পের কথা। কিন্তু বহু দশকের এই প্রকল্পে সবং বিধানসভাকেন্দ্র জুড়ে খুব যে কাজের কাজ হয়েছে, এলাকাবাসীর একটি বড় অংশই তা মানেন না। এখন আবার সঙ্গে জুড়েছে ‘ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান’। এই প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করে রাজ্য একাই কাজে নেমেছে। কিন্তু সেখানেও নদী-খাল সংস্কার যথাযথ ভাবে হচ্ছে না বলে অনুযোগ এলাকাবাসীর। মানসের বিধানসভা কেন্দ্র তৃণমূলের ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার মধ্যেই পড়ে। তিনি দীর্ঘ দিন রাজ্যের সেচমন্ত্রী। ফলে, চার দশক পার করা বিধায়কের সামনে এই প্রশ্নগুলি থাকছে।

মানসের উন্নয়নের তালিকাকে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে নাবিজেপি-ও। প্রার্থী অমল দুবরাজপুরে দলীয় কর্মীর মাটির বাড়ির দাওয়ায় বসে বললেন, ‘‘বাস স্ট্যান্ড তৈরির সময়ে উনি বলেছিলেন, বিদেশিবাস আসবে। এ পর্যন্ত একটি সরকারি বাসও ওখানে আসেনি। উনিসেচমন্ত্রী, তাই সেতু তৈরি করতে পারেন। কিন্তু জাতীয় সড়ক ছেড়ে গ্রামে ঢুকলেই টের পাবেন, রাস্তার দুরবস্থা। ঢালাই রাস্তা ভেঙে নষ্ট হয়ে গিয়েছে অসংখ্য জায়গায়।’’সেচ দফতরের ‘লো কস্ট ড্রেজিং’ প্রকল্পকে কটাক্ষ করে অমূল্যের অভিযোগ, ‘‘ওই ভাবে মানসবাবু নদীর মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন।’’ যদিও অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল শিবির।

দু’জনেই এখন বিজেপিতে। কিন্তু তাঁরা একটি অসাম্প্রদায়িক বলে দাবি করা একটি দল থেকে এসেছেন। বিজেপি কিংবা সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দুত্ববাদের অভিযোগ উঠেছে বার বার। অমল-অমূল্য কি সেইভাবনায় বিশ্বাসী হতে পেরেছেন? অমূল্যের দাবি, ‘‘বিজেপি রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে। ভারতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরোধী নয়। সবংয়ে বহু সংখ্যালঘু মানুষ বিজেপির হয়ে লড়ছেন। বিজেপি মোটেই উগ্র হিন্দুত্ববাদের কথা বলে না।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন