Special Intensive Revision

নাম তোলার চিন্তা, ব্যস্ততায় ক্ষতি রুটিরুজির

হুগলি গ্রামীণ এলাকার জাঙ্গিপাড়া, হরিপাল, ধনেখালি, বলাগড়, সপ্তগ্রাম এবং পান্ডুয়াবিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দাদের অধিকাংশের জীবিকা মূলত কৃষিনির্ভর। কিন্তু ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া তাঁদের জীবনটাইওলটপালট করে দিয়েছে।

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৯
Share:

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানুষজন ভিড় জমিয়েছেন পান্ডুয়া ব্লক অফিসে। ছবি: সুশান্ত সরকার।

বয়স বিরাশি ছুঁইছুঁই। অশক্ত শরীরে কষ্ট করে বাড়ির উঠোনে বসলেন। হুগলির জাঙ্গিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা আঙুরবালা চিত্রকর। সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম বাদ গিয়েছে তাঁর। স্বামী পঁচিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন।ভাইয়ের কাছে থাকেন বৃদ্ধা। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়ায় চিন্তা বেড়েছে। বললেন, ‘‘আমার এখানেই জন্ম। সাত পুরুষ বাস করছি।এত বছর ধরে ভোট দিলাম। কত দিন বাঁচব জানি না। এখন জানতে পারছি, ভোটার তালিকায় আমার নাম নেই।’’ আঁচলে চোখ মুছতেমুছতে বললেন, ‘‘২০০২-এর ভোটার তালিকায় স্বামীর নাম ছিল না। অনেক কাগজপত্র জমা দিয়েওলাভ কিছু হল না। এখন কী হবে কিছুই জানি না!’’

হুগলি গ্রামীণ এলাকার জাঙ্গিপাড়া, হরিপাল, ধনেখালি, বলাগড়, সপ্তগ্রাম এবং পান্ডুয়াবিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দাদের অধিকাংশের জীবিকা মূলত কৃষিনির্ভর। কিন্তু ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া তাঁদের জীবনটাইওলটপালট করে দিয়েছে। দিন আনা-দিন খাওয়া মানুষগুলি রুটি-রুজি ভুলে ‘নাগরিকত্ব’-এর প্রমাণ দিতে হন্যে হয়ে দৌড়চ্ছেন। এলাকার অনেকে রাজ্যের বাইরে কাজ করেন। তাঁদের অভিযোগ, এসআইআর-প্রক্রিয়ার জন্য তাঁরা কাজে যেতেপারছেন না। ভোটের দোরগোড়ায় বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির বড় অস্ত্র এসআইআর। আবার উল্টো দিকে নাম বাতিলের জন্য বিজেপি তৃণমূলকেই দুষছে। বিজেপির অভিযোগ, এসআইআর-এরপ্রাথমিক পর্যায়ে রাজ্য সরকারি তরফে বিএলও নিয়োগে গড়িমসির জন্যই এই দুরবস্থা।

২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনে হুগলি গ্রামীণ এলাকার এই ছ’টি বিধানসভা কেন্দ্রেই তৃণমূল জিতেছিল। পরেলোকসভা ভোটের নিরিখে সপ্তগ্রাম ও বলাগড় বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল পিছিয়ে ছিল। জাঙ্গিপাড়ার তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী পরিবহণমন্ত্রীস্নেহাশিস চক্রবর্তীর অবশ্য দাবি, ‘‘২০২৬-এর ভোটে আমরা ছ’টি আসনেই জিতব। ভোটারদেরনাম বাদ দিয়ে বিজেপি গায়ের জোরে জিততে চাইছে। এর ফল বুমেরাং হবে।’’ বিজেপি প্রার্থী প্রসেনজিৎ বাগের পাল্টা উত্তর, ‘‘এলাকায় ঘুরলেই বোঝা যাবে, কীরকম উন্নয়ন হয়েছে! পানীয় জল, রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো ন্যূনতম পরিষেবা কোথায়? ৪ মে সব কিছু পরিষ্কার হবে।’’

জাঙ্গিপাড়ার সিপিএম প্রার্থী সুদীপ্ত সরকার অবশ্য পরিস্থিতিরজন্য বিজেপি ও তৃণমূল, উভয়কেই দায়ী করছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘‘২০০২ সালে এসআইআর হয়েছিল। তখন মানুষ এত আতঙ্কিত,ক্ষতিগ্রস্ত হননি। ২০২৬-এ আরএসএসের পরিকল্পনায় তৃণমূল পরিচালনাধীন রাজ্য সরকারের মদতে এসআইআরের নামে মানুষকে পুরো বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এর দায় নিতে হবে উভয়কেই।’’

জাঙ্গিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ৫২০০ জন ভোটারের নাম বাতিল হয়েছে। ৬২০০ জন ‘বিবেচনাধীন’। জাঙ্গিপাড়ার অযোধ্যা,পশ্চিম গোবিন্দপুর ও দিলাকাশ গ্রাম এখন আলোচিত নাম। দিলাকাশ গ্রামের একটি বুথেই ৪৪ জন ভোটারের নাম বাতিল হয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দা শেখ রহমত আলির খেদ, ‘‘কাঠের কাজ করে, দিনমজুরি করে সংসার চালাই। ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়ায় সবকাজ ফেলে দৌড়তে হচ্ছে। দু’টি বাচ্চা মেয়ে। ভয় হচ্ছে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না!’’ পশ্চিম গোবিন্দপুরের একটি বুথে ৪৪ জন ভোটারের নাম বাতিল হয়েছে। এঁদের মধ্যে ৪০ জন সংখ্যালঘু। আবার জাঙ্গিপাড়ার উত্তর শ্রীরামপুর গ্রামের বুথে বাতিল হওয়া ছ’জনই হিন্দু।

হুগলি গ্রামীণ এলাকার ছ’টি বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন বিডিও অফিসে এখন থিকথিকেভিড়। নাম বাদ যাওয়া সংখ্যালঘু ভোটদাতারাই সেই ভিড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ৩০ মার্চ ধনেখালি বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখিয়েছেনসংখ্যালঘু মহিলারা। ছ’টি বিধানসভার মধ্যে সব থেকে বেশি নাম (ন’হাজার) বাদ গিয়েছে পান্ডুয়াকেন্দ্রে। ‘বিবেচনাধীন’ ১৪ হাজার। পান্ডুয়া ব্লক অফিসে গিয়ে দেখা গেল, নাম বাতিল হওয়ায় ফর্ম পূরণের লম্বা লাইন।

নিয়ালা গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ আলি বলছিলেন, ‘‘আমার বাবার, আমার ও ভাইয়ের নামবাতিল হয়েছে। এখানেই আমাদের জন্ম। পূর্বপুরুষদের এখানেই বসবাস।’’ তাঁর আক্ষেপ, ‘‘গুজরাতের রাজকোটে অলঙ্কার-শিল্পে কাজ করি। এসআইআরেরজন্য জানুয়ারি থেকে যেতে পারছি না।’’ পান্ডুয়ার খন্নান পশ্চিমপাড়ার একই পরিবারের পনেরো জনের নাম বাদ গিয়েছে। গৃহকর্তা শেখকাদের বলেন, ‘‘আমরা খুব গরিব লোক। দিনমজুরি করে সংসার চলে। এ বার কোথায় যাব?’’ পাশের বাড়ির একই পরিবারেরন’জনের নাম বাদ গিয়েছে। ওই বাড়ির শেখ আদম বলেন, ‘‘আমাদের পাঁচ ভাইয়ের নাম বাদ গিয়েছে। আমার মা ও স্ত্রী-র নাম নেই।একই অবস্থা বোন ও তাঁর স্বামীর। আমি পেশায় রাজমিস্ত্রি। আমাদের কী হবে?’’

সপ্তগ্রামে ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের সংখ্যা ন’হাজার। বাদ গিয়েছে ছ’হাজার।বলাগড়ে ‘বিবেচনাধীন’ আট হাজার ভোটার। সাড়ে সাত হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে।ধনেখালিতে ‘বিবেচনাধীন’ ও বাতিলের সংখ্যা যথাক্রমে তিন হাজার ও ১৯০০। হরিপালে ‘বিবেচনাধীন’ দশ হাজার। বাতিল প্রায় ১৮০০। বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের নাম বাদ যাওয়া মানুষদের একটাই অভিযোগ, ‘‘আমাদের জন্ম এখানেই। এত বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। হঠাৎ করে আমাদের কেন নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে? কেনই বা ভোটার তালিকায় তথ্যের বিভ্রান্তির জন্য নাম কাটা পড়বে? এর দায় কে নেবে?’’

হরিপাল স্টেশন থেকে দু’কিলোমিটার দূরে উত্তর হড়া গ্রামের বাসিন্দা দুই ভাই পলাশ দলুই এবং ভাস্কর দলুই। সামান্য চাষবাস করে সংসার চলে। পলাশ খেদের সুরে বলছিলেন, ‘‘২০০২ সালে ভোটার তালিকায় আমার বাবার নাম ভুল ছিল। পরে, সংশোধন করা হয়। এখন বাবার নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও আমাদের নাম নেই। কী যে হচ্ছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না!’’ ধনেয়াখালির চোপা গ্রামের বাসিন্দা মহিবুল ইসলাম অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী। মহিবুলের সঙ্গে পরিবারের আরও দু’জনের নাম নেই। মহিবুলের প্রশ্ন, ‘‘বছর পাঁচেক আগে চাকরি থেকে অবসরনিয়েছি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এ ভাবে উদ্বাস্তুর মতো বেঁচে থাকতে হবে?’’

পান্ডুয়ার তৃণমূল প্রার্থী সমীর চক্রবতী, সপ্তগ্রামের বিদেশ বসু বা ধনেখালির অসীমা পাত্রেরা এসআইআরের যাবতীয় দায় বিজেপির ঘাড়ে চাপাচ্ছেন। অভিযোগ উড়িয়ে পান্ডুয়ার বিজেপি প্রার্থী তুষার মজুমদারের পাল্টা ক্ষোভ, ‘‘আমার স্ত্রী সুপর্ণামজুমদারের নাম বাদ গিয়েছে। এ জন্য দায়ী তৃণমূল শাসিত রাজ্য সরকার। এসআইআর প্রক্রিয়া সরলীকরণে প্রথম থেকে সরকার সক্রিয় হলে পান্ডুয়ায় এত নাম বাদ যেত না।’’ এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা একে অন্যকে দোষারোপ করছেন। কিন্ত নাম বাতিল হওয়া ভোটারদের ভবিষ্যৎ কী? সে প্রশ্নের কেউ সদুত্তর দিচ্ছেন না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন