Malda Incident

প্রধান বিচারপতিরও ফোন ধরেন না? মোথাবাড়ি নিয়ে প্রশ্নের মুখে মুখ্যসচিব, সুপ্রিম কোর্ট জানাল, তদন্ত চালিয়ে যাবে এনআইএ-ই

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে গত সপ্তাহের বুধবার দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মালদহের মোথাবাড়ি, সুজাপুর-সহ বিভিন্ন এলাকা। সেই ঘটনার তদন্তভার এনআইএর হাতেই রেখে দিল সুপ্রিম কোর্ট। অন্য দিকে, সোমবারের শুনানিতে আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়েন রাজ্যের মুখ্যসচিবও।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ২০:১৫
Share:

কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

পুলিশ নয়, মালদহে বিচারকদের ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখানোর ঘটনার তদন্ত করবে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-ই। সোমবার মোথাবাড়িকাণ্ডের শুনানিতে এমনই নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানান, এই ঘটনায় স্থানীয় পুলিশের তদন্তের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তদন্তভার নিতে হবে এনআইএ-কে। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে আবার এক বার সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়লেন রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা। ঘটনার দিন কেন তিনি কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ফোন ধরেননি, সেই প্রশ্ন তুলে ভর্ৎসনাও করে শীর্ষ আদালত।

Advertisement

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে গত সপ্তাহের বুধবার দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মালদহের মোথাবাড়ি, সুজাপুর-সহ বিভিন্ন এলাকা। এসআইআরের কাজে নিযুক্ত সাত জন বিচারককে কালিয়াচক-২ ব্লক অফিসের ভিতরে রাত পর্যন্ত আটকে রাখে উত্তেজিত জনতা। সেই বিষয় গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। গত শুনানিতেই রাজ্য পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল শীর্ষ আদালত। সে দিনই তারা জানিয়েছিল, সিবিআই বা এনআইএ-কে দিয়ে তদন্ত করাতে হবে। সেই মতো কমিশন তদন্তভার এনআইএর হাতে দেয়। তবে এখনও পুরোপুরি তদন্তভার নিতে পারেনি এনআইএ। সোমবারের শুনানিতে তারা জানায়, কিছু অভিযোগ নিয়ে সমস্যা আছে। সেই কারণে এনআইএ তদন্তভার নিতে পারছে না।

এনআইএর আইনজীবীর কথা শুনে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন এই তদন্ত এনআইএ-কে দিয়েছে। এনআইএ একটি প্রাথমিক স্ট্যাটাস রিপোর্ট মুখবন্ধ খামে জমা করেছে। ঘটনার তদন্ত স্থানীয় পুলিশ নয়, করবে এনআইএ-ই।’’ কেন স্থানীয় পুলিশ নয়? শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘‘সংশ্লিষ্ট এফআইআরগুলি রাজ্য পুলিশ করেছে। কিন্তু স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এফআইআরগুলির কারণ যাই হোক না কেন, সবগুলিই এনআইএ তদন্তের অধীনে নেওয়া হবে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে আমরা নির্দেশ দিচ্ছি— এই এফআইআরগুলি এনআইএ-ই তদন্ত করবে।’’

Advertisement

মালদহ কাণ্ডে এখনও পর্যন্ত ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মোট ১২টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। সন্দেহভাজনের তালিকায় রয়েছেন ৩০৯ জন। সব মিলিয়ে মোট ৪৩২ জন তদন্তকারীদের আতশকাচের নীচে। সেই বিষয় উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘ওই ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছেন বলে মনে হয়। তবে এনআইএ নতুন এফআইআর দায়ের করতে পারবে। তদন্ত রিপোর্ট জমা করতে হবে কলকাতার এনআইএ আদালতে। তবে মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়ার আগে সুপ্রিম কোর্টে জমা দিতে হবে স্টেটাস রিপোর্ট। সেই রিপোর্টে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে হবে।’’

ঘটনার তদন্তে এনআইএ-কে সব রকম সাহায্য করতে হবে পুলিশকে, নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের। একই সঙ্গে কোর্ট জানায়, পুলিশকে সমস্ত নথি ও প্রমাণ এনআইএর হাতে তুলে দিতে হবে। ধৃতদেরও এনআইএ-র হাতে তুলে দিতে হবে বলে জানায় সুপ্রিম কোর্ট।

Advertisement

মালদহের ঘটনার কথা চিঠি দিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি। গত শুনানিতে সেই চিঠি উদ্ধৃত করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, “জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার— কেউই ঘটনাস্থলে পৌঁছোননি। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিজে থেকেই পুলিশের ডিজি এবং স্বরাষ্ট্রসচিবকে ফোন করতে হয়েছিল।” একই সঙ্গে তিনি আরও বলেছিলেন, “মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি এবং হোয়াট্‌সঅ্যাপে বার্তা পাঠানোর জন্য তাঁর নম্বরও পাওয়া যায়নি।” রাজ্য প্রশাসনের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ উঠেছে সোমবারও। আগেই এই ঘটনায় শো কজ় করা হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্যপুলিশের ডিজি, মালদহের জেলাশাসক এবং এসপি-কে। সোমবারের শুনানিতে তাঁদের ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।

আদালতের নির্দেশে সোমবারের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব। তাঁর উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন, ‘‘আপনার সমস্যা কী? আপনি কি প্রধান বিচারপতির ফোনও রিসিভ করেন না?’’ জবাবে দুষ্মন্ত জানান, সে দিন সকালে কলকাতায় ছিলেন না। কলকাতা থেকে কোনও ফোনও পাননি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি কলকাতা থেকে কোনও কল পাইনি। আমি একটি বৈঠক করতে দিল্লিতে গিয়েছিলাম। দুপুর ২টো থেকে ৪টা পর্যন্ত বিমানে ছিলাম।’’ পাল্টা বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মুখ্যসচিবকে বলেন, ‘‘সম্ভবত সন্ধ্যার দিকে ফোন করা হয়েছিল। আপনি যদি দয়া করে একটি মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য যোগাযোগের তথ্য শেয়ার করতেন ভাল হত।’’

মুখ্যসচিবকে বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, ‘‘আপনি বলছেন মোবাইলে নিরাপত্তার জন্য এমন হয়েছে। নিরাপত্তা এতটাই বেশি যে প্রধান বিচারপতিও যোগাযোগ করতে পারেন না? অনুগ্রহ করে নিজেকে একটু নীচে নামিয়ে আনুন, যাতে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির মতো সাধারণ মানুষরাও আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’’ বিচারপতি বাগচীর পরামর্শ, ‘‘আমাদের কাছে ক্ষমা না-চেয়ে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়ে ক্ষমা চান।’’

প্রধান বিচারপতিরও ভর্ৎসনার মুখে পড়েন মুখ্যসচিব। তিনি স্পষ্ট জানান, সে দিনের ঘটনা প্রশাসনের ব্যর্থতা। তাঁর কথায়, ‘‘আপনারা যথাযথ ব্যবস্থা না-নেওয়ায় কমিশন কিছুই করতে পারেনি। কমিশনের সঙ্গে কোনও যোগাযোগই রাখছেন না। এখন এই সংস্থাটি যে কোনও ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে আপনাদের নির্দেশ দেওয়ার জন্য দায়িত্বে রয়েছে। এই যোগাযোগের ঘাটতির কারণেই রাজ্যে এত সমস্যা এবং অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। কী ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে আপনার?’’ তবে শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, অন্য রাজ্যেও আমলাতন্ত্রের অনড় মনোভাব নিয়ে ক্ষোভপ্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement