BJP Manifesto

ভাতার লড়াই! মমতার অস্ত্রেই মমতাকে হারানোর কৌশল নিল বিজেপি, ৪ চলতি প্রকল্পে টেক্কা দেওয়ার ঘোষণা, নতুন আরও ১১

‘সঙ্কল্পপত্র’ প্রকাশের জন্য নিউটাউনে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে শাহ শুক্রবার গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত ঘরের মহিলাদের জন্য এবং কাজের খোঁজে থাকা যুবক-যুবতীদের জন্য মাসে ৩০০০ টাকা করে ভাতার কথা ঘোষণা করতেই রাজ্য বিজেপিতে উচ্ছ্বাস শুরু হয়ে যায়।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ২০:২৭
Share:

(বাঁ দিকে)মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিত শাহ (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি করা অস্ত্রেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর কৌশল নিল বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইস্তেহারে লিখিত ঘোষণা করে নেমে পড়ল ভাতা-যুদ্ধে।

Advertisement

অমিত শাহ আগেই বলেছিলেন, ‘‘আগামী পশ্চিমবঙ্গের যে রোডম্যাপ নিয়ে এ বারের নির্বাচনে কথা হবে, আমাদের সঙ্কল্পপত্র (ইস্তেহার) হল তার পরিচায়ক।’’ তাঁর প্রকাশ করা বিজেপির ইস্তেহারটিতে পশ্চিমবঙ্গের ‘আগামী’র জন্য একটি ‘রোডম্যাপ’ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার চেয়ে উজ্জ্বল ভাবে রয়েছে নানা ধরনের ভাতা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যত রকম বা যে পরিমাণ ভাতা চালু করেছে, তার কয়েকগুণ ভাতা তথা আর্থিক সহায়তার কথা নির্বাচনী ইস্তেহারে ঘোষণা করে দিল বিজেপি।

যে পুস্তিকাটি শাহ শুক্রবার আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করলেন, তাতে কী কী ঘোষণা থাকতে পারে, সে আভাস আগেই মিলেছিল। আনুষ্ঠানিক প্রকাশের পরে দেখা গেল, সব আভাসই মিলে গিয়েছে। কিন্তু আগে আভাস মেলেনি, এমন বেশ কিছু ঘোষণাও রয়েছে বিজেপির ‘সঙ্কল্পপত্রে’ এবং সে সবের অধিকাংশই ভাতা-গোত্রীয়।

Advertisement

গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে নানা রকমের ভাতা চালু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে প্রথমে মাসে ৫০০ টাকা করে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো শুরু করেছিলেন। পরে তা বেড়ে হয় ১০০০টাকা। এ বারের ভোটের আগে তা পৌঁছে গিয়েছে ১৫০০ টাকায়। সম্প্রতি তিনি ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে বেকার যুবক-যুবতীদের জন্যও মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা চালু করেছেন। ভোটের আগে এই দুই সিদ্ধান্ত মমতার ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে অনেকে দাবি করছেন। বিজেপি-ও ঝুঁকি না-নিয়ে বলতে শুরু করেছিল যে, মমতা যা দিচ্ছেন, ক্ষমতায় এলে বিজেপি তার দ্বিগুণ দেবে। এ বার নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করে খোদ শাহ সে কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণাও করে দিলেন। ফলে ইস্তেহারে উল্লিখিত শিল্পোন্নয়ন, পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন ইত্যাদির চেয়ে ভাতা-উন্নয়ন নিয়েই বেশি কথা শুরু হয়ে গিয়েছে।

‘সঙ্কল্পপত্র’ প্রকাশের জন্য নিউটাউনে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে শাহ শুক্রবার গরিব, নিম্মমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত ঘরের মহিলাদের জন্য এবং কাজের খোঁজে থাকা যুবক-যুবতীদের জন্য মাসে ৩০০০টাকা করে ভাতার কথা ঘোষণা করতেই রাজ্য বিজেপিতে উচ্ছ্বাস শুরু হয়ে যায়। মমতার তথাকথিত ‘মাস্টারস্ট্রোক’-কে ‘শাহি’ ঘোষণা ম্লান করে দিয়েছে বলে বিজেপি নেতারা দাবি করতে শুরু করেন। বিজেপির ইস্তেহার অবশ্য ওই দুই ঘোষণাতেই থেমে যায়নি। ‘প্রধানমন্ত্রী কিসান সম্মান নিধি’ প্রকল্পে এখন বছরে ছ’হাজার টাকা করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্যে বিজেপির সরকার তৈরি হলে মুখ্যমন্ত্রী ওই প্রকল্পে আরও তিন হাজার টাকা করে দেবেন বলে শাহ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাপকের অ্যাকাউন্টে বছরে ন’হাজার টাকা করে ঢুকবে। রাজ্য সরকারের ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পে কৃষকরা বছরে সর্বনিম্ন চার হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পান। বিজেপি জানাচ্ছে, ক্ষমতায় এলে কৃষকদের সহায়তার ক্ষেত্রে এ রকম ‘সর্বনিম্ন’ বা ‘সর্বোচ্চ’ ভেদ থাকবে না। প্রত্যেকে বছরে ন’হাজার টাকা করে পাবেন। বিনামূল্যে স্বাস্থ্য বিমার ক্ষেত্রেও তৃণমূলের প্রকল্পকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখিয়েছে বিজেপি। বর্তমানে রাজ্য সরকারের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ বা কেন্দ্রীয় সরকারের ‘আয়ুষ্মান ভারত’, দু’টি প্রকল্পেই বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যের চিকিৎসা মেলে। ফারাক হল, কেন্দ্রীয় প্রকল্পটি সত্তর বছর বয়স পর্যন্ত নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যে প্রযোজ্য। রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী যে কোনও আয়ের মানুষই পেতে পারেন। বিজেপি শুক্রবার গোষণা করেছে, পশ্চিমবঙ্গে তারা ক্ষমতায় এলে এ রাজ্যে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প চালু করা হবে। তাতে শুধু রাজ্যের মধ্যে নয়, দেশের যে কোনও প্রান্তে গিয়ে নিখরচায় চিকিৎসা করানোর সুযোগ মিলবে। তার পাশাপাশি রাজ্য সরকারও ওই প্রকল্পে অতিরিক্ত তহবিল যোগ করবে। ফলে বিমার মূল্য পাঁচ লক্ষ টাকার বেশি হবে।

Advertisement

শাহের এই চার ঘোষণা যদি হয় তৃণমূল সরকারের চালু করা প্রকল্পগুলিকে ‘টেক্কা’ দেওয়ার চেষ্টা, তা হলে পরবর্তী ঘোষণাগুলি ছিল ‘ভাতার লড়াই’য়ে তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দেওয়ার প্রয়াস। কারণ আরও একগুচ্ছ ক্ষেত্রে ভাতা তথা আর্থিক অনুদানের ঘোষণা এ দিন বিজেপির ইস্তেহারে প্রকাশ পেয়েছে।

‘সঙ্কল্পপত্র’-কে ১১টি অধ্যায়ে ভাগ করেছে বিজেপি। সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকে। তাই শুরুতেই সে সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির অধ্যায়। তাতে যেমন ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা মেটানোর এবং সপ্তম বেতন কমিশন চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তেমনই রয়েছে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার ঘোষণাও। দশ বছরের পরিকল্পনা তৈরি করে কলকাতা শহরের খোলনলচে বদলে দেওয়ার আশ্বাস রয়েছে। রয়েছে আইনের শাসন ‘ফিরিয়ে আনা’র প্রতিশ্রুতিও। পরের অধ্যায়গুলিতে রয়েছে নারী সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের কথা। রয়েছে চাষির পাশে দাঁড়ানোর একগুচ্ছ অঙ্গীকার। হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানে এই মুহূর্তে আলুচাষিদের মধ্যে যে ক্ষোভ রয়েছে, সে সম্পর্কে বিজেপি ওয়াকিবহাল। সে কথা মাথায় রেখে আলুচাষির পাশে দাঁড়ানোর কথা এবং আলু-সহ অন্যান্য ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ তথা বৃদ্ধির কথা লেখা হয়েছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উন্নয়নের বিশদ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে বিজেপির ইস্তেহারে। পরিকল্পনার কথা শোনানো হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, পর্যটন ক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষা নিয়েও। এই ‘সঙ্কল্পপত্র’ তৈরির প্রক্রিয়া বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু করা হয়েছিল। বিশিষ্ট নাগরিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ সংগ্রহ করেছিলেন বিজেপি নেতারা। নিজেদের রাজ্য দফতরে এবং প্রতিটি জেলায় ‘ড্রপ বক্স’ বসিয়ে সাধারণ জনতার কাছ থেকেও লিখিত পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল। সব ধরনের পরামর্শ দেখে এবং বিবেচনা করেই এক ‘সর্বসমাবেশী সঙ্কল্পপত্র’ তৈরি করা হয়েছে বলে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement