Kabir Suman's Birthday Special

যাঁরা সুমনদার কথায় আহত হন, তাঁরা আজও ওঁকে চেনেননি! এই ধরনের প্রতিভা প্রতিক্রিয়াশীলই হন

“আমার দুঃখ-আনন্দের বড় ‘বন্ধু’ কবীর সুমনের গান, ওঁর সঙ্গে আলাদা বন্ধুত্ব চাই না।”

Advertisement

রূপঙ্কর বাগচী

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৮
Share:

(বাঁ দিকে) কবীর সুমন এবং রূপঙ্কর বাগচী (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

১৯৯৬ সালের কথা বলছি। একটি বাংলা চ্যানেলে গানের অনুষ্ঠান হত। কবীর সুমন তাঁর সঞ্চালক। নতুন, পুরনো সব ধরনের গান গাওয়া হত সেখানে। ওই অনুষ্ঠানে আমি শিল্পী হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের আলাপের সেই শুরু।

Advertisement

ওই আলাপের পর থেকে কবীর সুমন যেন আমার ‘অভ্যেস’ হয়ে গেলেন! যখন যেখানে অনুষ্ঠান করেছেন, ছুটে গিয়েছি। মন দিয়ে গান শুনেছি। কোনও দিন অনুষ্ঠানশেষে ওঁকে বাহবা জানাতে যাইনি যে, “দাদা, দারুণ হয়েছে।” ধারেপাশে ঘেঁষতে চাইনি কখনও। রূপঙ্কর আসলে কবীর সুমনের বরাবরের ‘নীরব’ ভক্ত।

সেই সময় বাংলা গানের নতুন ধারা জন্ম নিয়েছে। কবীর সুমন সেই ধারার অন্যতম কান্ডারি হলে তাঁর যোগ্য সঙ্গী নচিকেতা চক্রবর্তী, গৌতম চট্টোপাধ্যায়। এঁরা আমার গানজীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন।

Advertisement

সাল ২০১৪। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতিস্মর’ ছবিতে সুমনদার সুরে গাওয়ার সুযোগ পেলাম। সুমনদা অবশ্য নিজে দেখেননি। ওই ছবির ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। তিনি ফোন করে জানালেন, আমায় দুটো গান গাইতে হবে। সুরকার সুমনদা। গাইলাম ‘এ তুমি কেমন তুমি’, সহসা এলে কি’ গান দুটো। বেশি টেক দিতে হয়নি। তিনটি টেকের পরেই সুমনদা জানালেন হয়ে গিয়েছে। বললেন, “ভাল গেয়েছ।”

ব্যস, ওই পর্যন্তই। দাদা যে আবেগে ভেসে জড়িয়ে ধরেছিলেন, এমনটা নয়। আমিও যে খুব আপ্লুত হয়েছিলাম, তেমনটাও নয়। এমনিতেই আমার আবেগ নিয়ন্ত্রণেই থাকে। তবে গাওয়ার সময় একটু বেশি আবেগ মিশেছিল গায়কিতে। দাদা বলেছিলেন, “তোমার গলায় যথেষ্ট আবেগ। সেই মাত্রা আর বাড়াতে হবে না। স্ট্রেট নোটে গাও।” কথা শুনে সেটাই গেয়েছিলাম। অনেকে সেই সময় শুনে বলেছিলেন, আমার গায়কিতে নাকি কবীর সুমনের ছায়া পড়েছিল! এই অসম্ভব কখনও ঘটতে পারে?

ফলাফল? দুটো গানই হিট। ‘এ তুমি কেমন তুমি’ জাতীয় পুরস্কার পেল। কবীর সুমনের ‘দূরের ভক্ত’ যেন প্রয়োজনের থেকেও বাড়তি পাওনা পেয়ে গেল।

অনেকে জানতে চান, ‘ব্যক্তি’ বা ‘মানুষ’ কবীর সুমন কেমন? আমার উত্তর, জানার চেষ্টাই করিনি কখনও। ওঁর ব্যক্তিজীবন জেনে আমি কী করব? উনি ক’টা বিয়ে করবেন, ক’বার প্রেমে পড়বেন, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হবেন অথবা কোন ধর্মকে আপন মানবেন— ওঁর ব্যাপার।

শুধু ওঁকে জানার ইচ্ছা কেন, ওঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবার, এক সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছাও নেই! আমার সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেমে-অপ্রেমে কবীর সুমনের গান আছে। তারাই আমার বড় ‘বন্ধু’। আর কী চাই? একা সুমনদা নন, নচিদা, মান্না দে, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু বা নাসিরুদ্দিন শাহ— এঁদের সঙ্গে বন্ধুত্বের লোভ একটুও নেই। ওঁদের সৃষ্টি, ওঁদের কাজ আমায় ছেয়ে রেখেছে। বন্ধুত্ব করতে গেলে ঘনিষ্ঠ হতে হবে। তাতে যদি মোহভঙ্গ হয়!

আমি তাই কোনও শিল্পীর সঙ্গে অন্য শিল্পীর তুলনাতেও নেই। কবীর সুমন না নচিকেতা, কে এগিয়ে? যত বার জানতে চাওয়া হয়েছে, তত বার বলেছি, দু’জনে দু’জনার মতো করে অনন্য। নচিদা একটু বেশি জনপ্রিয়। গীতিকাব্য গানে কবীর সুমন অনবদ্য। অনেকেই বলেন, কবীর সুমন প্রেমের গানের রাজা। নচিকেতা প্রতিবাদী গানের। আমি বলি, নচিদার ‘নীলাঞ্জনা’ তাঁরা মন দিয়ে শোনেনইনি! আসলে এঁদের গান বুঝতে গেলে পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন।

এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা। অনেকে মঞ্চানুষ্ঠানে দুই শিল্পীর আচরণে নাকি আহত হয়েছেন বা হন। প্রকৃত শিল্পীর আচরণ আরও মার্জিত হওয়া উচিত, বক্তব্য তাঁদের। আমার উপলব্ধি, যাঁদের মধ্যে প্রতিবাদের বারুদ, রাজনৈতিক ভাবনা, প্রেম, প্যাশন জমে রয়েছে, তাঁরা প্রতিক্রিয়াশীল হবেনই। সে সব জেনেই তো দর্শক-শ্রোতা গান শুনতে যান! ওঁরা কী গাইবেন, কী বলবেন— প্রকৃত ভক্তের তো অজানা নয়! তার পরেও যাঁরা আঘাত পান, আমি বলব তাঁরা প্রকৃত ভক্তই নন।

এখনও সুমনদার গানের কথা প্রেমের ‘কোটেশন’ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কত জনকে ওঁর গান প্রেমে পড়তে শিখিয়েছে! আমি আর চৈতালি এখনও অবসরে গুনগুনিয়ে উঠি, ‘এই যে দেখছি আবছায়াটাই লাগছে ভাল’। আমার কোনও গান সুমনদাকে ছুঁয়েছে কখনও? এটাই আর জানা হল না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement