ছবি: (এআই সহায়তায় প্রণীত)।
সম্প্রতি এক তরুণ নেটমাধ্যমে দাবি করেছেন যে, কপালে তিলক আঁকার ‘অপরাধে’ তিনি এক বিখ্যাত চশমা প্রস্তুতকারী সংস্থা থেকে চাকরি হারিয়েছেন, যা তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেই আবহে তিলক নিয়ে উঠছে বহু প্রশ্ন। কত ধরনের তিলক হয়? কী ভাবে, কোন আকারের তিলক কাটতে হয়? এই প্রতিবেদনে রইল উত্তর।
তিলককে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অত্যন্ত পবিত্র একটি চিহ্ন বলে মনে করেন। কোনও শুভ কাজে যাওয়ার আগে তো বটেই, অনেক মানুষ রোজকার জীবনেও তিলক পরেন। স্নান করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে কপালে তিলক আঁকা অনেকেরই প্রাত্যহিক কাজের মধ্যে পড়ে। নিত্যপুজোর পরেও এই শুভ চিহ্ন ধারণ করেন অনেকে। অনেকে আবার কুসংস্কার বলে এ কাজে অবহেলা করেন। তবে, জ্যোতিষশাস্ত্রবিদেরা জানাচ্ছেন, এই চিহ্ন কপালে ধারণ করার মধ্যে নিহিত থাকে ভগবানের আশীর্বাদ। প্রাচীনকালে যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাজা এবং সৈন্যরা এই বিশ্বাস থেকে তিলক পরতেন যে এর ফলে ঈষ্টদেবতার কৃপায় জয় অবশ্যম্ভাবী।
দুই ভ্রু’র ঠিক মধ্যবর্তী অংশ হল পবিত্র এই চিহ্ন আঁকার সঠিক স্থান। এটি মানবদেহের অন্যতম শক্তিশালী শক্তিকেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত। হিন্দু ঐতিহ্যে, এই স্থানটিকে ‘আজ্ঞাচক্র’ বলা হয়, যা ‘তৃতীয় নয়ন’ নামেও পরিচিত। এটি একজন ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি এবং আধ্যাত্মিক বোধকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে মনে করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে তিলক লাগানোর মাধ্যমে কোনও ব্যক্তির ‘আজ্ঞাচক্র’ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সেই ব্যক্তির চিন্তাভাবনায় স্বচ্ছতা আসে।
নানা রকম উপাদান দিয়ে তিলক পরা হয়ে থাকে। যেমন, চন্দন, কুমকুম, কেশর, সিঁদুর, যজ্ঞভস্ম বা বিভূতি, হলুদের গুঁড়ো বা পবিত্র মাটি। ভিন্ন ভিন্ন আধ্যাত্মিক ভাবনায় বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে উপাদানের রকমফের দেখা যায়। অনেকে তিলকের উপর একটি অখণ্ড চালও স্থাপন করে থাকেন। একে ‘অক্ষত’ বলা হয়।
শুধু উপাদানেই নয়, তিলকের আকারেও ভিন্নতা দেখা যায়। শৈবেরা যজ্ঞভস্ম বা বিভূতি দিয়ে তিনটি অনুভূমিক রেখায় তিলক আঁকেন, যা ত্রিপুণ্ড্র নামে পরিচিত। এই তিনটি রেখার মাঝে একটি উলম্ব লাল রেখা থাকে। শক্তির পূজারিরা সিঁদুর বা লাল চন্দন দিয়ে আঁকেন একটি উলম্ব তিলক, যা ভ্রূমধ্য থেকে সোজা উঠে যায়। গৌড়ীয় বৈষ্ণবেরা সাধারণত চন্দন দ্বারা একটি উলম্ব (ইংরেজি ‘U’ আকৃতির) তিলক ধারণ করেন, যাকে ঊর্ধ্বপুণ্ড্র বলা হয়। এ ছাড়াও আরও নানা ধরনের তিলকের ব্যবহার দেখা যায়।
তিলক পরার সময় কোন আঙুল ব্যবহার করা হচ্ছে, তারও স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা রয়েছে শাস্ত্রে। স্বাস্থ্য ও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য, শিশু বা অসুস্থ ব্যক্তিকে তিলক পরানোর সময় বৃদ্ধাঙ্গুলি ব্যবহার করা হয়। নিজের বা অন্যের কপালে তিলক আঁকার ক্ষেত্রে অনামিকাকে শ্রেষ্ঠ বলছেন জ্যোতিষবিদেরা। কোনও জীবন্ত মানুষকে কখনওই তর্জনী দিয়ে তিলক পরানো উচিত নয়। মৃত ব্যক্তি বা তাঁর ছবির ক্ষেত্রে এই আঙুলের ব্যবহার রয়েছে। কারণ, এর দ্বারা মোক্ষ বা মুক্তিলাভ হয় বলে প্রচলিত বিশ্বাস।