অজিত পওয়ার। —ফাইল চিত্র।
মহারাষ্ট্রের রাজ্য রাজনীতি ‘দাদা’ হারাল। এনসিপির কর্মী-সমর্থকেরা তো বটেই, বিরোধী দলের রাজনীতিকেরাও অজিত পওয়ারকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। মহারাষ্ট্রের রাজনীতির কারবারিদের অনেকেই বলেন, কাকা শরদ পওয়ারের কাছ থেকে রাজনীতির তালিম নেওয়া অজিত ক্রমশ মহারাষ্ট্র রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। কাকার ছায়া থেকে নিজেকে বার করে আনতে পেরেছিলেন। সম্প্রতি অবশ্য দূরত্ব ভুলে কাকা শরদের সঙ্গে হাত মেলানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তিনি। সে ক্ষেত্রে মহারাষ্ট্রের রাজনীতি কোন খাতে বইত, সেই প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখেই চিরবিদায় নিলেন অজিত। বুধবার সকালে নিজের রাজনৈতিক ‘গড়’ বারামতীতে বিমান দুর্ঘটনায় মাত্র ৬৬ বছর বয়সে মৃত্যু হল তাঁর।
আশির দশকে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়া অজিত দীর্ঘ দিন ধরে ছিলেন কাকা শরদের ছায়ামাত্র। পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই শুরুর দিকে স্থানীয় প্রশাসন এবং সমবায় রাজনীতিতে হাত পাকাচ্ছিলেন তিনি। প্রসঙ্গত, পশ্চিম মহারাষ্ট্রের আখচাষি এবং চিনিকলগুলির উপর বরাবর শরদ পওয়ারের একটি প্রভাব ছিল। শরদ অবশ্য তখন কংগ্রেসে। পরে যখন তিনি এনসিপি গঠন করেন, তখন এই প্রভাব বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং এটাই ‘মরাঠা স্ট্রংম্যানের’ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠেছিল। কাকাকে রাজনৈতিক গুরু মেনে চলা অজিতও ক্রমে এই পুঁজির উপর ভর করে রাজনৈতিক জমি শক্ত করার চেষ্টা করেন।
মহারাষ্ট্রের রাজনীতি পর পর দু’বছর ‘বর্ষা বিদ্রোহ’ দেখেছে। ২০২২ সালের বর্ষায় অবিভক্ত শিবসেনা ভেঙে অনুগত বিধায়কদের নিয়ে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন একনাথ শিন্দে। পরিষদীয় শক্তির বিচারে পরে শিন্দের শিবসেনাই ‘আসল’ শিবসেনা হিসাবে স্বীকৃতি পায়। শিন্দের বিদ্রোহ কেবল বালাসাহেব-পুত্র উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনাকেই ভাঙেনি, ভেঙেছিল শিবসেনা-কংগ্রেস-এনসিপির জোট সরকারকেও। শিন্দের সহায়তায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন শিন্দে। ২০২৩ সালের বর্ষায় মহারাষ্ট্রে কার্যত কাকা শরদের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন ভাইপো অজিত।
২০২৩ সালের ২ জুলাই অজিতের বিদ্রোহের পরেই এনসিপির অন্দরের সমীকরণ বদলে গিয়েছিল। অজিত-সহ ন’জন বিদ্রোহী এনসিপি বিধায়কের মন্ত্রিত্ব এবং ভাল দফতর লাভের পরে পরিষদীয় দলের অন্দরে ক্রমশ তাঁর শিবিরের পাল্লা ভারী হতে থাকে। সাংসদদের একাংশও তাঁর দিকে যান। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে দলের নিয়ন্ত্রণ যায় অজিতের হাতেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলে থাকেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও অজিতের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে এবং আর এক শরিক শিন্দেকে চাপে রাখতে সরকারে এনসিপিকে শামিল করে বিজেপি। উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয় অজিতকে।
দলে ভাঙন ধরানোর পর অজিতের প্রথম পরীক্ষা ছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে সাফল্য নয়, ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিলেন মহারাষ্ট্র রাজনীতির দাদা। এমনকি বারামতী লোকসভা কেন্দ্রে অজিত-পত্নী সুনেত্রা পওয়ার হেরে গিয়েছিলেন শরদ-কন্যা সুপ্রিয়া সুলের কাছে। ২০২৪ সালের শেষে মহারাষ্ট্র বিধানসভার নির্বাচনে অবশ্য কিস্তিমাত করে অজিতের দল। মহারাষ্ট্রের শাসকজোটের শরিক হিসাবে এনসিপি ৪১টি আসনে জয়ী হয়। ফের উপমুখ্যমন্ত্রী হন অজিত।
এ হেন অজিত সম্প্রতি দুই এনসিপিকে মিশিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। জানুয়ারি মাসেই একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, পরিবারে আর অশান্তি নেই, তাই দু’ভাগ হওয়া দলকে জোড়া লাগানো অসম্ভব নয়। দলের কর্মীরাও তেমনটা চাইছেন বলে দাবি করেছিলেন তিনি। পারস্পরিক দূরত্ব ঘোচানোর ইঙ্গিত দিয়ে জানুয়ারিতে পুণে এবং পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় পুরনিগমে জোট বেঁধে লড়াই করে শরদ এবং অজিতের দল। নির্বাচনী সাফল্য না-পেলেও দুই এনসিপির জোট রাজনীতির কারবারিদের নজর কেড়েছিল। স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছিল যে, বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসকজোটে থাকলেও, নিজেদের ‘গড়’ বাঁচাতে প্রয়োজনে পুরনো বিবাদ ভুলে যেতে পারেন কাকা এবং ভাইপো।
১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার দেওলালি প্রভারা এলাকায় জন্ম অজিতের। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া অজিতও অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। প্রথমে পশ্চিম মহারাষ্ট্রের সমবায়, দুধ ইউনিয়নগুলির ভোটে নিজের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন অজিত। তার পর পরিষদীয় রাজনীতিতেও হাতেখড়ি হয় তাঁর। শরদের ছেড়ে যাওয়া বারামতী বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করে এনসিপি। ওই কেন্দ্রে ১৯৯১ সাল থেকে টানা জয়ী হয়ে আসছেন অজিত। সুধাকররাও নায়েক মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় প্রথম সে রাজ্যের মন্ত্রী (কৃষি এবং বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী) হয়েছিলেন অজিত। ১৯৯২ সালে শরদ মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর অজিতকে ফের মন্ত্রী করা হয়। এনসিপি-কংগ্রেস জোট সরকারের আমলেও বিভিন্ন দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। দলীয় আনুগত্য এবং জোট বদলালেও মন্ত্রিসভার দরজা অজিতের জন্য অধিকাংশ সময় খোলাই থেকেছে। সুধাকররাও, শরদ ছাড়াও বিলাসরাও দেশমুখ, অশোক চহ্বাণ, পৃথ্বীরাজ চহ্বাণ, উদ্ধব ঠাকরে, একনাথ শিন্দে, দেবেন্দ্র ফডণবীসের মুখ্যমন্ত্রিত্বে কাজ করেছেন তিনি।
খ্যাতি, জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সঙ্গী হয়েছে বিতর্কও। জলসম্পদ মন্ত্রী থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পুত্র পার্থ পওয়ারের জন্যও সম্প্রতি বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল অজিতকে। মাস খানেক আগে জমি-বিতর্কে জড়ান পার্থ। বিতর্কের সূত্রপাত পুণের মুন্ধওয়ায় একটি সরকারি জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, ওই জমি বেআইনি ভাবে বিক্রি করা হয়। আর তা কেনে অজিত-পুত্রের সংস্থা। ওই ঘটনায় শোরগোল শুরু হতেই মহারাষ্ট্র সরকার পার্থকে ২১ কোটি টাকার স্ট্যাম্প ডিউটি ছাড়াও ১.৪৭ কোটি টাকা জরিমানা দিতে বলে।
তবে রাজনৈতিক সমালোচকেরাও মেনে থাকেন যে, অজিত একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন। দ্রুত কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি। ভোটের ফল যা-ই হোক, কখনও মাটির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করেননি অজিত। বারামতী এবং সংলগ্ন এলাকায় নিজের এবং দলের প্রভাব বজায় রাখতে নিয়মিত বৈঠক করতেন, স্থানীয়দের অভাব-অভিযোগও শুনতেন। কাকা শরদের মতো জনপ্রিয়তা না-পেলেও স্বীয় চেষ্টায় রাজনৈতিক ধার ও ভার বাড়িয়েছিলেন তিনি। অজিত ফের কাকার হাত ধরে মহারাষ্ট্রে নতুন চমক দেখাতেন কি না, সেই উত্তর মেলার সম্ভাবনা আর নেই। তবে কুশলী রাজনীতিক অজিত মঙ্গলবারও রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। জেলা পরিষদের নির্বাচনে দলের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে বুধবার মুম্বই থেকে বিমানে বারামতী যাচ্ছিলেন। বিমান অবতরণের সময়েই ঘটে গেল দুর্ঘটনা। ৬৬ বছর বয়সে মারা গেলেন অজিত। মহারাষ্ট্রের বর্ণময় রাজনীতির রঙ ফ্যাকাসে হল। অজিতের এনসিপির ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠে গেল প্রশ্ন।