অসমীয়া জাতির অস্তিত্বরক্ষা করতে হলে শরণার্থী বাঙালিকে নাগরিকত্ব দেওয়া ভিন্ন উপায় নেই বলে মত প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। দাবি করেছিলেন, জোট শরিক অগপর অন্যতম মাথা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল মহন্তকে বুঝিয়ে বললে তিনিও আর নাগরিকত্ব আইন সংশোধনীর বিরোধিতা করবেন না। হিমন্তর মন্তব্য নিয়ে এ দিন রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ হয়। প্রফুল্ল মহন্তও জানান, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকত্ব ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া উচিত। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা মেনে নেওয়ার প্রশ্নই নেই। হিমন্তর মন্তব্য নিয়ে রাজ্যে বিতর্ক হওয়ার মুখেই বিজেপি হাইকম্যান্ডের ডাকে আজ বিকেলে দিল্লি যান হিমন্ত।
বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে রাজ্যের ক্ষোভ বিজেপি তথা কেন্দ্রকে চিন্তায় রেখেছে। দলীয় সূত্রে খবর, এক সময়ের অগপ সভাপতি ও আইএমডিটি আইন প্রত্যাহারের নায়ক তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও নিজের অতীত অবস্থান থেকে একেবারে উল্টো হেঁটে বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি মানতে পারছেন না। নিজে দলের বিরুদ্ধে যেতে না পারলেও তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্টমন্ত্রী ও নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী নিয়ে তৈরি যৌথ সংসদীয় কমিটির (জেপিসি) প্রধান সত্যপাল সিংহকে বারবার রাজ্যের গণরোষ নিয়ে সতর্ক করছেন। দলের আরও কয়েকজন নেতা-নেত্রীও কেন্দ্রের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে।
পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে ও সর্বানন্দর মনোভাব বুঝতে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতও গুয়াহাটি এসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেছেন। কথা বলেছেন হিমন্তের সঙ্গেও। তার পরেই মুখ্যমন্ত্রী চুপ করে যান। আর বিলের পক্ষে ও শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য সরাসরি সরব হন হিমন্ত। হিমন্তর মন্তব্যের প্রতিবাদে এ দিন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলি প্রতিবাদ মিছিল বের করে। হিমন্তর কুশপুতুলও পোড়ানো হয়।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেন, ‘‘হিমন্ত দ্বিতীয় জিন্নার ভূমিকা নিয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে অসম ভাগ করার যে রাস্তায় হিমন্ত ও বিজেপি হাঁটছে—তা বিপজ্জনক। ধর্মনিরপেক্ষতার শপথ নিয়েও তা ভাঙছে বিজেপি বিধায়করা। এক সময় বাংলাদেশি বিতাড়ন নিয়ে লড়াই চালানো সর্বানন্দও এখন নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছেন। আমি রাজ্যবাসীর অধিকার ও আবেগবিরুদ্ধ কাজ না করার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অমিত শাহকে চিঠি লিখব।’’ তাঁর মতে হিমন্ত ও বদরুদ্দিন আজমল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
আলোচনাপন্থী আলফার সভাপতি অরবিন্দ রাজখোয়াও আজ বলেন, ‘‘ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়া অনুচিত।’’ আর প্রফুল্ল মহন্ত বলেন, ‘‘অসম ইতিমধ্যেই ভারতের সব রাজ্য অপেক্ষা বেশি শরণার্থীর বোঝা নিয়েছে। আর কোনও যুক্তিতেই অতিরিক্ত মানুষের বোঝা রাজ্যের উপরে চাপানো চলবে না। অসম চুক্তি মানতেই হবে।’’ আসু বলেছে, হিমন্ত অসমে মৌলবাদী নেতার ভূমিকা নিয়েছেন। অগপর তরফে জানানো হয়েছে, ধর্মের নামে রাজনীতি অসমে চলবে না। এআইইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দিন আজমলও বলেন, ‘‘অসমচুক্তি মেনে রাজ্যকে বাংলাদেশিমুক্ত করতে হবে। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়া ঠিক নয়।’’
হিমন্ত নিজে দিল্লি যাওয়ার আগে জানান, তিনি ১১টি জেলায় অসমীয়া জাতির সংখ্যালঘু হওয়া ও বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যাবৃদ্ধি নিয়ে যা বলেছেন সব সরকারি তথ্য। বাস্তবকে অস্বীকার করে লাভ নেই। রাজ্য বিজেপি মুখপাত্র রূপম গোস্বামী বলেছিলেন, হিমন্তর মতামত তাঁর ব্যক্তিগত। তা দলের কথা নয়। হিমন্ত কিন্তু আজ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যা বলেছেন—তা বাস্তব ভিত্তিক ও দলীয় মত মেনেই বলেছেন। হিমন্ত জানান তিনি প্রকাশ্য বিতর্কে বসতেও রাজি।