অবিরাম আক্রমণে আজাদ

প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ জেটলির

দলেরই সাংসদ কীর্তি আজাদের ক্রিকেট-গুগলিতে ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি নালিশ করলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে। দাবি, অবিলম্বে শাস্তি চাই কীর্তির। এর পরেই এ দিন রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে জেটলির পাশে দাঁড়িয়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৪:১৩
Share:

কেজরীবালের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে পাটিয়ালা হাউস কোর্টে অরুণ জেটলি। ছবি: ইয়াসির ইকবাল।

দলেরই সাংসদ কীর্তি আজাদের ক্রিকেট-গুগলিতে ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি নালিশ করলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে। দাবি, অবিলম্বে শাস্তি চাই কীর্তির। এর পরেই এ দিন রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে জেটলির পাশে দাঁড়িয়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। কিন্তু কীর্তি এখনও অবিচলই! এ দিন সংসদের ভেতরে-বাইরে জেটলির বিরুদ্ধে ফের তোপ দেগেছেন তিনি। কীর্তির এই বেপরোয়া আচরণের পিছনে দলীয় নেতৃত্বের একাংশের মদত রয়েছে বলে বিজেপিতে গুঞ্জন। সব মিলিয়ে দিল্লি ও জেলা ক্রিকেট সংস্থা (ডিডিসিএ)-র আর্থিক কেলেঙ্কারি বিতর্ক ঝড় তুলে দিয়েছে বিজেপির অন্দরে।

Advertisement

এত দিন ডিডিসিএ-বিতর্কে জেটলিকে নিশানা করছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল ও তাঁর দলের নেতারা। কিন্তু রবিবার আরও বেশি সুর চড়িয়ে জেটলিকে বিঁধেছেন কীর্তি। আর তাতেই চরম ক্ষুব্ধ মোদী মন্ত্রিসভার অঘোষিত ‘নম্বর-টু’। প্রধানমন্ত্রীর কাছে জেটলির অভিযোগ, দলের একাধিক শীর্ষ নেতার নিষেধ উড়িয়ে কীর্তি গতকাল শুধু সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁকে নিশানাই করেননি, রাতে টুইটে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘‘হ্যালো ডিয়ার অরুণ জেটলি, আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করছেন না কেন!’’

জেটলির অভিযোগের পরে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের সঙ্গে। ঘটনা হল, অমিত আগেও কীর্তিকে বলেছিলেন ডিডিসিএ নিয়ে মুখ না খুলতে। দ্বারভাঙ্গার সাংসদ তা কানেই তোলেননি! এখন সকলেরই নজর মোদীর দিকে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিজেপির অন্দরে দু’টো ভাগ হয়ে গিয়েছে। এক পক্ষের বক্তব্য, কীর্তির বিদ্রোহের জন্য অবিলম্বে তাঁকে শাস্তি দেওয়া উচিত। অন্য পক্ষের বক্তব্য, এটা দলীয় রাজনীতি নয়, ক্রিকেট। তাই প্রধানমন্ত্রী মধ্যস্থতা করে কোনও পথ বের করুন। বুধবার মস্কো সফরে যাচ্ছেন মোদী। তার আগে কি কীর্তিকে শাস্তি দেওয়া হবে? প্রশ্ন সেটাই। অমিত শাহ এ দিন সন্ধ্যায় বলেন, ‘‘দল ঐক্যবদ্ধ ভাবে জেটলির পাশে রয়েছে। জেটলি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’’

Advertisement

কীর্তি এখনও অবিচল। মোদীর কাছে গিয়ে জেটলি তাঁর শাস্তির আর্জি জানানোর কয়েক ঘণ্টা পর দুপুরে লোকসভায় ফের ডিডিসিএ-প্রসঙ্গ তোলেন কীর্তি! তখন লোকসভায় উপস্থিত জেটলি! দৃশ্যতই ক্ষুব্ধ জেটলি কিছু পরেই লোকসভা থেকে বেরিয়ে আসেন। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি বলেন, ‘‘বিষয়টি দল ঠিক করবে। আমি জানি না, দল কী অবস্থান নেবে!’’ তবে তিনি আজ পাটিয়ালা হাউস কোর্টে কেজরীবাল-সহ ৫ আপ নেতার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেছেন। হাইকোর্টেও একটি মামলা করেছেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন দুই পূর্ণ মন্ত্রী, বেঙ্কাইয়া নায়ডু ও স্মৃতি ইরানি ও জনা চারেক প্রতিমন্ত্রী।

বিজেপি সূত্র বলছে, প্রকাশ্যে কিছু না বললেও রাজনাথ সিংহ, সুষমা স্বরাজ, নিতিন গডকড়ী এমনকী বেঙ্কাইয়া নায়ডুর মতো অনেকেই মনে মনে খুশি। রাজনাথ সাংবিধানিক ভাবে মন্ত্রিসভার ‘নম্বর টু’ হলেও বাস্তবে জেটলিই সরকার চালাচ্ছেন— এমন একটা ধারণা বেশ কিছু দিনই তৈরি হয়েছে। তাতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন রাজনাথ। আবার কিছু দিন আগে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা ও বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ যখন ললিত মোদী-বিতর্কে জড়িয়েছিলেন, তখন সুষমার ঘনিষ্ঠ মহলের অভিযোগ ছিল, এর পিছনে কলকাঠি নাড়ছেন জেটলি।

আজ জেটলি যখন পাটিয়ালা আদালতে গেলেন, তখন রাজনাথ গেলেন মধ্যাহ্নভোজনে। সুষমাও ব্যস্ত সাংবাদিকদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনে। সেখানে তাঁকে ক্রিকেট কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। বলা হয়, আপনাকে খুশি মনে হচ্ছে! এর মধ্যে কি ক্রিকেটের প্রভাব আছে? সরাসরি জবাব এড়িয়ে সুষমা বলেন, ‘‘প্রাক্-ক্রিকেট বা উত্তর-ক্রিকেট কিছু নয়। এটি বার্ষিক রুটিন মধ্যাহ্নভোজ মাত্র।’’

প্রশ্ন হল, অনেক নেতা-মন্ত্রীই জেটলির ব্যাপারে ঈর্ষাকাতর হতে পারেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অমিত শাহ মানা করা সত্ত্বেও কীর্তি কোন সাহসে জেটলি-বিরোধী রাজনীতিতে অক্সিজেন জোগান? এমনকী স্পিকার সুমিত্রা মহাজনই বা কেন লোকসভায় প্রশ্ন করার অনুমতি দেন কীর্তিকে? প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, বিষয়টি বিজেপি নয়, ক্রিকেট রাজনীতির। তা কীর্তি আজাদের পুরনো জেটলি বিরোধী ইগো-ভিত্তিক রাজনীতি। যে দিন থেকে দিল্লি ক্রিকেট সংগঠন থেকে কীর্তি বাদ পড়েন, সে দিন থেকে তাঁর জেটলি-বিরোধী জেহাদ শুরু! কীর্তি এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে জেটলির বিরুদ্ধে নথি পেশ করে তদন্তের দাবি করেছিলেন।

বিজেপির অনেকেই বলছেন, ক্রিকেট রাজনীতিতে মূল লড়াইটা ছিল শ্রীনিবাসন-বিরোধী। জেটলি তাঁকে সমর্থন করাতেই জলঘোলা শুরু। তখনই প্রধানমন্ত্রী জেটলিকে পরামর্শ দেন, এই সংস্থা থেকে তাঁর ইস্তফা দিয়ে দেওয়াই ভাল। অরুণ ইস্তফা দিলেও কিছু দিন আগে পর্যন্ত এই ক্রিকেট সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ক্রিকেট রাজনীতি বিজেপির অন্দরে যে ভাবে ঢুকেছে, তাতে মোদী মোটেই খুশি নন। তাই শীর্ষ মন্ত্রীদের এমনকী শীর্ষ নেতাদেরও এই বিতর্কে সামিল করতে তিনি খুব উৎসাহী নন।

কীর্তিকে নিয়ে বিজেপির অন্য আশঙ্কাও আছে। বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভগবত ঝা আজাদের এই সন্তানটির সঙ্গে নীতীশ কুমারের গোপন বোঝাপড়া হয়নি তো? বিহার ভোটে সদ্য মুখ পুড়েছে দলের। এই অবস্থায় কীর্তি যদি ইস্তফা দিয়ে জেডি (ইউ)-এ ঢুকে উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যান, তা হলে কী হবে? আবার কীর্তিকে নিয়ে দলে ফাটল তৈরি হলে শত্রুঘ্ন সিন্হা-যশবন্ত সিন্হারা তো বটেই লালকৃষ্ণ আডবাণী-মুরলীমনোহর জোশী বা অরুণ শৌরি কী করবেন, তা-ও মাথায় রাখতে হচ্ছে দলকে।

চাপে পড়া বিজেপিকে সমস্যায় ফেলতে কোমর বেঁধেছে কংগ্রেস ও কেজরীবাল। এ দিন রাজ্যসভায় কংগ্রেসের রাজীব শুক্লর সঙ্গে কথা বলেন বিজেপির মুখতার আব্বাস নকভি। ঠিক হয়, কংগ্রেস অরুণের নাম নেবে না আর বিজেপি সনিয়া গাঁধীর নাম নেবে না। কিন্তু জয়রাম রমেশ বলেন, ‘‘অরুণের নাম না নিলেও অর্থমন্ত্রী তো বলতেই হবে!’’ আর বিজেপির মাথাব্যথা বাড়িয়ে আগামিকাল দিল্লি বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকেছেন কেজরীবাল। বিষয়? ডিডিসিএ-দুর্নীতি ও কেজরীর দফতরে সিবিআই হানা। যার পিছনে জেটলির হাত আছে বলেই অভিযোগ উঠেছিল প্রথম দিনে!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement