—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
ঠিক বিনা মেঘে বজ্রপাত নয়। ক্ষোভ, রাজনীতি সবই ছিল। কিন্তু ৬০ বছর আগে ‘রেডিয়ো পিকিং’ পৃথিবীকে প্রায় চমকে দিয়ে ঘোষণা করল, ভারতীয় বিপ্লবের এক সন্ধিক্ষণ এসে গিয়েছে! দার্জিলিঙের বিপ্লবী কৃষকেরা গড়ে তুলেছেন সশস্ত্র সংগ্রামের একটি লাল অঞ্চল। কেউই তখন বোঝেননি, আগামী দিনগুলিতে বিপ্লবের সম্ভাবনা বাঙালি জীবনকে কী ভাবে গ্রাস করবে।
ছয় দশক আগের সেই সুচনার যবনিকা পড়ল অন্ধ্রে। ফেব্রুয়ারির শেষে। আত্মসমর্পণ করলেন মাওবাদী পার্টির শেষ গুরুত্বপূর্ণ নেতা টিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে ‘দেবুজি’। দার্জিলিঙের যে স্ফুলিঙ্গ দাবানল হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তার সমাপ্তি। বাংলায় অবশ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল আগেই। ছয় দশক ধরে নানা সময়ে সমাজ এবং জীবনে নানান আলোড়ন তুললেও এই আন্দোলন শেষপর্যন্ত এতটাই প্রান্তিক হয়ে উঠেছিল যে, মূলধারার আলোচনা থেকে উধাও। বিশেষত, বাঙালির জীবনে। বরং এই আন্দোলনের সমাপ্তির খবর অনেককে জানান দিল যে, নকশাল আন্দোলন এতদিন বাংলার বাইরে টিকে ছিল।
জুলাই ১৯৬৭ সাল। উপমুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। তাঁরই দলের একাংশ জমি ও ফসল দখলের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম গড়তে কৃষকদের নিয়ে ‘স্কোয়াড’ তৈরি করলেন। এরাই প্রকৃত বিপ্লবী, জানাল ‘রেডিয়ো পিকিং’ (যে নামে ‘রেডিয়ো বেজিং’ তখন পরিচিত ছিল)। আর জ্যোতি বসুর সরকার? সেটা সাম্রাজ্যবাদ, জমিদার ও শিল্পপতিদের দালাল। ‘রেডিয়ো পিকিং’-এর ঘোষণা যেন প্রায় কোভিড মহামারির মতো দ্রুত ছড়িয়ে গেল। চিনে তখন ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ আরম্ভ হয়েছে। পুরনো চিন্তা, সংস্কৃতি, প্রথা ও অভ্যাসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিদ্রোহের ডাক। নকশালবাড়ি নিয়ে চিনের ঘোষণা ভারত জুড়ে চিনপন্থীদের উৎসাহিত করল। পশ্চিমবাংলা থেকে পঞ্জাব, অন্ধ্র থেকে কাশ্মীর, সিপিএমের রাজ্য ও জেলা স্তরে থাকা চিনপন্থী নেতারা দলে দলে বেরিয়ে এলেন। বললেন, শহরের শ্রমিক, ছাত্র-যুবদের গ্রামে গিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। পুলিশ ও জোতদারদের ওপর দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলা করে তাদের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিতে হবে। ‘শ্রেণিশত্রু’র রক্তে রাঙাতে হবে হাত। শুরু হল রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়।
বাংলায় সশস্ত্র আন্দোলন সম্পর্কে একটা রোমান্টিকতা সম্ভবত দীর্ঘদিনই ছিল। সেই অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের আন্দোলন, সুভাষচন্দ্র বসুর জনপ্রিয়তা, ফসলে কৃষকের অধিকারের দাবিতে তেভাগা আন্দোলন সেই ইঙ্গিতই করে। ১৯৬৪তে সিপিআই ভেঙে সিপিএম তৈরি হওয়ার পর থেকেই সিপিএমের মধ্যে থাকা একদল চিনপন্থী নেতা, যাঁদের অনেকের তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গেও যোগ ছিল, ‘চিনের পথই ভারতের পথ’ বলে সশস্ত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের প্রচার শুরু করে দিয়েছিলেন। যদিও গোপনে। এখন এঁরাই প্রকাশ্যে।
সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া থাকে। ‘রেডিয়ো পিকিং’-এর ঘোষণা যেমন বিপ্লবীদের উস্কে দিল, তেমনই উস্কে দিল প্রশাসনের সক্রিয়তা। ১২ জুলাই শুরু হল ‘অপারেশন হাতিঘিসা’। সেটা আন্দোলনের নেতা কানু সান্যালের গ্রাম। এর পরে দৈনিক লাগাতার গ্রামে গ্রামে পুলিশের তল্লাশি। এক মাসের মধ্যে নকশালবাড়ির আন্দোলন শেষ। কিন্তু কলকাতাতেও মাওবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বেরা। কবিতা, গল্প। উত্তরবঙ্গ ঘুরে এসে উৎপল দত্ত লিখলেন নকশালবাড়ির আন্দোলনের সমর্থনে তাঁর বহু বিতর্কিত নাটক ‘তির’। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ল ছাত্রদের মধ্যে। বিশেষত প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এঁদের কেউ কেউ ১৯৬৮ সালের শুরু থেকেই দক্ষিণবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে যাওয়া শুরু করেন। শহরের চাকরি ছেড়ে গ্রামে যান অনেক তরুণ। কৃষকের ‘মুক্তাঞ্চল’ বানাতে হবে।
কিসের টানে ঘর, পড়াশোনা, চাকরি ছাড়লেন এত তরুণ? শুধুই রোমান্টিকতা? ‘হুজুগে’ বলে বাঙালির বদনাম আছে। কিন্তু এ কি শুধুই হুজুগ? নকশাল-পুলিশ ধাওয়া-ধাওয়ির উত্তপ্ত সময়ে আমার এক সহকর্মীর বাড়িতে আশ্রয় চেয়েছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের নকশালপন্থী এক ছাত্র, তাঁর স্কুলজীবনের সহপাঠী। আমার সহকর্মী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সেই সহপাঠীকে তখন পুলিশ খুঁজছে। সহপাঠীর বাবা কলকাতার অন্যতম নামকরা চক্ষু বিশেষজ্ঞ। উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু ছেলে ঝাঁপিয়েছে বিপ্লবে। আমার সহকর্মী তাঁর সহপাঠীর কাছে জানতে চান, কেন ঢুকেছ এ সবের মধ্যে? সহপাঠীর উত্তর ছিল, ‘‘কী করব বলো? সমাজটা যে একদম পচে-গলে গিয়েছে! পাল্টাতে তো হবেই।’’
কিন্তু যেখানেই বাঙালি সেখানেই উপদল। পাল্টানো হবে কোন পথে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই ভাগ হয়ে গিয়েছেন বিপ্লবীরা। সিপিএম-ত্যাগী চিনপন্থীরা ১৯৬৯ সালে বানিয়ে ফেলেছেন দু’টি আলাদা মাওবাদী দল। সিপিআই (এমএল) এবং এমসিসি। চিন থেকে খবর এল, তাদের নবম পার্টি কংগ্রেসে ঘোষণা হয়েছে, বর্তমান যুগ হচ্ছে এমন যুগ, যখন সাম্রাজ্যবাদ তার সার্বিক ধংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর সমাজতন্ত্র চলেছে বিশ্বব্যাপী বিজয়ের পথে। আরও উৎসাহী হয়ে চারু মজুমদার ঘোষণা করলেন, সত্তরের দশককেই মুক্তির দশকে পরিণত করতে হবে। অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল কলকাতা। ১৯৭০ সালের ২ মার্চ। প্রেসিডেন্সির ছাত্রেরা প্রিন্সিপালের ঘর ভাঙচুর করে দেওয়ালে মাও-এর ছবি এঁকে দিল। সেই মাসেই ভাঙচুর হয় কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ঘর। এপ্রিলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গান্ধীভবনে হামলা। পোড়ানো হল গান্ধীর তৈলচিত্র, গান্ধীর লেখা ও গান্ধীকে নিয়ে লেখা বই। শুরু হয়ে গেল মূর্তি ভাঙার আন্দোলন। এ দিক-ও দিক ভাঙা পড়ল গান্ধীমুর্তি। তিনি ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল’। কলেজ স্কোয়্যারে বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মুর্তির মাথা গড়াগড়ি খেল রাস্তায়। তিনিও ‘ব্রিটিশদের দালাল।’
কথা ছিল গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বিশেষ কিছু করে ওঠার আগেই খুনোখুনি শুরু কলকাতায়। ভারতের আর কোনও রাজ্যে শহরাঞ্চলে গেরিলা অ্যাকশন হয়নি। কিন্তু কলকাতা ও কিছু শহরতলি অঞ্চল এর ব্যতিক্রম। প্রথমে কিছু পুলিশকর্মী, মূলত কনস্টেবল ও হোমগার্ডদের হত্যা করা হয়। পরে বেশি হামলা তথাকথিত ‘পুলিশের চর’ ও ‘শ্রেণিশত্রু’দের ওপর। এর অধিকাংশই সিপিএম কর্মী সংগঠক।
সে এক প্রবল উন্মাদনার কাল। তথ্য ও যুক্তিকে ছাপিয়ে গিয়েছে আবেগের আবেদন। কী ভাবে নকশালবাড়ির কাহিনি নানা ভাবে অতিরঞ্জিত হয়ে কলকাতায় ছড়ায়, তা দেখিয়েছিলেন অরুণপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। নকশালবাড়ি আন্দোলনের সময় দার্জিলিঙের পুলিশ সুপার ছিলেন তিনি। নকশালপন্থী প্রকাশনা ‘দেশব্রতী’ তাদের গেরিলা বাহিনীর নানান ‘বীরত্বপূর্ণ অ্যাকশন’-এর কাহিনি অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করায় কী ভাবে শহরে বিভিন্ন গেরিলা স্কোয়াডের মধ্যেও এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, কারা কত বেশি শ্রেণিশত্রু খতমের ‘অ্যাকশন’ করতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলেন অরুণ। নকশালবাড়ির অন্যতম সংগঠক খোকন মজুমদার পরে বলেছিলেন, ‘‘কে যে শ্রেণিশত্রু, তা নিয়ে কারওরই কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না।’’
কলকাতাতেও তাই। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য গোপাল সেনের দায়িত্বের শেষ দিন। দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে হেঁটে ফিরছিলেন ক্যাম্পাসের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎই খুন করে দেওয়া হল তাঁকে। তিনি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। একবার এই তকমা কাউকে দিলে আর রক্ষা নেই। একসময় পুলিশের ‘চর’ সন্দেহে নকশালরাই নকশালদের মারতে শুরু করে। ১৯৭১-’৭২ সালের কলকাতায় নকশাল অ্যাকশন স্কোয়াডে ঢুকে পড়ে পুলিশের খাতায় নাম থাকা সাধারণ দুষ্কৃতীরা। বেপরোয়া হয়ে ওঠে পুলিশও।
ঘটে যা, তা তো সব সত্য নয়। কবি যা রচিবে, তাহাই কি সব সময় সত্য? সত্য তো বহুরূপী। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সঙ্গীতে নানা রূপে উঠে এসেছে সেই অস্থির, রক্তাক্ত, বিষণ্ণ সময়ের প্রতিচ্ছবি। উল্লাস, আর্তনাদ, দোষারোপ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন তিমিরবরণ সিংহ। ১৯৭১ সালে বহরমপুর জেলে পুলিশের নির্যাতনে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। ছাত্রের শোকে কবি শঙ্খ ঘোষ লেখেন, ‘ময়দান ভারী হয়ে নামে কুয়াশায়/দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ/তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?/নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই/তোমার ছিন্নশির, তিমির।’
যারা তিমির-হননে নেমেছিল, তাদের অনেকেই ততদিনে তিমিরে হারিয়ে গিয়েছে। শহর, শহরতলি হয়ে উঠেছে মৃত্যু উপত্যকা। ১৯৬৮ সালের শুরুতেই গ্রামে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি থেকে ছাত্র আন্দোলনের জন্য বহিষ্কৃত রণবীর সমাদ্দার। পরে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসাবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর মতে, নকশালবাড়ি আন্দোলনের যে জনপ্রিয় অধ্যায়, সেটা খুবই ছোট একটা অধ্যায়, ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “এই যে আপামর মানুষের নকশালবাড়ির প্রতি আজও একটা আকর্ষণ, এত টান, কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে নকশালপন্থী বলা, সেই শিল্প-সাহিত্য রচনা, একটা বিপুল সামজিক চরিত্র এই মুভমেন্টের, সেটা ওই সময়টুকুই।”
১৯৭১ সালের জুলাই-অগস্টে সেনা, আধাসেনা ও পুলিশের সমন্বয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নামালেন অপারেশন ‘স্টিপল চেজ়’। তত দিনে গ্রামেও জনপ্রিয়তা হারানো শুরু হয়েছে নকশালপন্থী স্কোয়াডগুলির। যে কৃষকেরা একদা স্কোয়াড সদস্যদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁরাই একসময় স্কোয়াডদের ধরিয়ে দিলেন যৌথবাহিনীর হাতে। কলকাতায় ঘটল কুখ্যাত কাশীপুর-বরাহনগর গণহত্যা, যেখানে কত নকশাল কর্মী-সমর্থক খুন হয়েছিলেন, তার সঠিক হিসাব আজও পাওয়া যায়নি। বস্তুত, যে ঝড় উঠেছিল তা স্তিমিত হল ১৯৭২ সালের মধ্যেই। লোকেরা তত দিনে হাঁপিয়ে উঠেছে, বলেছিলেন রণবীর। বলেছিলেন, “এই তীব্র ঘন, যাকে বলে ডেন্স একটা পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিটি কোনও সোসাইটিই বেশিদিন করতে পারে না। বাঙালিদের কথা বাদই দিন।”
জোতদারদের বাড়ি ঘেরাও, ফসল, সোনাদানা লুঠ, জমির পরচা পুড়িয়ে ফেলার মতো আন্দোলন চিনেও হয়। এবং তা থেকে সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপক জনপ্রিয়তাও বাড়ে। কিন্তু ভারতে, বিশেষত বাংলায় নকশালেরা এর সঙ্গে যোগ করল যে, জোতদারের বাড়ি লুট করলেই হবে না। তার মাথাও কাটতে হবে। রণবীর বলেছিলেন, “সকলে জানে এর পরিণতি কি হয়েছিল।”
২৮ জুলাই যখন পুলিশ লক আপে সিপিআই (এমএল) সর্বাধিনায়ক চারু মজুমদারের মৃত্যু হয়, তত দিনে বাকি সব কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরাই হয় মৃত, নয় জেলে, নয় দলত্যাগী। তত দিনে ভেঙে গিয়েছে অন্ধ্রের শ্রীকাকুলাম, বিহারের মুশাহারি, উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর-খেরি, উড়িষ্যার কোরাপুটের আন্দোলনও। এর পর নকশাল আন্দোলন আর কোনওদিন শহরে ফেরেনি। বাংলায় আর মাথাচাড়া দিতে পারেনি পরবর্তী দু’দশক। তার অন্যতম কারণ ছিল ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে আনা ভূমিসংস্কার কর্মসূচি। এর ফলে গ্রামে আর কয়েক’শ বিঘার মালিক এমন জমিদার ছিলেন না, যাঁদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ কাজে লাগানো যায়।
বাংলায় নকশাল আন্দোলন আবার জনপরিসরে উঠে আসে শতাব্দীর শেষ লগ্নে। রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে। মেদিনীপুরের কেশপুর-গড়বেতায় তৃণমূল-বিজেপির সঙ্গে সিপিএমের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময়। তত দিনে বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগঢ়, অন্ধ্র, ওড়িশায় নকশালরা পুনর্গঠিত হলে নব্বইয়ের মাঝামাঝি বাংলায় আসেন অন্ধ্রের জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর নেতা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেণজি। হয় পুলিশের উপর একের পর এক হামলা। তার পর ২ নভেম্বর, ২০০৮। অন্ধ্রের কায়দায় ল্যান্ডমাইন হামলা হল মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে। পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনের প্রত্যাবর্তনের খবর ছড়িয়ে গেল গোটা দেশে। কিন্তু টিকল মাত্র চার বছর। তার মধ্যেই রক্তগঙ্গা বইল জঙ্গলমহলে। বিপন্ন জনজীবন। সন্ধ্যা হলেই স্তব্ধ, ফাঁকা রাস্তাঘাট।
২০০৯ সালের জুন মাসে লালগড়ের ছোটপেলিয়া গ্রামে কিষেণজির সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় প্রশ্ন করেছিলাম, অন্ধ্রে তাঁরা আর ফিরতে পারলেন না কেন। তিনি তিনটি কারণ দেখান। ১. সরকার উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং আর্থ-সামাজিক সংস্কারের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। ২. প্রশাসন অনেককে ‘কিনে নিচ্ছে’। ৩. আর গ্রামে গ্রামে তৈরি হয়েছে বিস্তৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। রয়েছেন হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী।
২০১১ সালের নভেম্বরে মেদিনীপুরের বুড়িশোলের জঙ্গলে কিষেণজির মৃত্যুর পর ঠিক এই পথেই বাংলা থেকে মাওবাদীদের সরিয়ে দিতে সমর্থ হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নবনির্বাচিত সরকার। দ্রুত চলে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ। মাসোহারা দিয়ে গ্রামে গ্রামে ‘সোর্স’ রাখা হয়। আত্মসমর্পণ করে পুলিশ বা হোমগার্ডের চাকরি পান অনেকে। উত্থানের রাজ্যে আবার অতীত হয়ে যায় নকশালপন্থা। আসলে, মাওবাদীরা যেমন এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের কথা ভেবেছিল, সে ভাবেই রাষ্ট্রও ধাপে ধাপে, এলাকাভিত্তিক অপারেশন শুরু করে। ২০০৫-’০৬ এর মধ্যেই ভেঙে পড়ে অন্ধ্রের আন্দোলন। নিরাপত্তাবাহিনীর চাপে সমতল ছেড়ে মাওবাদীরা ক্রমশ জঙ্গলে। সরকারি কৌশল হল ‘ক্লিয়ার, হোল্ড, বিল্ড’। প্রথমে একটি এলাকা সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে মাওবাদী-মুক্ত করো, তারপর সেখানে ক্যাম্প বসিয়ে ও সোর্স নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে স্থানীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করো। সঙ্গে দ্রুত পরিকাঠামোগত ও উন্নয়নমূলক নির্মাণের পদক্ষেপ, যাতে মাওবাদীরা আর ফিরে আসার সুযোগ না পায়।
দীর্ঘদিন ছত্তীসগঢ়ে নকশাল-বিরোধী অপারেশনের দায়িত্বে থাকা এখন অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস রাজেন্দ্রকুমার বলছিলেন, “সশস্ত্র আন্দোলনের অধ্যায় শেষ।” তাঁর মতে, মাওবাদী নেতৃত্ব বুঝে গিয়েছেন তাঁদের পক্ষে এই লড়াই জেতা শুধু অসম্ভবই নয়, দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মূল্যায়নও ভুল ছিল। ভিজের কথায়, “যেহেতু নেতা-কর্মীরা সব অস্ত্র-সহ আত্মসমর্পণ করেছেন, তাদের পক্ষে আর সামরিক লড়াই শুরু সম্ভব না। সেই পরিস্থিতিও নেই।” তাঁর মতে, নকশাল আন্দোলন প্রথম দফায় ভেঙে পড়ার পরেও আরও পাঁচ দশক টিকে ছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁক থাকার কারণে। সেই ফাঁক ঢাকতে রাষ্ট্র যেখানে যতটা সময় নিয়েছে, ততদিনই টিকে থাকতে পেরেছে মাওবাদীরা। নব্বইয়ের দশক থেকে মূলত পাহাড়-জঙ্গলে, যেখানে পুলিশ-প্রশাসনের উপস্থিতি কম, সেখানেই তাদের ঘাঁটি তৈরি হয়েছে। ভিজ বলেন, যেখানে মাওবাদীদের মূল প্রশ্ন ছিল জমি বণ্টনের, সেখানে দেশের বিস্তীর্ণ সমতলের কৃষকদের মধ্যে তাদের কোনও প্রভাব বা উপস্থিতিই ছিল না। তাদের উপস্থিতি জঙ্গলে, যেখানে আদিবাসীদের মধ্যে ভূমিহীন প্রায় নেই। আজ যখন নকশাল রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক পড়ার ঘোষণা হচ্ছে, তখন বাঙালির স্মৃতিতে আবার মলিন হয়ে গিয়েছে এই আন্দোলন। তা এতটাই তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতাও জঙ্গলমহলকে মাওবাদী মুক্ত করায় তাঁর সরকারের সাফল্যের কথা আর তুলে ধরেন না।
কেন ছয় দশক আগে দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাদখলের প্রকল্প? কেনই বা উবে গেল আবার?
ষাটের দশক থেকেই রাজনীতিতে আছেন রাজ্যের মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মনে আছে, সত্তরের দশকের শুরুতে দক্ষিণ কলকাতায় তাঁর বাড়ির দেওয়ালে ‘স্টেনসিল’ দিয়ে লিখে দেওয়া হয়েছিল, কংগ্রেসি নেতার মুন্ডু কাটা হবে। শোভনদেবের মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকেই কংগ্রেসের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম ও নিরস্ত্র গণ আন্দোলনের মধ্যে বাংলায় যে দ্বন্দ্ব চলছিল, তা-ই ওই সময়ে বামেদের মধ্যে মাথাচাড়া দেয়। তাঁর কথায়, “কিন্তু গরিব মানুষের জন্য লড়াইয়ের কথা বলে সাধারণ পুলিশ কনস্টেবলের মাথা কেটে ওরা কী বার্তা দিল? আসলে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি মানুষ বেশিদিন সহ্য করতে পারে না।” তিনি মনে করেন, জঙ্গল দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে অরণ্যের ওপর নির্ভরশীল আদিবাসীরা দীর্ঘ দিন মাওবাদী আন্দোলনকে সমর্থন জুগিয়েছিলেন। জঙ্গলটা জঙ্গলের মানুষের জন্যই, এটা বিভিন্ন সরকার মেনে নিলে অনেক আগেই এই আন্দোলন উঠে যেত। তাঁর কথায়, “যে সব প্রান্তিক এলাকায় প্রশাসনিক অনুপস্থিতি বা দুর্বলতার কারণে সমাজের প্রান্তিক মানুষ নানা রকম অন্যায় জুলুমের শিকার হতেন, সেখানেই মাওবাদীরা হিংস্র পদ্ধতির প্রতি মানুষকে খানিকটা আকৃষ্ট করতে পারত।” মনে করিয়ে দেন, এখানেই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের ন্যূনতম চাহিদাটুকু মেটানোয় প্রশাসনের ভূমিকা। যখন প্রশাসন সেটা পেরেছে, মানুষ এই ধরনের আন্দোলনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মমতার সরকারের মন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতায় এসেই মমতা সবচেয়ে আগে জঙ্গলমহলের উন্নয়নে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। বলেন, “বাড়ি বাড়ি চাল দেওয়া প্রথম শুরু হয় ওখানে। জঙ্গলমহলে ১০ হাজার ছেলেমেয়ের চাকরি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মানুষ ন্যূনতম চাহিদাটুকু পেয়ে গেলে সে অস্ত্র হাতে নেবে কেন? কে অনর্থক জীবন খোয়াতে চায়?”
সিপিআই (এমএল লিবারেশন) নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য মনে করেন, নকশালবাড়ির আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার পিছনে দেশের তদানীন্তন পরিস্থিতির বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাঁর কথায়, “স্বাধীনতার দু’দশক পরে তখন দেশ জুড়ে কংগ্রেসের প্রতি একটা মোহভঙ্গ ঘটছে। এর একটা বহিঃপ্রকাশ হল ন’টি রাজ্যে কংগ্রেস সরকারের পতন। আর একরকম বহিঃপ্রকাশ নকশালবাড়ির ধারায় সশস্ত্র আন্দোলন।”
দীপঙ্করের মূলত বিহার-ভিত্তিক দল নব্বইয়ের দশকে সশস্ত্র আন্দোলন ছেড়ে ক্রমশ গণআন্দোলন ও সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। তাঁর মতে, রাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসতেই দার্জিলিঙের কৃষকসভার নেতা-কর্মীরা মনে করলেন, তাঁদের সরকার এসেছে। এ বার তেভাগা আন্দোলনের অসমাপ্ত ‘এজেন্ডা’ দ্রুত পুরণ করতে হবে। কিন্তু সরকার পুলিশ নামাতেই একটা ব্যাপক অংশের কৃষক, ছাত্র-যুব মনে করল, তা হলে এই সরকারও তাদের সরকার নয়। ফলে সশস্ত্র সংগ্রামের আবেদন বাড়ল। দীপঙ্করের মতে, ষাটের দশকের গণ উন্মাদনা ছিল একটি বিশেষ সময় ও পরিস্থিতির ফসল। কিন্তু রাষ্ট্র কঠোর হয়ে সেই আন্দোলনকে কৃষক, শ্রমিক, গ্রাম, শহর থেকে ক্রমশ সরাতে সরাতে জঙ্গলে কেন্দ্রীভূত করে দিয়েছিল। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, সশস্ত্র সংগ্রামই করতে হবে, এই তাড়না মাওবাদীদের সশস্ত্র সংগ্রামের উপযুক্ত স্থানের খোঁজে ক্রমশ প্রত্যন্ত থেকে প্রত্যন্ততর অঞ্চলে ঠেলে দেয় বলে মনে করেন দীপঙ্কর। তাঁর কথায়, “বৃহত্তর জনগণ ও গণসংগ্রামগুলি থেকে বিচ্ছিন্নতার ফলে মানুষের কাছে তাঁরা আর কোনও রাজনৈতিক বা আদর্শগত বার্তা নিয়ে যেতে পারেননি। বিশেষত সমতলের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে।”
এ দেশে বারবার সশস্ত্র সংগ্রামের ঢেউ উঠেছে। বাংলার ‘অগ্নিযুগে’ যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি। পরে তেলঙ্গানা। নকশালবাড়ি। ভোজপুর। দণ্ডকারণ্য। ঢেউয়ের মতো উঠে তারা ঢেউয়ের মতোই মিলিয়ে গিয়েছে। অতি তীব্রতা মানুষ বেশিদিন সহ্য করতে পারে না, লিখেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। উপন্যাসের নাম ‘দিবারাত্রির কাব্য’।