চিনা প্রদীপের আলোয় ম্লান মৃৎশিল্প

আলোর উৎসবে তাঁদের ঘরে তৈরি মাটির প্রদীপে ঘর সাজান বরাকবাসী। সে সব মৃৎশিল্পীর জীবন ক্রমশ ডুবছে অন্ধকারে। চিনা মোমবাতি, টুনির ‘আগ্রাসনে’ অসহায় ওই শিল্পীরা। সংসারের রসদ জোগাড়ে তাঁরা তা-ই হিমশিম।

Advertisement

অমিত দাস

শেষ আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:৩৪
Share:

শিল্পের টানে। হাইলাকান্দিতে অমিত দাসের তোলা ছবি।

আলোর উৎসবে তাঁদের ঘরে তৈরি মাটির প্রদীপে ঘর সাজান বরাকবাসী। সে সব মৃৎশিল্পীর জীবন ক্রমশ ডুবছে অন্ধকারে।

Advertisement

চিনা মোমবাতি, টুনির ‘আগ্রাসনে’ অসহায় ওই শিল্পীরা। সংসারের রসদ জোগাড়ে তাঁরা তা-ই হিমশিম।

তুলনায় সস্তা এবং ঝকঝকে চিনা সামগ্রীর দাপটে বাজারে ক্রমে চাহিদা হারাচ্ছে মাটির প্রদীপ, বাসন, খেলনা। অভাবে ডুবছেন মৃৎশিল্পীরা। অনেকে পারিবারিক ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। দীপাবলিতে কয়েক দশক ধরে মাটির প্রদীপ গড়েন হাইলাকান্দি জেলার সিঙ্গালা বস্তির সুরেশ রুদ্রপাল। বছর পঁয়ষট্টির ওই মৃৎশিল্পী এই পেশায় এসেছিলেন তাঁর বাবা হরেকৃষ্ণ রুদ্রপালের হাত ধরে। পনেরো বছর বয়স থেকে প্রদীপের পাশাপাশি মূর্তি, বাসন, কলসি তৈরি করছেন। তাঁর পরিবারের সবাই মৃৎশিল্পী। এই শিল্পই এত বছর ধরে তাঁদের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু আজকাল মাটির জিনিস বিক্রি করে খরচ টানতে পারছেন না তাঁরা। সুরেশবাবুরা জানান, মাটির জিনিসের চাহিদা দিন দিন কমছে। মন চাইলেও তাই আর ওই শিল্পের ভরসায় থাকতে পারছেন না রুদ্রপাল পরিবার। হাইলাকান্দির জেলাসদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের বস্তিতে নিজেদের কারখানায় যাবতীয় জিনিস তৈরি করেন সুরেশবাবুরা। কারখানা শুধু নামেই। পুরনো রীতিতেই হাতে চাকি ঘুরিয়ে কলস-ঘট তৈরি হয় সেখানে। দুই ভাই— সুরেশ, বৃটিশ হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করেন। তাঁদের সঙ্গ দেন পরিবারের মহিলা সদস্যরা। কিন্তু অভাব দিনদিন বাড়তে থাকায় এত বছর ধরে আঁকড়ে রাখা ওই শিল্প ত্যাগ করার কথা ভাবতে আরম্ভ করেছেন রুদ্রপালরা। মাটির প্রদীপে রং লাগাতে লাগাতে সুরেশবাবু বললেন, ‘‘ঘর আর চলছে না। মৃৎশিল্প আমাদের মজ্জায়। এটা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলেই চোখে জল এসে যায়। কিন্তু আর তো কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছি না।’’ এক মনেই বলে চলেন প্রৌঢ়— ‘‘এমন একটা সময়ও ছিল, যখন বাজারে প্রদীপের এতটাই চাহিদা ছিল যে রাত জেগে বানিয়েও তা মেটাতে পারতাম না।’’

Advertisement

ছবিটা আমূল বদলেছে।

এর কারণ জানতে চাইলে সুরেশবাবুর স্ত্রী উর্মিলাদেবী বলেন, ‘‘বাজার ছেয়ে গিয়েছে চিনা প্রদীপে। দেখতে একেবারে আসল মাটির প্রদীপের মতোই। কিন্তু প্লাস্টিকের। কম দাম, কয়েক বছর ধরে চলে। তাই মানুষ সে সবই কিনছেন।’’ উর্মিলাদেবীর আশঙ্কা— এ ভাবে চলতে থাকলে বরাকে কয়েক দিনেই ইতিহাস হবে মৃৎশিল্প। তাঁর কথার রেশ টেনে সুরেশবাবু বলেন, ‘‘শুনেছি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় মৃৎশিল্পীদের আর্থিক অনুদান দেয় সরকার। অসমেও তা করা হলে আমরা বাঁচতে পারতাম। বাঁচত বাবা-দাদুর রেখে যাওয়া শিল্পটাও।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement