লাইনে অপেক্ষা করছেন ভোটাররা। বৃহস্পতিবার মাধেপুরায়। ছবি: পিটিআই।
কেউ বলছে, শেষ হাসি হাসবেন ‘লোহিয়ার লোকেরা’। কারও আবার মত, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহেরা জয়ধ্বজা ওড়াবেন বিহারে। বুথ-ফেরত সমীক্ষায় এই মতের অমিলের জেরে ইদানীং কালের সবচেয়ে আলোচিত বিধানসভা ভোটের পরিণতি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই গেল। যুযুধান দুই পক্ষই এক-একটি সমীক্ষা হাতিয়ার করে দাবি করল, সরকার তারাই গড়ছে।
আজ পঞ্চম দফার ভোট গ্রহণের পরে যে ক’টি বুথ-ফেরত সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে, তার অধিকাংশই অবশ্য এগিয়ে রাখছে লালু প্রসাদ-নীতীশ কুমারের মহাজোটকে। কিন্তু এগিয়ে থাকার পরিমাণে তারতম্য বিস্তর। কোনও সমীক্ষা বলছে, যথেষ্ট স্বস্তি নিয়েই সরকার গড়তে পারবে মহাজোট। আবার অন্য সমীক্ষার মতে, লড়াইটা সমানে সমানে। এর বিপরীতে অন্তত চারটি সমীক্ষা বিজেপির সরকার গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তার কেউ নিশ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলছে, আবার কারও মতে ম্যাজিক সংখ্যার থেকে একটু পিছিয়েই থাকবে এনডিএ।
এটা ঠিক যে, বুথ-ফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাস সব ক্ষেত্রে মেলে না। অতীতে বহু বারই দেখা গিয়েছে যে, ব্যালট বাক্স খোলার পরে পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছেন ভোট পণ্ডিতেরা। কিন্তু সমীক্ষা মিলেছে, এমন উদাহরণও কম নয়। এবং ভোটারদের মানসিকতার আন্দাজ পেতে এই ধরনের সমীক্ষার একটা গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। তবে এ বারে সমীক্ষাগুলির মধ্যে মতের অমিল এতটাই যে, ছবি স্পষ্ট হওয়া তো দূরস্থান বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
কেমন ফারাক দেখা যাচ্ছে সমীক্ষাগুলির পূর্বাভাসে?
এবিপি নিউজ-এসি নিয়েলসেনের সমীক্ষা বলছে, ২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভায় ১৩০টি আসন পেয়ে সরকার গড়তে চলেছে মহাজোট। পক্ষান্তরে বিজেপি ও তার জোটসঙ্গীরা পেতে পারে মোট ১০৮টি আসন। বাকি ৫টি আসন পাবে দুই জোটের বাইরে থাকা ছোট দলগুলি। আবার গত লোকসভা ভোট থেকে শুরু করে দিল্লি, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র ভোটের
ফল প্রায় মিলিয়ে দেওয়া টুডেজ-চাণক্যের যৌথ সমীক্ষার মতে, ১৫৫টি আসন পেয়ে হাসতে হাসতে ক্ষমতায় আসবে এনডিএ। ৮৫টি আসন পেয়ে বিরোধী আসনে বসতে হবে লালু-নীতীশদের। তাদের হিসেবে ছোট দলগুলি পেতে পারে মাত্র তিনটি আসন। এসি নিয়েলসেন যেখানে মহাজোটকে ৪৪ শতাংশ এবং এনডিএ-কে ৪২ শতাংশ ভোট দিয়েছে, সেখানে চাণক্যের মতে বিজেপি ৪৬ শতাংশ এবং মহাজোট ৩৯ শতাংশ ভোট পেতে পারে।
এই দুই মেরুর মাঝে থাকা টাইমস নাও-সি ভোটারের পূর্বাভাস মহাজোট ১২২টি এবং এনডিএ ১১১টি আসন পাবে। ইন্ডিয়া টুডে-সিসিরোর সমীক্ষা আবার এনডিএ-কে সামান্য এগিয়ে রেখে ১২০টি আসন দিয়েছে। মহাজোটকে ১১৭।
বুথ-ফেরত সমীক্ষা বিহারের ভবিষ্যতের কোনও সুনির্দিষ্ট হদিস না-দিলেও রাজনীতির কাটাছেঁড়া অবশ্য বন্ধ থাকছে না। ভোট বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়েলসেনের সমীক্ষা সত্যি প্রমাণ করে যদি মহাজোট জিতে যায়, তা হলে বুঝতে হবে বিহারের রাজনীতিতে জাতপাতের পাটিগণিতটাই এখনও বাস্তব। উন্নয়নের অ্যাজেন্ডাকে সামনে রেখে সেই পাঁচিল ভাঙতে ব্যর্থ হলেন মোদী-অমিত শাহরা। সঙ্ঘ পরিবারও উগ্র হিন্দুত্বের রসায়নে জাত-সমীকরণ ঘেঁটে দিতে পারেনি। বরং যাদব, মুসলিম, কুর্মি, দলিত এবং অতি পিছিয়ে পড়া আর উচ্চবর্ণের একটি অপেক্ষাকৃত ছোট অংশকে নিয়ে রামধনু জোটে বাজিমাত করতে চলেছেন জাত রাজনীতিতে পোড় খাওয়া লালু-নীতীশ। জাত রাজনীতির এই সমীকরণটা গত বিধানসভা ভোটেও দেখা গিয়েছে। সে বার বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নীতীশ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন দখল করলেও লালুর নিজস্ব যাদব-মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক অটুট ছিল।
জাতপাতের এই অঙ্ক নিয়েই অবশ্য মতান্তর রয়েছে চাণক্যর। পাঁচ দফায় সমীক্ষার পর তাদের দাবি, উচ্চবর্ণ তথা ব্রাহ্মণ, বণিক ও রাজপুতদের ষাট শতাংশের বেশি ভোট প্রত্যাশিত ভাবেই পেয়েছে বিজেপি। সেই সঙ্গে প্রচলিত জাত সমীকরণে ফাটল ধরিয়ে দলিত ও পিছিয়ে পড়াদের পঞ্চাশ শতাংশ ভোট নিজেদের অনুকূলে আনতে সফল হয়েছেন অমিত শাহ।
এমনকী, যাদবদের ১৭ শতাংশ ও ৯ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছে বিজেপি। বিহারে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জাতপাতের সূত্র এ ভাবে ওলোটপালট করে দিয়েই পটনা দখলের পথে হাঁটছে এনডিএ।
কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর উন্নয়নের অ্যাজেন্ডা তা হলে কী ভূমিকা নিল নীতীশের বিহারে? মহাজোটকে এগিয়ে রাখা সমীক্ষাগুলি বলছে, একে তো নীতীশের দশ বছরের রাজত্বে উন্নয়নের পাল্টা ছবি ছিল ভোট ময়দানে। তার উপরে গত ১৭ মাসের দিল্লি শাসনে উন্নয়নের এমন কোনও নজির মোদী তুলে ধরতে পারেননি, যা বিহারের জনগণের উপরে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সড়ক সংস্কার, বিদ্যুৎ সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে সুনাম অর্জন করা নীতীশ প্রচারে জোর গলায় বলতে পেরেছেন, মোদী শুধুই বক্তৃতা দেন। কাজের কাজ কিছুই করেন না।
এনডিএ-র পক্ষে রায় দেওয়া সমীক্ষাগুলির আবার মত, মোদীর উন্নয়নের প্রচার বিহারে ইতিবাচক প্রভাবই ফেলেছে। যেমন চাণক্যের দাবি, তাদের প্রশ্নের উত্তরে ৪১ শতাংশ বিহারবাসীই বলেছেন, বর্তমান সরকারের কাজকর্মে তাঁরা খুশি নন। খুশি, বলেছেন মাত্র ২২ শতাংশ। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারকেও ‘খারাপ’ তকমা দিয়েছেন ৩৮ শতাংশ ভোটদাতা। ৩০ শতাংশের মতে তিনি ভাল কাজ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতীশের প্রতি এই অনাস্থার বিপরীতে মোদীর উন্নয়নের ডাকে সাড়া দিয়েছেন বিহারবাসী। জাতপাতের সমীকরণ বদলের পাশাপাশি দিন বদলের স্লোগানও কাজ করেছে সে রাজ্যে।
এই পরস্পরবিরোধী দাবিদাওয়ার মধ্যে কোনটি শেষমেশ পাশ করল, তা অবশ্য রবিবারের আগে বোঝার উপায় নেই। কিন্তু ফল যা-ই হোক, জাতীয় রাজনীতিতে যে তার প্রভাব পড়বে তা নিয়ে কার্যত কোনও মতবিরোধ নেই। বিজেপি বাজিমাত করলে মোদীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বাড়বে। কিন্তু তা না-হলে ঘরোয়া রাজনীতিতে চাপের মুখে পড়বেন তিনি। অসহিষ্ণুতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে বিক্ষোভের আবহাওয়া তৈরিই রয়েছে। বিজেপির হার তাতে নিশ্চিত ভাবেই ইন্ধন জোগাবে।
অমিত শাহেরা অবশ্য এখন থেকেই বলছেন, বিহারের ফলাফল মোদীর সরকারের কাজকর্মের উপর রায় নয়। কিন্তু দিল্লি ভোটের মতো, এ বারও সেই যুক্তি যে বাস্তবে ধোপে টিকবে না, সে কথা একান্তে মানছেন বিজেপি নেতারাই। বিশেষ করে বিহারে মোদীর বিপুল প্রচারের পরে। সে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী পদে সর্বজনগ্রাহ্য কোনও মুখ তুলে ধরতে পারেনি এনডিএ। মোদীই ছিলেন প্রচারের প্রধান মুখ। তিনি তিরিশটিরও বেশি সভা করেছেন। বিধানসভা ভোটে কোনও প্রধানমন্ত্রীর এত সভা করার দৃষ্টান্ত বিরল।
কিন্তু বিহার ভোটের ফল থেকে অমিত এখনই যে ভাবে মোদীকে বিযুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, তাতেই অশনিসঙ্কেত দেখছেন বিজেপির কেউ কেউ। আজ বুথ-ফেরত সমীক্ষা প্রকাশের পরে বিজেপি সভাপতির মন্তব্য, ‘‘যা বলার ৮ তারিখ বলব’’। কিন্তু নীতীশের টুইট, ‘‘মহাজোটকে বিপুল সমর্থন দেওয়ার জন্য বিহারের মানুষকে ধন্যবাদ।’’ আর লালুর স্বভাবসুলভ দাবি, ‘‘মহাজোট ১৯০টি আসন পাবে।’’
এই সুরই বজায় থাকবে, না একেবারে উল্টে যাবে সেটা বলবে রবিবার দুপুর।