মুম্বই মনতাজ

লোখান্ডওয়ালা এবং জুসওয়ালা

লেপ-কম্বল-শাল-সোয়েটারের ‘সিন’ অনেক আগেই শেষ। ‘ব্যাপক’ গরম পড়েছে, পড়ছে। থিয়েটার জগৎ তথা ভাষণ-বক্তৃতা ও লিখিত ভাষার একেবারে কথ্য ব্যবহার শুনে আসছি বেশ কিছু দিন ধরেই। তেমন গেরাহ্যি করিনে। এ বার বঙ্গদেশ বা কলকাতা ছেড়ে আসার সময় দুটি নলেন পাটালি থালা, গুড়ের জলভরা কড়াপাক, খানকতক বাংলা বই এবং দু’পাশের দুই পকেটে উপরোক্ত শব্দ দুটিকে প্রায় লুকিয়ে নিয়ে এসেছি মুম্বই শহরে। ‘লুকিয়ে’ বলতে, মরাঠি-গুজরাতি-হিন্দি-ইংরিজি-ওড়িয়া বা তামিল, কথ্য এবং অকথ্য ভাষার আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে, অতি সন্তপর্ণে, সঙ্গোপনে।

Advertisement

মিলন মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০১৪ ০০:০৫
Share:

লেপ-কম্বল-শাল-সোয়েটারের ‘সিন’ অনেক আগেই শেষ। ‘ব্যাপক’ গরম পড়েছে, পড়ছে। থিয়েটার জগৎ তথা ভাষণ-বক্তৃতা ও লিখিত ভাষার একেবারে কথ্য ব্যবহার শুনে আসছি বেশ কিছু দিন ধরেই। তেমন গেরাহ্যি করিনে। এ বার বঙ্গদেশ বা কলকাতা ছেড়ে আসার সময় দুটি নলেন পাটালি থালা, গুড়ের জলভরা কড়াপাক, খানকতক বাংলা বই এবং দু’পাশের দুই পকেটে উপরোক্ত শব্দ দুটিকে প্রায় লুকিয়ে নিয়ে এসেছি মুম্বই শহরে। ‘লুকিয়ে’ বলতে, মরাঠি-গুজরাতি-হিন্দি-ইংরিজি-ওড়িয়া বা তামিল, কথ্য এবং অকথ্য ভাষার আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে, অতি সন্তপর্ণে, সঙ্গোপনে। এ বারে, হে পাঠক, হে মুম্বই-বাঙালি, আপনারা এই দুটি সাম্প্রতিক ‘রত্ন’এর ‘ব্যাপক’ ব্যবহার শুরু করে দিন। যাতে, অন্তত কথায়-বার্তায়, আড্ডা-আলোচনায় আমাদের চারপাশে একটা ‘কলকাতা-কলকাতা’ গন্ধ থাকে। ম’ ম’ করে না হলেও, হালকা ধোঁয়া অথবা সকালের প্রচ্ছন্ন ধোঁয়াশার মতো। অনেকটা এখনকার ভোরবেলার মতো।

Advertisement

লোখণ্ডওয়ালা আবাসের পেছন দিকে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে গরান গাছপালা, ঝোপঝাড়, জলাভূমি। আর একটু গেলেই আরব সাগরে সূয্যিঠাকুর নিত্য অস্ত যান আকাশের অথৈ ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, মহা আড়ম্বরে। সমুদ্র-জলাভূমি এবং লোখণ্ডওয়ালার থই থই কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে একটি প্রশস্ত রাস্তা। এবং যেহেতু এই পথটি অদ্যাবধি কোনও সদর রাস্তা বা রাজপথের সঙ্গে সংযুক্ত নয়, ফলে আধ কিলোমিটার লম্বা এই রাস্তাটুকু এখনও যানবাহনের ভিড়ে তেমন আক্রান্ত নয়। লোকাল পাবলিক মুখে মুখে আদর ভরে এটির নাম দিয়েছে ‘ব্যাক রোড’। স্বাস্থ্য-সচেতন বাসিন্দাদের কপালে জুটে যায় মাগনা অক্সিজেন। সকাল-বিকেল। বছর পঁচিশেক পিছিয়ে গেলে দেখতে পাই চারধারে শুধু জলাভূমিতে ঝোপঝাড়, জঙ্গল। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে। আন্ধেরি স্টেশন থেকে জয়প্রকাশ নারায়ণ বা জেপি রোড সটান চিৎ হয়ে পড়ে থাকত ভারসোবা গ্রাম অবধি। অবরে-সবরে দু’একখানা বাস বা মৎস্যজীবীদের লরি যাতায়াত করত।

অনেকটা কলকাতার সল্ট লেকের কায়দায় ভরে গেল জলাভূমি। আশি-বিরাশি সাল থেকে বছর পাঁচেকের মধ্যেই জায়গাটি জুড়ে পটু এবং ধুরন্ধর বিল্ডাররা প্রায় রাতারাতি ঘরবাড়ি, আকাশচুম্বী দালান-কোঠা বানিয়ে ফেলল। যে কোম্পানি প্রথম বাড়ি বানাতে শুরু করল তার নামেই অঞ্চলটির পরিচিতি। ‘লোখণ্ডওয়ালা কনস্ট্রাকশন’। আদি মালিকের পদবি থেকেই নেওয়া। লৌহ-খণ্ড-ওয়ালা (স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী), মুখে মুখে লোখণ্ড-ওয়ালা। দেখতে না দেখতেই শহরের পয়সাওয়ালা বাসিন্দারা (বর্তমান কলমচি হেন হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম বাদে) হা-হা, খা-খা করতে করতে এসে বাসা-বাড়ি-বাংলোয় বসত গাড়ল। দোকানপাট, মার্কেট গজিয়ে উঠল রাতারাতি। এক হাতে স্রেফ ফোন তুলে নম্বর টিপলেই যেমন পাবেন মুচি-ময়রা থেকে মদ-মাংস। অন্য হাত বাড়ালেই ধোপা-নাপিত (অর্থাৎ কিনা লন্ড্রি/সেলুন) থেকে শুরু করে ডাক্তার-জিম-হাসপাতাল বা পোশাক-আশাক। প্রসূতি সদন তো আছেই, শ্মশানও প্রায় ঢিল-ছোড়া দূরত্বে।

Advertisement

তা, আপন দেহের হৃদযন্ত্র তথা মধ্য বয়েসের অন্য কলকব্জাগুলো কিঞ্চিৎ সজীব রাখার আশায় পড়ি-কি-মরি করে সক্কালবেলা হাঁটতে যাই ব্যাক রোডে। কাক-ডাকা ভোরের ফিকে অন্ধকারেই বেশ কিছু স্বাস্থ্যান্বেষীকে হাঁটতে, দৌড়তে দেখা যায়। যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ। একলা, দোকলা, অনেকে মিলে।

কংক্রিটের চওড়া ব্যাক রোড যেখানে শেষ হয়ে ডান দিকে অপেক্ষাকৃত রোগা রাস্তায় মোড় নিয়েছে, সেখান থেকে আবার শুরু হয়েছে ‘লোখণ্ডওয়ালা জগার্স পার্ক’। কিছুই না। রোগা রাস্তার থেকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে আধ কিলোমাটির জমি রাস্তার সমান্তরালে ফুট তিনেক উঁচু করে বাঁধা হয়েছে শৌখিন টালি ফেলে। রোলিং দিয়ে ঘেরা। দু’ধারে গেট। গেটে দারোয়ান। দেড় টাকা টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। মান্থলি টিকিটও আছে।

এ বারে, যার কথা বলতে গিয়ে লোখণ্ডওয়ালার ইতিহাস-ভূগোলের খানিকটা ভূমিকা করতে হল, সে এখন তার নড়বড়ে ফোল্ডিং টেবিলে নানান রং-বেরঙের ফ্লাস্ক সাজাতে ব্যস্ত। এক একটি ফ্লাস্কে হরেক রকমের ‘জুস’ বা রস। আমলকি, নিম, পেঁপে, লাউ, কোকাস, করলার রস ছাড়াও আস্ত ফলের স্যালাড, ‘কল’ বেরনো মুগ বা ছোলা। বছর কুড়ি বয়েস। নাম মুরারি কুমার। প্রায় তিন বছর ধরে ও এখানে টেবিল পেতে মোবাইল স্টল সাজিয়ে বসে।

“কোথায় থাক, মুরারি?”

হিন্দিতে জবাব দেয়, “লোখণ্ডওয়ালা সার্কেলের কাছে ‘সুরেশ নগরে’।”

“কে কে আছে বাড়িতে? মা-বাবা?”

“অকেলা হি রহতা হুঁ, সাব। মেরে উমরকা অউর চার পাঁচ লড়কা হ্যায় সাথমে।”

“তোমার আদি নিবাস, মানে মুলুক কোথায়?”

“বিহার। পরিবারের সবাই ওখানেই।”

ছেলেটি বেশ মিশুকে। কথা বলছে বটে, তবে হাতের কাজ থামায়নি। খদ্দেররা হেঁটে হেঁটে হা-ক্লান্ত হয়ে এসে ওর টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে মুখে হাসি ফুটিয়ে মুরারি আপ্যায়ন করে। খানিকটা ‘খেজুর’ও সেই সঙ্গে জুড়ে দেয়, “কেমন আছেন সাহাব! আজকে খুব ঘাম ঝরছে, দেখি।”

কিছু নিত্য খদ্দেরকে কিছুই বলতে হয় না। যে যেটা রোজ খায়, সেইটিই ফ্লাস্ক থেকে পরিষ্কার গেলাসে ঢেলে এগিয়ে দেয়। বিনা বাক্যব্যয়ে। “গুড মর্নিং”, “তবিয়ত ঠিক হ্যয় না, সাওয়ন্ত সাব।” কিংবা “আজ অকেলে আয়ে হ্যাঁয়? আন্টি দিখাই নেহি, দে’ রহে?”

সামনে খদ্দের না থাকলে, নিজের কথা বলে, “লেখাপড়া ছেড়ে একজন জুসওয়ালা লোকের সঙ্গে থেকে হার্বাল রস বানাবার পদ্ধতি শিখে নিয়েছি। তার পর তো এইখানে। সকালে লোখণ্ডওয়ালা জগার্স পার্ক, বিকেলে দোকান খুলে বসি ক্যয়ফি আজাম পার্কে। আজকাল সক্কলেই শরীর-স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। ফলে, হাবিজাবি না খেয়ে, লোকে প্রথমেই রস বা স্যালাড খেয়ে দিন শুরু করে।”

কলকাতায় ক’টা জগার্স আছে জানি না। আদৌ আছে কিনা খবর নেই। থাকলেও এত জনপ্রিয় নয়। মুরারি আরও বলে, “পনেরো থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ টাকায় তাজা রস বেশ সাধ্যের মধ্যেই। যে রকম জুস বাছবেন, তাতেই মোটামুটি আন্দাজ পাই কে কি রোগে ভুগছে।”

“যথা?”

“যেমন ধরুন, নিম বা করলার (এ রাজ্যে ‘উচ্ছে’ বলে কোনও পদার্থ নেই, থাকলেও চারবংলা বা লোখণ্ডওয়ালার বাজারে দেখিনি অদ্যাবধি!) রস যারা খায়, তাদের অবশ্যই চিনির দোষ আছে। যারা মিক্সড প্রোটিন জুস খায়, তাদের বেশির ভাগই বডি বিল্ডার্স। মেয়ে-বউরা চকচকে, তকতকে এবং টানটান চামড়া বা ত্বক রাখার জন্যে খায় পাকা পেঁপে বা আলোভেরার রস।”

“আপনাকে কোনটা দেব স্যর?”

ভেবেচিন্তে বললুম, “এই সবুজ ফ্লাস্কে কি আছে? ”

“লাউয়ের রস। দেব?”

“কত করে?”

“আপনি প্রথম দিন খাবেন, দাদা। পয়সা নেব না।”

বলে এক গেলাশ হাসি দিল উপরি। বুঝলুম, নতুন খদ্দের ধরার কায়দা। বললুম, “তাহলে সব ক’টা ফ্লাস্ক থেকে একটু একটু করে নিয়ে ঘুঁটে দাও গেলাশে।”

পুঁথিতে পড়া নবরসের পর ‘সর্বরোগহর’ ‘মুরারি রস’ খেয়ে মনে হল দশম রস খেলুম। তার পরেই ঠাকুরের কথা ভেসে এল মুম্বই ভোরের বাতাসে, “রসে বশে রাখ্সি মা চেটেপুটে খাই।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement