ঘর যখন মনের ওষুধ! ছবি: সংগৃহীত।
মন ভাল করা! কথাটা বলা যত সহজ, ব্যাপারটা তত সোজাসাপ্টা নয়। মন ভাল করতে হলে কেবল ভাল কথা, ভাল কাজ, ভাল যাপনই যথেষ্ট নয়। দরকার কিছু হরমোনেরও। যা মস্তিষ্কে চুঁইয়ে পড়লেই নিমেষে ফুরফুরে হবে মন। মন আর হরমোনের সেই রসায়নকে কে কাজে লাগিয়েই দিবারাত ভাল থাকার এক ‘শর্টকাট’ তৈরি করা হয়েছে। যার নাম ‘ডোপামিন ডেকর’।
ডোপামিন মস্তিষ্ক নিঃসৃত এক সুখী হরমোনের নাম। আর ডেকর বা ডেকরেশন হল অন্দরসজ্জা। এমন অন্দর সজ্জা যা দেখা মাত্র ভাল হয়ে যাবে মন, কাটবে ক্লান্তি, দূর হবে মনে লেগে থাকা মালিন্য। যা শুধু মনোকষ্ট নয় শারীরিক নান রোগেরও কারণ। ডোপামিন ডেকর সেই মন খারাপকে গোড়া থেকে উপরে রোগমুক্ত থাকার চাবিকাঠি।
অন্দরসজ্জার জগতে তাই ‘ডোপামিন ডেকর’ হইচই ফেলেছে। তার কারণ শুধু এর মন ভাল করা ফলাফল নয়, এর পদ্ধতিগত ভিন্নতাও। কারণ ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে প্রচলিত যে সব ধ্যান ধারণা— যেমন ছিমছাম, মার্জিতভাব ইত্যাদি মানুষ মেনে এসেছে, ডোপামিন ডেকর তার এক্কেবারে উল্টো কথা বলে। তার লক্ষ্য একটাই— ঘরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা!
ডোপামিন ডেকর আসলে কী?
সহজ কথায়, যে ভাবে সাজানো ঘর দেখলেই মনে তাৎক্ষণিক খুশি বা আনন্দ সঞ্চার হয়, মস্তিষ্কে সুখী হরমোন ডোপামিন ক্ষরণের অনুকূল অবস্থা তৈরি হয়, তা-ই আদতে ডোপামিন ডেকর।
এই অন্দরসজ্জা কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না। বরং এটি ব্যক্তিভেদে, নির্দিষ্ট মানুষটির পছন্দ অপছন্দে ভর করে বদলে যায়। কারণ, কার কখন ডোপামিন ক্ষরণ হবে, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কারও উজ্জ্বল রঙে মন ভাল হতে পারে, কারও ভাল লাগতে পারে সুখস্মৃতি বহনকারী জিনিসপত্র। বিজ্ঞান অবশ্য বলছে, যে কোনও সুন্দর এবং উজ্জ্বল পরিবেশই সাধারণত মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ বৃদ্ধি করতে পারে, যা মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে। তবে ঘরকে যদি সুখী হরমোনের উৎসেচক বানাতেই হয় তবেসেটুকুর বাইরেও অনেক কিছু করার আছে।
১. প্রাণবন্ত রং
ডোপামিন ডেকরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রঙের ক্যারিশমা। দেওয়ালের এক কোণে উজ্জ্বল হলুদ, গোলাপি বা নীল রঙের ব্যবহার করতে পারেন। তবে পুরো ঘর রাঙাতে না চাইলে সোফার কুশন, পর্দা বা কার্পেটে বৈচিত্র্যময় রঙের ছোঁয়া রাখুন।
২. টেক্সচার এবং প্যাটার্ন
একই রকম একঘেয়ে জিনিসের বদলে বিভিন্ন ধরণের ফেব্রিক ব্যবহার করুন। যেমন—ভেলভেটের সোফা, সুতির কুশন কভার এবং হাতে বোনা কার্পেট। জ্যামিতিক নকশা বা ফ্লোরাল প্রিন্টের মিশ্রণ ঘরে এক অন্যধরনের গতিময়তা আনে।
৩. গাছপালা
সবুজ রং চোখের আরাম দেয়। ঘরের কোণে বড় কোনো ইনডোর প্ল্যান্ট অথবা জানলার পাশে ছোট ছোট ক্যাকটাস রাখলে পরিবেশ সতেজ থাকে, যা দেখলেই মনে শান্তি আনে।
৪. স্মৃতিমেদুর জিনিসপত্র
প্রিয় কোনও ভ্রমণের স্মৃতি, ছোটবেলার কোনও খেলনা বা নিজের আঁকা ছবি অথবা বন্ধুর থেকে পাওয়া কোনও চিরকুট বা সন্তানের হাতে আঁকা কার্ড ঘরের দেওয়ালে বা শেলফে বা ফ্রেমে বাঁধিয়ে সাজিয়ে রাখুন। এগুলো দেখলে মনে পুরনো সুখস্মৃতি উঁকি দিয়ে যাবে, যা মন ভাল করতে বাধ্য।
৫. আলোর ব্যবহার
ডোপামিন ডেকরে প্রাকৃতিক আলোর গুরুত্ব অপরিসীম। দিনের বেলা জানলা খোলা রাখুন যাতে প্রচুর আলো ঢুকতে পারে। আর রাতের জন্য ব্যবহার করুন নিওন সাইন, রঙিন ল্যাম্পশেড বা সুন্দর নকশাদার ঝাড়বাতি।
৬. বাহুল্যের উদযাপন
মিনিমালিজম বা ‘লেস ইজ় মোর’ নীতি এখন অতি সাধারণ। সেই নীতির উল্টো পথে হাঁটে ডোপামিন ডেকর। এখানে পছন্দমতো অনেক জিনিস একসঙ্গে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখতে পারেন। তা একটু অগোছালো দেখতে লাগলেও আসলে এক অদ্ভুত নান্দনিকতা তৈরি করে।
কেন ডোপামিন ডেকর বেছে নেবেন?
ঘর কেবল চারটে দেয়ালের আশ্রয় নয়। ঘর মনেরও বিশ্রামের জায়গা। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে যদি এমন এক পরিবেশে ফেরা যায় যা মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়, তবে তার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! ডোপামিন ডেকোরের উজ্জ্বল ও রঙিন পরিবেশ অবসাদ দূর করতে এবং মনমেজাজ ভাল রাখতে সাহায্য করে। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে ঘরে এক রকমের উৎসবের আমেজও আনে। যা শুধু একঘেয়েমি কাটায় না, বেঁচে থাকার রসদও জোগায়।