অভিনেত্রী কানি কুশ্রুতি। ছবি: সংগৃহীত।
২০২৪ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গ্র্যান্ড প্রিক্স’ পুরস্কার জিতেছিল তাঁর অভিনীত ছবি ‘অল উই ইম্যাজিন অ্যাজ় লাইট’। প্যালেস্তাইনের প্রতি সমর্থন জানাতে রেড কার্পেটে হেঁটেছিলেন তরমুজ আকৃতির ব্যাগ হাতে। কান -ফেরত নায়িকার প্রতিবাদ, রূপ, সাজগোজ তার পর থেকেই আলোচনায়। সেই কানি কুশ্রুতি এ বার পা রাখলেন বলিউডে। কেরল ও বাংলার আত্মিক যোগাযোগ ও ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডায় বসলেন কানি।
‘অস্সি’ ছবির প্রচারে কলকাতায় তাপসী পন্নুর সঙ্গে কানি কুশ্রুতি। ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: বাঙালি আর মালয়ালিদের মধ্যে নাকি অনেক মিল?
কানি: এই তত্ত্বের কথা আমিও অনেক শুনেছি। কলকাতায় এলে আরও বেশি শুনি। আগে বুঝতে পারতাম না। এখন আমি নিজেই টের পাই। এখানকার মানুষের সঙ্গে কথোপকথনটাও যেন অন্য রকম হয়। অন্য রাজ্যের থেকে আলাদা। তার কারণ বোধ হয় এক ধরনের সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, সিনেমা, সাজ…
প্রশ্ন: আর বোধ হয়…
কানি: (হেসে) কমিউনিস্ট পার্টি! এটাই বলছিলেন তো? অনেকেই বলেন, এই দুই রাজ্যের কুটুম্বিতায় নাকি বিশেষ অবদান আছে কমিউনিস্ট পার্টির! যা-ই হোক, সব মিলিয়ে কেরল আর বাংলার মধ্যে বেশ আত্মিক যোগাযোগ আছে বলে মনে হয়। আমাকে পশ্চিমবঙ্গের অনুরাগী বলতেই পারেন। তার উপর, বাউল গানের প্রতি অদ্ভুত টান রয়েছে আমার।
প্রশ্ন: এই টান থেকেই পেশাগত যোগাযোগ তৈরি হবে নাকি?
কানি: (হেসে) না না! আমি এখনও হিন্দিটাই বলতে পারি না। বাকি ভাষা শিখতে আরও কত সময় লাগবে বলুন তো! বাংলার যা যা আমার পছন্দের, তাতে সক্রিয় ভাবে অংশ নেওয়ার কথা এখনও ভাবিনি। তাই বাংলা সিনেমায় পা রাখার সময় এখনও আসেনি আমার। তা ছাড়া, এখানে তো কত ভাল ভাল অভিনেতা-অভিনেত্রী এমনিতেই আছেন।
প্রশ্ন: এত শত মিলের মধ্যে সাজের কথা বললেন আপনি। এখন যে গামছা ড্রেসটি পরে রয়েছেন বা ধরা যাক, হাতেবোনা শাড়ি পরার চল ওখানকার মতো এখানেও আছে কিন্তু। আপনার তেমন শাড়ির প্রতি বেশ টান আছে দেখেছি।
কানি: (হেসে) আপনারও মনে হয়েছে? সাদৃশ্যের তালিকায় এ বার ওটা বলতেই যাচ্ছিলাম। কেরলের মানুষ কিন্তু এখানকার সুতির শাড়ি খুব পছন্দ করেন। সুতোর কাজের অনুরাগী অনেকেই।
‘অল উই ইম্যাজিন অ্যাজ় লাইট’-এর এক দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: সৌন্দর্য ও রূপের যে মানদণ্ড তৈরি হয়েছে সমাজে, ছবির দুনিয়ায় কাজ করে সেই মাপকাঠির বিরুদ্ধে লড়াই করা খুব কঠিন নয় কি?
কানি: দেখুন, আমি কেরল থেকে এসেছি। সেখানকার ইন্ডাস্ট্রিতে রূপের মানদণ্ড খানিক আলাদা। অন্যত্র যে ভাবে সৌন্দর্যকে দেখা হয়, তার থেকে ভিন্ন। তাই ওখানে আমাকে এই লড়াইটা করতে হয়নি। কিন্তু এখানে একটা বিষয় নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। আমাদের রাজ্যে, বা বলা উচিত, আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের ত্বকের রং আমার থেকেও বেশি চাপা। সেই মানুষগুলিকে ছবির দুনিয়ায় প্রায় দেখাই যায় না বললে চলে। ভারতে লোকে ভাবে, বাদামি গায়ের চামড়াই সবচেয়ে বেশি গাঢ় রঙের। কিন্তু রঙের তো সীমা বলে কিছু নেই!
প্রশ্ন: আর সেই মানুষগুলিই বাদ পড়ে যান ছবি থেকে? গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে?
কানি: বাদ যদি না-ও পড়েন, মুখ্যচরিত্রে কোনও দিন জায়গা পান না তাঁরা। তাই এই লড়াই একা কারও হতে পারে না। অনেকে মিলে লড়তে হবে। ফ্যাশন থেকে শুরু করে সিনেমা জগৎকে নতুন করে বুঝতে হবে, সৌন্দর্যের কোনও মাপকাঠি হতে পারে না। ফর্সা হওয়ার ক্রিম বিক্রি করার আর জায়গা নেই।
কানি কুশ্রুতি এ বার পা রাখলেন বলিউডে। ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: অর্থাৎ সিনেমায় উল্লেখযোগ্য চরিত্র পেতে হলে অভিনয়ের বাইরে গিয়ে আরও অনেক কিছুকে মাথায় রাখতে হয়—
কানি: হ্যাঁ, যেমন বর্ণের কথা বললাম, ঠিক সে ভাবে জাতপাতের বিভেদও খুব স্পষ্ট। অন্তত আমাদের রাজ্যে তো এই ভেদাভেদ খুব স্পষ্ট। সেখানে কোনও দলিত নায়িকা নেই। এখানে আছে কি? অন্যত্র আছে কি? আমি জানি না, কিন্তু সন্দেহ আছে। অথচ জানেন, এই মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রির প্রথম নায়িকা ছিলেন পিকে রোজ়ি, যিনি একজন দলিত? যদিও পরে তাঁকে বার করে দেওয়া হয় ইন্ডাস্ট্রি থেকে।
প্রশ্ন: তাই কি ছবি করা নিয়ে এতটা বাছবিচার করেন?
কানি: হ্যাঁ সেই কারণেই সমমনস্ক মানুষদের সঙ্গে কাজ করার পক্ষপাতী আমি। প্রত্যেকের মতোই আমারও নিজস্ব লড়াই রয়েছে। এই সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে খুব সরাসরি লড়াই করেছি, তা নয়। কিন্তু আমার পক্ষে যতটা সম্ভব, ততটা প্রতিবাদ করেছি। তাই বেছে বেছে কাজ করতেই পছন্দ করি।
প্রশ্ন: কিন্তু বলিউডের মূলধারার ছবিতে কাজ করার ইচ্ছে হয় না?
কানি: খুব একটা না।
প্রশ্ন: বাণিজ্যিক বলে?
কানি: না, না। আমি বাণিজ্যিক ছবি পছন্দ করি। কিন্তু হিন্দি বাণিজ্যিক ছবি মোটেও ভাল লাগে না। খুবই একঘেয়ে মনে হয়। প্রকৃত অর্থে বিনোদনের চাহিদা মেটাতে পারলে যে কোনও বাণিজ্যিক, মূলধারার ছবি আমি দেখতে রাজি। বাণিজ্যিক ছবি দিয়েই তো আমরা মূলধারার দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারি। মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রিতে কিন্তু খুব ভাল ভাল বাণিজ্যিক ছবি হয়। কিন্তু হিন্দিগুলো আমার ভাল লাগে না।
প্রশ্ন: আর বাংলা সিনেমা?
কানি: খুব বেশি দেখা হয়নি, তাই মন্তব্য না করাই ভাল। সত্যজিৎ রায়ের ছবি অবশ্যই দেখেছি। তা ছাড়া মূলধারার বাইরে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবিও দেখেছি বটে। তবে বাংলা বাণিজ্যিক ছবি আমি দেখতে চাই। আমাদের সংস্কৃতিতে এত মিল যখন রয়েছে, নিশ্চয়ই আরও অনেক ভাল বাংলা ছবি দেখব ভবিষ্যতে। ঠিক যে ভাবে পরের বার কলকাতা এলে সুতির শাড়ি কিনব। এ বার সময় কম বলে সম্ভব হল না। কিন্তু এই যোগাযোগ জারি থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস।