আপনি কত বার প্রেমে পড়েছেন? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
হরে দরে হয়তো মাসে নিদেন পক্ষে পঁচিশ বার।
নেড়া এক বার যাক বা পঁচিশ বার, কিংবা লাখো বার, আপনি ক’বার যান বেলতলা? বার বার কি ধপাস শব্দ করেই পড়েন? না কি বিড়ালের রাস্তা কাটার মতো অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় হাজারগন্ডা যুক্তি? এমন কোনও সংখ্যা আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে কি, না কি মাপকাঠি আছে কোনও? প্রশ্ন কেবল একটিই— কেউ প্রেমে পড়েন ক’বার? থুড়ি, পাগলের মতো প্রেমে পড়েন ক’বার? এর কোনও উত্তর কি হয়? অনেকে সে উত্তরও খুঁজছেন।
আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিনসে ইনস্টিটিউট ১০ হাজার আমেরিকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে সমীক্ষা করেছে। হরে দরে সেখানে উত্তর এসেছে মাত্র দু’টি বার। কেউ সেখানে শূন্য বললেও কেউ আবার চারের বেশি বার সত্যিকারের প্রেমে পড়ার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু গড়ের হিসেব করে সেই প্রতিষ্ঠান দুই-এর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রেমের বাদশা শাহরুখ খানই যখন‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-তে‘প্রেম এক বার হয়’সংলাপ বলার পর দু’বার পাগলের মতো প্রেমে পড়েছেন, তখন এ সব সমীক্ষার প্রমাণের কার দরকার পড়ে? শাহরুখ যদি বার বার প্রেমে পড়তে পারেন, আপনি কেন পারেন না?তবে গবেষণা বলছে,বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেমে পড়ার সংখ্যা আরও কিছুটা বাড়তে পারে। অর্থাৎ, মানুষ তার জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুভূতির সঙ্গে প্রেমকে জুড়ে দিতে পারে,এবং কখনও কখনও সেই অনুভূতি সময়ের সঙ্গে বদলেও যেতে পারে।
শাহরুখ যদি বার বার প্রেমে পড়তে পারেন, আপনি কেন পারেন না? ছবি: সংগৃহীত।
তবে ৩০ বছর পেরোনোর আগেই নৃত্যশিল্পী অবন্তিকা ভৌমিকের কাছে এই সংখ্যাই কিন্তু ৬-৭ বার। গদগদ চোখে তিনি বললেন, ‘‘আমার তো প্রতি বারই মনে হয়, আমি পাগলের মতো প্রেমে পড়েছি। নতুন প্রেমে পড়ার পর কিন্তু আগেরগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না। সেই সময়ে সেটা পাগলকরাই ছিল কিন্তু। তবে বড্ড ভুল করে ফেলি বার বার। আমি তো মন থেকেই ভালবাসি। তারা আমায় কষ্ট দেয়। আমার বন্ধুরা বলে, এক বার অন্তত ঠিক মানুষের প্রেমে পড়।’’ কিন্তু সেই ঠিক মানুষের খোঁজেই তো রয়েছেন অবন্তিকা। নাগালে না পেলে তাঁরই বা কী দোষ? তিনি তো সেই মানুষটি, যিনি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করেন, আর চোখ খুলে দেখেন, আবারও নেড়ার মতো বেলতলায় পৌঁছে গিয়েছেন।
কেউ কেউ অবশ্য এই প্রশ্নেই ধন্দে পড়ে যান।‘‘প্রেমে পড়া বুঝলাম, ভাললাগাও বুঝলাম, কিন্তু পাগলের মতো প্রেমে পড়া কাকে বলে, সেটা বুঝবই বা কেমন করে?’’মনোবিদ আত্রেয়ী ভট্টাচার্য বলছেন,‘‘পাগলের মতো ভালবাসায় পাগলামিকে আমরা প্রেমের উচ্চতম শিখরে রাখি,কিন্তু সে ক্ষেত্রে‘অধিকারবোধ’কিন্তু চরম।’’কিন্তু সত্যিকারের প্রেম বলতে কী বোঝায়?মনোবিদের মতে, প্রেমের গতি বড়ই বিচিত্র। ভালবাসা ভরসার জায়গা,আবার বিশ্বাস,যৌন আবেগ, শারীরিক আকর্ষণও এর অঙ্গ। কাউকে ভালবাসার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি কিছু শারীরিক ও আবেগগত চাহিদা জন্মায়,নির্ভরতার চেয়েও বেশি যখন অধিকারবোধ তৈরি হয়,তখনই ভালবাসার মানুষটিকে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণের আধার বলে মনে হয়। মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায় এই প্রেমকে ডোপামাইন ক্ষরণের ফলাফল হিসেবে দেখেন। প্রেমে পড়লে মস্তিষ্ক যে হ্যাপি হরমোন নিঃসরণ করে,তা মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সার্কিটকে সক্রিয় করে তোলে। সে কারণেই বার বার প্রেমে পড়াটা অনেকটাই নেশার মতো হয়ে পড়তে পারে। মনোবিদ বলছেন,‘‘সাধারণত যাঁরা বার বার প্রেমে পড়েন, তাঁদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। প্রথমত,একা থাকলে তাঁরা হয়তো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তাই এঁরা সব সময় কোনও এক জন মানুষের সঙ্গে থেকেই স্বস্তি ও আরাম পান। তা ছাড়া,কেউ কেউ আবার হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সামনের মানুষযদি মুগ্ধ করার জন্য ভাল ভাল কথা বলেন,তাতেই আকর্ষিত হয়ে যান দ্রুত।’’
পাগলের মতো প্রেমে পড়া কাকে বলে? ছবি: সংগৃহীত
লাখোবার যায় যদি সে, যাওয়া তার ঠেকায় কিসে?
ভেবে তাই পাইনে দিশে নাই কি কিচ্ছু উপায় তার?
বিজ্ঞান বলছে, ঠেকানো যায়। মনোবিদেরা বলছেন, নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া দরকার। সম্পর্ক ভাঙার পর, আঘাত পাওয়ার পর নিজেকে সময় দিতে হবে। বুঝতে হবে কী চাই, না চাই। তার পর এগোতে হবে। যদি একা থাকতে না পেরে প্রেমে পড়েন, তা হলে সেটি এ রোগের ওষুধ নয়। আপনি যে মমতা, যে স্নেহ অন্যকে দেন, তা যদি নিজের দিকে ফিরিয়ে নেন, তা হলে আপনি আর নেড়ার বেলতলায় যাবেন না।
কিন্তু ডোপামাইন ক্ষরণের নেশায় বুঁদ হতেই যদি ভাল লাগে, তা হলে? তা হলে সম্বল হতে পারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতা, “ভালোবাসাকেই ভালবাসা দিয়ে যাবো”। অর্থাৎ বেলতলায় কী ঘটবে, তার ভয় না পেয়ে বার বার বেলতলার গন্তব্যে হাঁটা দিতে পারেন।
ঠিক যেমন, ৫২ বছরের শিক্ষক কুশল দত্ত বলছেন, ‘‘ভাল না বাসলে এ জীবনে আর কী-ই বা আছে? আমি কত বার প্রেমে পড়েছি, তা আর এখন মনে নেই। আঘাত পেয়েছি, কখনও আবার আঘাত দিয়েও ফেলেছি অচিরে। কিন্তু প্রেমে থেকেছি। প্রেমে পড়ার সেই সময়গুলোর মতো সুন্দর কিছু নেই। মনে হয়, উড়ে বেড়াচ্ছি। তখন গ্রীষ্মের দাবদাহও মিঠে লাগে, শীতের কামড়ও মধুর মনে হয়, আর বৃষ্টির কথা তো ছেড়েই দিচ্ছি।’’ তবে ছাত্রী ঋতিকা গুহ স্থির করেছেন, আর নয়, বেলতলার রাস্তা চিরতরে ভুলে যাবেন। কারণ ৩ বারের প্রতি বারই প্রথমে মনে হয়েছে, ‘‘এ তো ভালই’’। তার পর বলেছেন, ‘‘না, এই বারেরটা সত্যি’’। এর পরই সোজা ‘‘এমনটা করবে ভাবিনি’’ থেকে ‘‘ধুর, আমি কী বোকা’’-র স্তরে পৌঁছে গিয়েছেন। তবে তাঁর বয়স তো মাত্র ২৫ বছর। পথ যে এখনও অনেক বাকি! সর্বজ্ঞ কথক হয়তো ঋতিকার গল্প বলতে বলতে মুচকি হাসেন।
তাই সারকথা কেবল একটিই, আপনি কত বার পাগলের মতো প্রেমে পড়বেন, বা কোনটি আপনার আসল প্রেম হবে, তার উত্তর খুঁজতে শেষমেশ সেই সুকুমার রায়ই সম্বল—
এ কথাটা এদ্দিনেও পারে নিকো বুঝতে কেও,
লেখে নিকো পুস্তকেও, দিচ্ছে না কেউ জবাব তায়।