কৃত্রিম মেধা কি সত্যিই চাকরির বাজারে থাবা বসাচ্ছে? এই ভয়ই চেপে বসেছে বিশ্ব জুড়ে। চারদিকে চাকরি গেল গেল রব। অনেকেই মনে করছেন, চাকরির বাজারে ভবিষ্যতে ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। কৃত্রিম মেধার আগ্রাসী প্রসারের কারণেই বিভিন্ন সংস্থা মানবসম্পদের বোঝা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর হতে চাইছে। তেমন আশঙ্কার কথা উঠে আসছে বার বার।
আশঙ্কা ছড়িয়েছে, বিশ্ব জুড়ে অনেক কাজ কেড়ে নেবে এআই। এর প্রভাব পড়বে কম-বেশি সব দেশেই। কৃত্রিম মেধা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে বহু সংস্থাই কর্মীসঙ্কোচনের পথে হাঁটবে।
চাকরির বাজারে বিগত কয়েক বছর যাবৎ এ নিয়ে আশঙ্কা-উদ্বেগ চলছেই। তবে এ বার এক এআই বিশেষজ্ঞ যে উদ্বেগের কথা শোনালেন, তা এক কথায় ভয়ঙ্কর বলেই মনে করছেন অনেকে।
এআই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, কৃত্রিম মেধার দ্রুত অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই কর্মক্ষেত্রকে নতুন করে রূপ দিতে পারে। তাঁর দাবি, এআইয়ের জন্য ২০২৭ সাল থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের বাজার থেকে উধাও হয়ে যাবে ৯৯ শতাংশ চাকরি। কেবল ৫টি চাকরিই টিকে থাকতে পারে।
ওই এআই বিশেষজ্ঞের নাম রোমান ইয়াম্পোলস্কি। তিনি লাটভীয় বংশোদ্ভূত রোমান কম্পিউটার বিজ্ঞানী। লুইসভিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজও তিনি করেন। রোমান দাবি করেছেন, ২০২৭ সালের প্রথম দিকে আসতে পারে আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই, যার ফলে বিশ্ব জুড়ে কর্মসংস্থান কমতে পারে ব্যাপক হারে।
‘দ্য ডায়েরি অফ আ সিইও’ পডকাস্টে স্টিভেন বার্টলেটের সঙ্গে কথোপকথনের সময় ওই দাবি করেছেন রোমান। তিনি জানিয়েছেন, মানুষের চেয়ে প্রতিটি মেধা সংক্রান্ত কাজ আরও ভাল ভাবে করতে সক্ষম হবে এজিআই। রোমানের মতে, এর পরিণতিস্বরূপ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাজার থেকে ৯৯ শতাংশ চাকরি চলে যাবে। চাকুরিজীবীদের চাকরি খেয়ে সেই কাজ করবে এজিআই।
এআই নিরাপত্তা এবং ঝুঁকির উপর ১০০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন রোমান। তিনি দাবি করেছেন, কার্যত এমন কোনও পেশা নেই যা স্বয়ংক্রিয় ভাবে পরিচালিত হতে পারে না। রোমান এ-ও দাবি করেছেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে মানুষের কাজ সহজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল এআই। কিন্তু এখন তা স্বাধীন ভাবে কাজ করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, খুব শীঘ্রই বেকারত্ব গ্রাস করবে সারা বিশ্বকে।
রোমান উল্লেখ করেছেন, এজিআইয়ের প্রভাবে প্রথমেই কর্মসংস্থান বন্ধ হবে কম্পিউটার-ভিত্তিক চাকরি ক্ষেত্রে। তার পরে কোপ পড়বে সে সব ক্ষেত্রে যেখানে কায়িক শ্রম করতে হয়। কারণ, তত দিনে রোবটগুলি আরও উন্নত হবে এবং মানুষের মতো কাজ করতে সক্ষম হবে বলেই দাবি রোমানের।
পডকাস্টে রোমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে রোবটগুলি বেশির ভাগ শারীরিক কাজ করতে সক্ষম হতে পারে। চাকরির বাজারে এই দ্রুত পরিবর্তন বেকারত্বের মাত্রাকে এমন উচ্চতায় ঠেলে দিতে পারে, যা কখনওই কল্পনা করা যায়নি।
রোমান বলেছেন, ‘‘যেখানে ১০ শতাংশ বেকারত্ব উদ্বেগের, সেখানে কৃত্রিম মেধার কারণে ৯৯ শতাংশ চাকরি উধাও হতে পারে বাজার থেকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই বিদ্যমান প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরি এআই মডেলগুলির মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।’’
এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার সমাধান হিসাবে পুনঃপ্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন রোমান। কারণ তাঁর মতে, মানুষের পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব তা যদি এআই করে, তা হলে হয়তো আর কোনও বিকল্প পথ খোলা থাকবে না।
২০২৭ সালের মধ্যে এজিআই আসার বিষয়ে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী চাকরিবাজারের পরিস্থিতি এবং প্রধান এআই সংস্থাগুলির কর্তাদের বিবৃতির উপর ভিত্তি করে তৈরি বলেও স্পষ্ট করেছেন রোমান। এআই বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, এক বার যদি এজিআই বাজারে চলে আসে তা হলে তা অতি বুদ্ধিমান মানুষের থেকেও ভাল ভাবে কাজ করবে।
যদিও রোমানের বৃহত্তর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম মেধার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির ফলে চাকরির বাজারে খরা তৈরি হওয়া নিয়ে। তাঁর বিশ্বাস, মিডিয়া, কন্টেন্ট তৈরি এবং পডকাস্টিংয়ের মতো সৃজনশীল ক্ষেত্রগুলিতেও থাবা বসাবে এআই। কারণ, এই ক্ষেত্রগুলিতে কৃত্রিম মেধা দ্রুত কাজ করার পাশাপাশি নির্ভুল ভাবেও কাজ করবে। বিপুল পরিমাণে ডেটার সম্ভারও থাকবে এআইয়ের কাছে।
উদ্বেগজনক দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও সামান্য আশার কথাও শুনিয়েছেন রোমান। তিনি জানিয়েছেন, চাকরির বাজারে এআইয়ের কুপ্রভাব পড়লেও ৫টি চাকরি তার পরেও টিকে থাকবে।
রোমানের মতে এই পাঁচ চাকরিক্ষেত্রের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বিত্তশালীদের ব্যক্তিগত পরিষেবা। তাঁর মতে উচ্চবিত্ত এবং ধনী ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধার তুলনায় মানুষের উপরেই ভরসা রাখবেন বেশি। ফলে বিত্তশালীদের হিসাবরক্ষক, ব্যক্তিগত সহকারীর মতো চাকরিগুলিতে থাবা বসাতে পারবে না এআই।
যে সব চাকরিতে আবেগ এবং কাউকে দেখভাল বা যত্ন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, বিশেষ করে যেখানে সহানুভূতি, বিশ্বাস এবং মানবিক সংযোগ অপরিহার্য, সেই চাকরিগুলি এআইয়ের রমরমার মধ্যেও টিকে থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে থেরাপি বা কাউন্সেলিং সংক্রান্ত চাকরি।
এআইয়ের তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু চাকরি টিকে থাকবে বলে মত রোমানের। তাঁর মতে, কৃত্রিম মেধাগুলি পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করার জন্য বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হতে পারে ভবিষ্যতে। এআই নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোনও সুরক্ষা, নীতিগত এবং কার্যক্ষমতা সংক্রান্ত উদ্বেগ না তৈরি হয়, তার জন্যই ওই চাকরিগুলির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এআই বোঝেন এবং তা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা এবং মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন, এমন মানুষদেরও চাকরির চাহিদা অদূর ভবিষ্যতে থাকবে বলে মনে করছেন রোমান।
রোমানের দাবি, প্রাথমিক বছরগুলিতে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এআই সিস্টেম পরিচালনার জন্যও লোকের প্রয়োজন হবে। তবে কৃত্রিম মেধা আরও উন্নত এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাকরিগুলির চাহিদা কমে যাবে।
রোমান যুক্তি গিয়েছেন, এআইয়ের কারণে চাকরির বাজারে মন্দা তৈরি হলে বিভিন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে। আর সেই পরিবর্তনের জন্য অনেকেই প্রস্তুত নন। তিনি এ-ও সতর্ক করেছেন, এআইয়ের জন্য যদি কর্মসংস্থানে কুপ্রভাব পড়ে তা হলে যুবসমাজের ব্যাপক ক্ষতি হবে। যদি আগে যে আভাস দেওয়া হয়েছে সেই গতিতে চাকরি যায়, তা হলে খুব কম সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারাবেন।
শুধু রোমান নন, এআই নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেদের কথা শুনিয়েছেন মাইক্রোসফ্টের এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেমানও। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, খুব শীঘ্রই বেশির ভাগ ‘হোয়াইট কলার’ চাকরি কেড়ে নিতে পারে কৃত্রিম মেধা। আর তা হতে পারে বছরখানেকের মধ্যেই। শুধু কোডাররা নন, আইনজীবী এবং হিসাবরক্ষকের মতো পেশাদাররাও তাঁদের কাজ এআইয়ের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় ভাবে করতে পারবেন। ফলে এই সব ক্ষেত্রে কমবে পেশাদারদের চাহিদা। তেমনটাই দাবি করেছেন মুস্তাফা।