legal rights of insects in Peru

হুল নেই, মধু যেন ‘অলৌকিক তরল’! ডাইনোসরের আমলের অদ্ভুত পতঙ্গের জুটল বিরল আইনি অধিকার

হুলবিহীন মৌমাছি। নাম শুনেই বোঝা যায়, এই প্রজাতির মৌমাছির শরীরে কোনও হুল থাকে না অথবা সেই হুলের দংশনে ব্যথার অনুভূতি হয় না। সাধারণত গোটা বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে প্রজাতিগুলির দেখা মেলে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪২
Share:
০১ ১৯

মৌমাছি, অথচ হুলের অস্তিত্ব নেই শরীরে। মধুর স্বাদও অন্যান্য মৌমাছির থেকে স্বতন্ত্র। সেই মধুকে ‘অলৌকিক তরল’ বলে থাকেন পেরুর বাসিন্দারা। সেই মধু সোনার মতোই দামি। পেরুর আমাজ়নের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বসবাসকারী এই স্থানীয় মৌমাছিরা দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত ছিল।

০২ ১৯

দেশের এই সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখতে অনন্য এক পদক্ষেপ করেছে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ। বিশ্বের প্রথম পতঙ্গ হিসাবে মানুষের মতো আইনি অধিকার লাভ করেছে এই মৌমাছি। পেরুর দু’টি পুরসভা ইতিমধ্যেই হুলবিহীন মৌমাছিদের সমস্ত প্রজাতিকে এই অধিকারের আওতায় এনেছে।

Advertisement
০৩ ১৯

এই অভূতপূর্ব পদক্ষেপটি করা হয়েছে আমাজ়ন বৃষ্টি-অরণ্যের বিশাল এলাকা জুড়ে স্থানীয় প্রজাতিদের আনুষ্ঠানিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। পোকামাকড়ের জাতিদের সংরক্ষণের জন্য একটি নতুন আইনি নজির স্থাপন করেছে ছোট্ট দেশটি। পুরসভার আইনে মৌমাছিদের একটি বিশেষ সত্তা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

০৪ ১৯

ন’টি দেশ জুড়ে বিস্তৃত ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলে পরিচিত আমাজ়ন বৃষ্টি-অরণ্য। আমাজ়ন নদীর দৈর্ঘ্য ৬,৪০০ কিলোমিটার। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ৪০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এই নদী। যাত্রাপথে ছুঁয়ে গিয়েছে ব্রাজ়িল, পেরু, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, ভেনেজ়ুয়েলা এবং কলম্বিয়াকে।

০৫ ১৯

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজ়ন নদের পাশে প্রায় ৫৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে উঠেছে সুবিশাল বৃষ্টি-অরণ্য। পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেনের আমদানি হয় ওই বৃষ্টি-অরণ্য থেকে।

০৬ ১৯

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী এবং তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অরণ্যে এমন কিছু প্রজাতির প্রাণী এবং উদ্ভিদ রয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। নানা নাম না জানা উপজাতির বাসস্থান আমাজ়নের জঙ্গল। এখানে রয়েছে ১৬ হাজার প্রজাতির গাছগাছালি।

০৭ ১৯

হুলবিহীন মৌমাছি। নাম শুনেই বোঝা যায়, এই প্রজাতির মৌমাছির শরীরে কোনও হুল থাকে না অথবা সেই হুলের দংশনে ব্যথার অনুভূতি হয় না। সাধারণত গোটা বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে প্রজাতিগুলির দেখা মেলে। তবে ৫০০টি পরিচিত প্রজাতির মধ্যে প্রায় অর্ধেকই আমাজ়নের বৃষ্টি-অরণ্যে বাস করে। শুধুমাত্র পেরুতেই ১৭০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে।

০৮ ১৯

আমাজ়নের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মৌমাছির চাষ করে আসছে। গবেষকদের মতে, আমাজ়নের ৮০ শতাংশেরও বেশি উদ্ভিদের পরাগমিলনের কৃতিত্ব রয়েছে এই প্রজাতির মৌমাছির কাঁধে। তার মধ্যে অন্যতম হল কোকো, কফি এবং অ্যাভোকাডো। ডাইনোসরদের পৃথিবীতে বিচরণের সময় থেকে এই মৌমাছিরা প্রায় ৮ কোটি বছর ধরে বিশ্ব জুড়ে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলকে টিকিয়ে রেখেছে!

০৯ ১৯

সোনালি, গাঢ় বাদামি, ডোরাকাটা রঙের মৌমাছিগুলির দেহের আকার মুসুর ডালের মতো, আবার একটি আঙুরের মাপের হতে পারে। এদের চোখ কালো, ধূসর, এমনকি নীলাভ-সবুজ হয়ে থাকে। হুলবিহীন মৌমাছিদের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল তাদের উৎপাদিত মধু।

১০ ১৯

প্রাচীন কাল থেকে বিশ্ব জুড়ে মধুকে প্রাকৃতিক ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ওষুধ হিসাবে মধু ব্যবহারের এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। হুলবিহীন মৌমাছির মধুকে একাধারে মলম, নেশার দ্রব্য, এমনকি বিষ হিসাবে ব্যবহারের নজির রয়েছে আমাজ়ন এলাকার উপজাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে।

১১ ১৯

একাধিক সমসাময়িক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হুলবিহীন মৌমাছির মধুতে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল’, প্রদাহ-বিরোধী এবং ক্ষত নিরাময়ের উপাদান রয়েছে। এই মধুর স্বাদও ভিন্ন, কিছুটা টক-মিষ্টি। এটি আঠালো নয় এবং এতে প্রচুর পরিমাণে জলীয় উপাদান রয়েছে।

১২ ১৯

দংশনহীন মৌমাছিরা এমন রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে মধু তৈরি করে যা জীবাণু এবং ছত্রাকের বৃদ্ধি রোধ করে। আমাজ়নের উদ্ভিদকুল বৈচিত্রে ভরপুর। মৌমাছিরা তাদের মধু এবং মোমের সঙ্গে অবিশ্বাস্য ধরনের উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক মিশ্রিত করে। এগুলির যে ঔষধি গুণ থাকবেই, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

১৩ ১৯

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের জনজাতি, বিশেষ করে আদিবাসী সমাজে উচ্চ শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, ত্বকের রোগ, পেটের জটিল রোগের সমস্যা, ডায়াবিটিস, এমনকি ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুলবিহীন মৌমাছির মধু এবং মোম ব্যবহারের বহুল প্রচলন রয়েছে।

১৪ ১৯

আদিবাসী আশানিঙ্কা এবং কুকামা-কুকামিরিয়া জনগণের সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ হল এই হুলবিহীন মৌমাছি। আশানিঙ্কা কমিউনাল রিজ়ার্ভের ইকোআশানিঙ্কা সংস্থাটির সভাপতি অপু সিজার রামোস সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, হুলবিহীন মৌমাছির সঙ্গে আদিবাসীদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের ঐতিহ্য সম্পৃক্ত হয়ে রয়েছে।

১৫ ১৯

জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং কীটনাশকের মারাত্মক সংমিশ্রণের মুখোমুখি হচ্ছে এই হুলবিহীন মৌমাছিরা। সৃষ্টির সময় থেকেই বৃষ্টি-অরণ্যে এরা মানবজাতির সঙ্গে সহাবস্থান বজায় রেখে চলেছে। আদিবাসীদের সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গে হুলবিহীন মৌমাছিদের সুস্থতা ও টিকে থাকা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

১৬ ১৯

আমাজ়ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হুলবিহীন মৌমাছিরা মধু তৈরির উপাদান সংগ্রহের জন্য ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। আমাজ়ন রিসার্চ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা ভাস্কেজ এস্পিনোজা জানিয়েছেন, এই মৌমাছিগুলিকে খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে জঙ্গলের ভিতরে হাঁটার ৩০ মিনিটের মধ্যেই তাদের দেখা পাওয়া যেত। আর এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজার পরও দেখা মেলা ভার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৭ ১৯

কয়েক দশক ধরে পেরুর আইন কেবল ইউরোপীয় মৌমাছিকেই স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালে পেরু সরকার একটি আইন পাশ করে। সেখানে স্থানীয় অধিবাসী বলে স্বীকৃতি পায় হুলবিহীন মৌমাছির প্রজাতিগুলি। সেই আইনে বলা হয়েছিল, স্থানীয় প্রজাতিগুলিকে রক্ষা করতে হবে। তার পরই একটি অধ্যাদেশ জারি করে মৌমাছিদের অস্তিত্ব সুরক্ষিত করতে তৎপর হয় স্থানীয় প্রশাসন।

১৮ ১৯

স্থানীয় প্রশাসনের মতে, অধ্যাদেশটি ২০২৪ সালের আইনকে আরও শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে হুলবিহীন মৌমাছির সহজাত অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই অধিকারগুলির মধ্যে রয়েছে তাদের অস্তিত্বের অধিকার, সুস্থ জনসংখ্যা বজায় রাখার অধিকার, তাদের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং দূষণমুক্ত পরিবেশে বসবাসের অধিকার ইত্যাদি।

১৯ ১৯

ইতিমধ্যেই সাতিপো এবং নাউতা এই দু’টি পুরসভা এই আইনটি চালু করেছে। এটিকে জাতীয় আইন হিসাবে গোটা দেশে চালু করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আশানিঙ্কা সম্প্রদায়ের সদস্য থেকে শুরু করে পরিবেশবিদ ও প্রাণী সংরক্ষণকারীরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement