১৬৭ কিমি লম্বা এবং ৩৩ কিমি চওড়া একটা সঙ্কীর্ণ জলপথ। নাম হরমুজ় প্রণালী। এটি অবরোধ করে পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ের যাবতীয় হিসাব উল্টে দিয়েছে ইরান। শুধু তা-ই নয়, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘সুপার পাওয়ার’কেও নাকানি-চোবানি খাওয়াচ্ছে তেহরান। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার মলাক্কা প্রণালীতে নজর দিল ওয়াশিংটন। সেই লক্ষ্যে বিশ্বের সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরেছে আমেরিকা।
চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল জাকার্তা-ওয়াশিংটন সামরিক সমঝোতার বিষয়টি সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে জানান মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। এর পোশাকি নাম ‘বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি’ চুক্তি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর জেরে মলাক্কা প্রণালীতে বাড়তি নজরদারির অধিকার পাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজ। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের এই সঙ্কীর্ণ জলপথটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পণ্য চলাচলের ‘লাইফলাইন’ বললে অত্যুক্তি হবে না।
এক্স হ্যান্ডলে করা পোস্টে হেগসেথ জানিয়েছেন, ‘‘ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি চুক্তি করতে পেরে আমরা অত্যন্ত গর্বিত।’’ সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় সই করতে যুক্তরাষ্ট্র সফর সেরেছেন জাকার্তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী শাফরি শামসু্দ্দিন। তাঁকে আমেরিকার যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনে স্বাগত জানান স্বয়ং হেগসেথ। মূল চুক্তিটি হয়ে গেলেও এখনও বেশ কিছু ব্যাপারে দু’তরফে আলোচনা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মলাক্কা প্রণালীতে নজরদারির জন্য ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় অবাধ প্রবেশাধিকার চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এ ব্যাপারে এখনও সবুজ সঙ্কেত দেয়নি জাকার্তা। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে দু’তরফে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে দ্বীপরাষ্ট্র। অন্য দিকে যৌথ বিবৃতিতে চুক্তিবদ্ধ দু’টি দেশ জানিয়েছে, তিনটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে ‘বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি’ সমঝোতা হয়েছে। সেগুলি হল, সামরিক আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত দক্ষতা ও অভিযানে সহযোগিতা।
যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়া আরও জানিয়েছে, দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্ট চুক্তিটি একটি পথনির্দেশিকা হিসাবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জাকার্তা ও ওয়াশিংটন বদ্ধপরিকর। সূত্রের খবর, আগামী দিনে মলাক্কা প্রণালীতে নজরদারিতে দ্বীপরাষ্ট্রের সাহায্যে বিশেষ একটি যৌথ বাহিনী গড়ে তুলবে আমেরিকা। এদের প্রশিক্ষণের ভারও মার্কিন ফৌজের কাঁধে বর্তাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মলাক্কা প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, অবস্থানগত দিক থেকে সঙ্কীর্ণ জলপথটির কৌশলগতগত গুরুত্ব অপরিসীম। এর উত্তরে আছে মালয় উপদ্বীপ। দক্ষিণে সাবেক সুমাত্রা বা ইন্দোনেশিয়া। এই দুইয়ের মাঝ দিয়ে চলা সরু একফালি সামুদ্রিক রাস্তাটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত রুট হিসাবে পরিচিত। বিশ্ব অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশ পণ্যের আমদানি-রফতানি হয় এই পথে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আন্দামান সাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরকে সংযুক্ত করেছে মলাক্কা প্রণালী। গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের (পিপ্লস রিপাবলিক অফ চায়না) জন্য এই রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মলাক্কা দিয়ে বিশ্বের ৩৫ শতাংশ খনিজ তেল সরবরাহ হয়ে থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক পথে সিংহভাগ জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্য ঘরের মাটিতে আনে বেজিং। ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও সংশ্লিষ্ট প্রণালীর কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার হাতে।
গত বছরের (২০২৫ সাল) ২ থেকে ৪ সেপ্টেম্বর, তিন দিনের ভারত সফরে আসেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আলাদা করে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারেন তিনি। সূত্রের খবর, সেখানেই ওঠে মলাক্কা প্রণালীতে টহলদারির প্রসঙ্গ। এ ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ রয়েছে নয়াদিল্লি। পরে যৌথ বিবৃতিতে এ ব্যাপারে ভারতকে সমর্থন করার কথা প্রকাশ্যেই জানিয়ে দেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স। একে মোদী সরকারের বড় কূটনৈতিক জয় হিসাবেই দেখেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আগামী দিনে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহায়তায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে ভারত ও সিঙ্গাপুর। এর মধ্যে থাকবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কৃত্রিম মেধা (পড়ুন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই), স্বয়ংক্রিয় সামরিক সরঞ্জাম এবং মানববিহীন জলযান। পাশাপাশি, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ডুবোজাহাজ উদ্ধারেও একযোগে কাজ করতে দেখা যাবে এই দুই দেশকে।
এই যৌথ বিবৃতির মধ্যেই মলাক্কা প্রণালী নিয়ে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘ওই এলাকায় নয়াদিল্লির টহলদারি সংক্রান্ত আগ্রহকে আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করছি। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক সহযোগিতার সংজ্ঞা অনেকটাই পাল্টে যাবে।’’ যদিও কবে থেকে মলাক্কা প্রণালীতে এ দেশের জলযোদ্ধারা রণতরী নিয়ে ঢুকতে পারবেন, তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট হয়নি।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক রাস্তা মলাক্কা প্রণালীতে জলদস্যু, সন্ত্রাসবাদ এবং মাদক, হাতিয়ার ও মানবপাচার বন্ধ করতে ২০০৪ সালে চুক্তি করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর। পরে তাতে যোগ দেয় তাইল্যান্ড। ফলে অচিরেই গঠিত হয় ‘মলাক্কা প্রণালী টহলদারি’ (মলাক্কা স্ট্রেট পেট্রল বা এমএসপি) নামের একটি ব্যবস্থা। বিশ্লেষকদের দাবি, সিঙ্গাপুরের সহযোগিতায় এর অংশ হয়ে কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওই এলাকায় পায়ের তলার জমি শক্তি করতে চাইছে ভারত।
বর্তমানে তিনটি স্তরে কাজ করছে ‘মলাক্কা প্রণালী টহলদারি’ ব্যবস্থা। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত যৌথ নৌ এবং বিমানবাহিনীর পাহারা। এ ছাড়া ওই এলাকার চারটি দেশ সব সময় নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে থাকে। ২০০০ সালের গোড়ায় মলাক্কা প্রণালীতে জলদস্যুদের উৎপাত কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু গত দু’দশকে সেটা অনেকটাই নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে এই যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
মলাক্কা প্রণালীতে ভারতীয় নৌসেনা টহলদারি শুরু করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাটির বুনন যে কয়েক গুণ শক্তিশালী হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে নয়াদিল্লির এতে ঢুকতে চাওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এ দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ পণ্যের আমদানি-রফতানিতে ব্যবহার হয় ওই রাস্তা।
দ্বিতীয়ত, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চিনের সামুদ্রিক বাণিজ্যের একমাত্র রাস্তা হল মলাক্কা প্রণালী। যে কারণে ওই এলাকা বেজিঙের জন্য খুবই সংবেদনশীল। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থেকে মলাক্কা প্রণালীর দূরত্ব মেরেকেটে ৬০০ কিলোমিটার। ফলে এক বার সেখানে ঢুকতে পারলে সংঘাতের সময় ড্রাগনের জন্য ওই রাস্তা সহজেই বন্ধ করতে পারবে এ দেশের নৌবাহিনী। এতে ভেঙে পড়তে পারে মান্দারিনভাষীদের অর্থনীতি।
২০২৫ সালের গোড়ার দিকে বেশ কয়েক বার চিনা গুপ্তচর জাহাজকে ভারতের পূর্ব উপকূলে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছে। এ দেশের ‘বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা’র (এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জ়োন বা ইইজ়েড) খুব কাছে চলে আসে তারা। এ ছাড়া বেজিঙের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ নৌসেনার বিরুদ্ধে রয়েছে ভারত মহাসাগর এবং আন্দামান-নিকোবর সংলগ্ন সমুদ্রের মানচিত্র তৈরি করার অভিযোগ। এগুলিকে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসাবেই দেখেছে নয়াদিল্লি।
বিশ্লেষকদের দাবি, ঠিক সেই কারণেই পূর্ব উপকূলের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ‘মলাক্কা প্রণালী টহলদারি’ গোষ্ঠীতে আনুষ্ঠানিক ভাবে অন্তর্ভুক্তি চাইছে ভারত। কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের যুক্তি, এতে এক দিকে যেমন নতুন করে প্রাকৃতিক সম্পদের হদিস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, অন্য দিকে তেমনই সহজে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য হাতে পাবে নৌসেনা। পাশাপাশি, এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির সুযোগ পাবে নয়াদিল্লি।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নিজের অবস্থান মজবুত করতে ‘পুবের জন্য কিছু করো’ (পড়ুন অ্যাক্ট ইস্ট) নীতি গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে নয়াদিল্লির বিদেশনীতির অন্যতম অংশ ছিল ‘পূর্ব দিকে তাকাও’ (পড়ুন লুক ইস্ট)। মলাক্কা প্রণালী টহলদারিতে ভারতের অংশ হতে চাওয়া এগুলিকেই প্রতিফলিত করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত বছর থেকে মলাক্কায় নয়াদিল্লির পা রাখার চেষ্টার মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরে ফেলল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে আগামী দিনে ওই সঙ্কীর্ণ জলপথে মার্কিন এবং ভারতীয় ফৌজকে একসঙ্গে মহড়া দিতে দেখা গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। সাবেক সুমাত্রার সঙ্গে এ দেশের সম্পর্ক বেশ ভাল। ইতিমধ্যেই ‘আগ্রাসী’ চিনের মোকাবিলায় ভারতের সঙ্গে বিশ্বের দ্রুততম ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের চুক্তি সেরেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওই দ্বীপরাষ্ট্র।