অপরিশোধিত তেলের পর ভারত যে বস্তুটি সবচেয়ে বেশি আমদানি করে সেটি হল কাঞ্চন ধাতু। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় দেশজ চাহিদা মেটানোর জন্য ভারতকে আমদানির উপরই নির্ভর করতে হয়। কারণ ভারতে যে পরিমাণ সোনা উৎপাদন করা হয় তা চাহিদার তুলনায় যৎসামান্য। মাত্র দুই থেকে তিন টন সোনাতেই উৎপাদন সীমাবদ্ধ। তাই প্রায় ৯০ শতাংশ সোনার চাহিদা পূরণ করতে আমদানি ছাড়া কোনও গতি নেই ভারতের।
পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এক দিকে যেমন তেল ও সারের দাম রকেটগতিতে বাড়ছে তেমনই বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এই অবস্থায় হলুদ ধাতু কিনতে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাতেই রাশ টানতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার।
প্রতি বছর ৭০০ থেকে ৮০০ টন সোনার চাহিদা থাকে। পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিবাহ, উৎসব, বিনিয়োগ এবং সঞ্চয়ের মতো ক্ষেত্রগুলিতে প্রবল চাহিদার কারণে পৃথিবীতে সোনা কেনার ক্ষেত্রে ভারত অগ্রগণ্য। সোনা সঞ্চয়ের নিরিখে বিশ্বের প্রথম পাঁচ দেশকে মেলালেও কম পড়বে। ভারতীয় পরিবারগুলির হাতে যে পরিমাণ সোনা মজুত রয়েছে তার নজির বোধহয় বিশ্বের আর কোথাও নেই।
‘ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল’-এর পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে যত সোনা রয়েছে, তার ১১ শতাংশই ভারতীয় পরিবারের মহিলাদের নিজস্ব সম্পদ। ভারতীয় মহিলা বা পরিবারগুলির কাছে যত সোনা রয়েছে তার মোট পরিমাণ ২৫ হাজার টন! ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, বর্তমানে ভারতীয় পরিবারগুলির কাছে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩৪,৬০০ টন সোনা জমা রয়েছে, যার বাজারমূল্য ভারতের মোট জিডিপির প্রায় সমান!
ভারত বিদেশে যা যা পণ্য আমদানি করে, তার ৯ শতাংশই হল সোনা। বিদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি করা হয় অপরিশোধিত তেল। তার পরেই রয়েছে সোনা। বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটাতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে হয়।
যুগের পর যুগ ধরে সোনার গয়না পরার চল ভারতে। বিশ্ববাজারে সোনার ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কারণে তা জমানোর প্রবণতা বেশ কয়েক দশক ধরে বেড়েই চলেছে। নিরাপদ সম্পদ হিসাবে হলুদ ধাতুতে বিনিয়োগেই আস্থা রাখছে আমজনতা। যদিও সেই সোনা ব্যাঙ্কের ভল্টে বা আলমারিতে বন্ধ রাখতেই ভালবাসেন অধিকাংশ ভারতীয়।
আমজনতার হাতে যে পরিমাণ সোনা জমা রয়েছে তার অর্থমূল্য প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকা। গত ২৫ বছরে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ ভারতে এসেছে তার তিন গুণ অর্থ জমা রয়েছে দেশের অভ্যন্তরেই। অর্থনীতিতে যখন টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হবে তখন দেশের জনগণের হাতে থাকা সোনাকেই কাজে লাগানো সম্ভব। সেই অস্থির পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে জমিয়ে রাখা সোনার হাতেই।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক হলুদ ধাতু আমদানির মাত্রা বৃদ্ধি করেছিল রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই। আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডারের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে আরবিআই একাই ৭৭ টন সোনা কিনেছে, যা বাকি ৭টি দেশের তুলনায় বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা আঁচ করে ডলার ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল কমিয়ে সোনা জমানোর পথে হেঁটেছে ভারত। সপ্তম স্থানে রয়েছে এশিয়ার এই দেশ। শীর্ষ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ভারতে সোনা মজুত ছিল ৮৭৯.৯৮ মেট্রিক টন।
ভারতে মূলত অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত (বিয়ের মরসুম এবং দীপাবলি/ধনতেরাস মতো উৎসবের সময়) সোনার চাহিদা এবং আমদানি সবচেয়ে বেশি থাকে। ভারত সবচেয়ে বেশি সোনা আমদানি করে সুইৎজ়ারল্যান্ড থেকে। প্রায় ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোনা আসে এ দেশে।
২০২২-২৩ সালের অর্থবর্ষে প্রায় ৬৭৮.৩০ টন সোনা আমদানি করে ভারত। ৩৫০০ কোটি ডলারের সোনা। ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ৭৯৫.২০ টন সোনা আমদানি করতে হয়েছিল, গত চার বছরে যা সর্বোচ্চ। প্রায় ৪৬০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছিল ভারতের।
২০২৪-২৫ সালে ৫৮০০ কোটি ডলার দিয়ে ৭৫৭.০৯ টন সোনা কেনে ভারত। ওই বছরের থেকে গত বছরে সোনা আমদানি বেড়েছিল ২৪ শতাংশ। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে ভারত ৭২০০ কোটি ডলারের সোনা আমদানি করেছে। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা। গত অর্থবর্ষে ৭২১.০৩ টন সোনা আমদানি করে ভারত।
২০২৩ সালে, মূল্যের ভিত্তিতে ভারত বিশ্বব্যাপী পঞ্চম বৃহত্তম সোনা আমদানিকারক দেশ হিসাবে স্থান পায়। বৈশ্বিক স্বর্ণ আমদানির ন’শতাংশেরও বেশি সোনা আমদানি একাই করেছিল ভারত। ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী খনি থেকে সোনা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩,১০০ মেট্রিক টন। উৎপাদনের দিক থেকে ভারত ২০২৩ অর্থবর্ষে প্রায় ৭৮০ কেজি সোনা উৎপাদন করেছিল। ভারতের অভ্যন্তরীণ স্বর্ণ উৎপাদন তুলনামূলক ভাবে কম হওয়ায় চাহিদা মেটাতে দেশটিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হলুদ ধাতু আমদানি করতে হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিদেশ থেকে প্রায় ১০০ টন সোনা আমদানি করেছিল ভারত। ফেব্রুয়ারি মাসে তা কমে হয়েছে ৬৫-৬৬ টন। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকেই ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সংঘাত শুরু হয়েছে। তার ফলে সোনা আমদানিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ভাটা পড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী মার্চ মাসে মাত্র ২০ থেকে ২২ টন সোনা আমদানি হয়েছে। এপ্রিলে ভারত সোনা আমদানি করেছে ১৫ টন। কোভিড অতিমারির সময় ছাড়া গত ৩০ বছরে ভারতের সোনা আমদানি এতটা কমেনি।
সোনাকে সব সময়ই নিরাপদ বিনিয়োগ বলে ধরা হয়। সোনা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের মুদ্রার দর নিয়ন্ত্রণেও সোনার ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতি অস্থির হওয়ার কারণে হলুদ ধাতুর দাম রকেটের গতিতে চড়তে শুরু করেছে। বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে।
সেই খরচে লাগাম পরাতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্র। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে তেলের দাম বেড়েছে। বেড়েছে আমদানির খরচও। আমদানি-রফতানি ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোনা আমদানির খরচও বেড়েছে। তার ফলে চাপ পড়ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে। এই আবহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে আপাতত এক বছর অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনায় রাশ টানতে অনুরোধ জানিয়েছেন।