প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রের তেল শোধনাগারে ড্রোনহামলা। কিংবা মার্কিন বোমারু বিমানের বহর গুঁড়িয়ে দিতে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দ্বীপকে নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে শিক্ষা দিতে আদৌ কি এই সমস্ত আক্রমণ শানিয়েছে ইরানি ফৌজ, না কি এগুলির নেপথ্যে আছে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদের কোনও গভীর ষড়যন্ত্র? পশ্চিম এশিয়ার লড়াই চতুর্থ সপ্তাহে পা দেওয়া ইস্তক সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তীব্র হচ্ছে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের জল্পনা।
সৌদি আরব থেকে দিয়েগো গার্সিয়া কিংবা বাহরিন। সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশ এবং ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপে হামলার প্রশ্নে মুখ খোলেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই। একটি বিবৃতিতে ওই ঘটনাগুলিকে ইজ়রায়েলি ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন বলে চিহ্নিত করেছেন তিনি। ইরানি বিদেশ মন্ত্রকের দাবি, লড়াইয়ে পরাজয় নিশ্চিত বুঝে দল ভারী করতে চক্রান্তের জাল বিছোচ্ছে মোসাদ। মিথ্যা অভিযানের মাধ্যমে আরও কিছু দেশকে আরবের রণাঙ্গনে টেনে আনতে চাইছে তারা।
বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই এর বহুল ব্যবহার করে আসছেন দুঁদে সেনা অফিসারেরা। সংঘাত পরিস্থিতিতে অনেক সময় নিজেদের ছাউনি, সরকারি ভবন বা কোনও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের উপর আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে থাকেন তাঁরা। পরে গোটা ঘটনার দায়ভার শত্রুর উপর চাপানোর পাশাপাশি এই নিয়ে চলে দেদার মিথ্যা প্রচার। এতে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে দেশের আমজনতা। পাশাপাশি আক্রান্ত রাষ্ট্রের থেকেও মেলে সাহায্য।
ফৌজি পরিভাষায় এই ধরনের অভিযানগুলিকেই বলে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন। ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে এর গাদা গাদা অভিযোগ তুলেছে ইরান। উদাহরণ হিসাবে সৌদি আরবের রাস তানুরা খনিজ তেল শোধনাগার, রাজধানী রিয়াধের মার্কিন দূতাবাস-সহ পাঁচটি সরকারি ভবন এবং ওমানের দুকম বন্দরের দু’টি জায়গায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার কথা বলা যেতে পারে। এগুলিকে ‘মিথ্যা অভিযান’ বলে উল্লেখ করে তেল আভিভের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের দিকে আঙুল তুলেছে তেহরান।
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে পশ্চিম এশিয়ার গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক পারস্যের বিদেশ মন্ত্রকের এক পদস্থ কর্তা। তাঁর কথায়, ‘‘প্রতিবেশী আরব দেশগুলিতে হওয়া বেশ কিছু হামলা আমাদের বাহিনী করেইনি। তবে সেগুলি হয়তো ইরানের ভূখণ্ড থেকেই হয়েছে। আর অবশ্যই তাতে জড়িতে আছে মোসাদ। বর্তমানে তাঁদের ড্রোন লুকিয়ে রাখার গোপন আড্ডাগুলির খোঁজ চালাচ্ছে তেহরানের গোয়েন্দা দফতর।’’
চলতি বছরের ৪ মার্চ মাঝ-আকাশে একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস করে তুরস্ক। এর নেপথ্যেও ইজ়রায়েলের ‘ভূত’ দেখছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর সদস্যপদ রয়েছে আঙ্কারার। তেহরানের যুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে তুর্কি ফৌজকে পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে নামানোর পরিকল্পনা ছিল মোসাদের। অভিযোগ, তেহরান ও আঙ্কারার ‘বন্ধুত্বে’ চিড় ধরাতেও চেয়েছে তেল আভিভ।
সামরিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ইজ়রায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন চালাচ্ছে আমেরিকাও। গত ৯ মার্চ বাহরিনের একটি আবাসিক এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একে তেহরানের ড্রোনহামলা বলে বিবৃতি দেয় পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’। যদিও পরে জানা যায় সেখানে আছড়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থার ইন্টারসেন্টার রকেট।
এ ছাড়া গত ৫ মার্চ আজ়ারবাইজানের রাজধানী বাকুর বিমানবন্দরে ড্রোনহামলায় আহত হন চার জন। ঘটনার পর ইরানকে দায়ী করে কড়া প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে তৈরি হওয়া দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গেই একে ইহুদিদের ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন হিসাবে চিহ্নিত করে তেহরান, যা নিয়ে সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামে বিবৃতি দেন পারস্যের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
সংশ্লিষ্ট তালিকার একেবারে শেষে আসবে ভারত মহাসাগরের প্রবাল দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ার প্রসঙ্গ। সেখানকার ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেল্থ শ্রেণির ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমান মোতায়েন রেখেছে আমেরিকা। গত ২১ মার্চ সেখানে ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তেহরান থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার।
মার্কিন প্রশাসনের দুই পদস্থ কর্তাকে উদ্ধৃত করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া দু’টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি মাঝপথে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়টিকে থামাতে এসএম-৩ নামের ইন্টারসেন্টর রকেট চালায় ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি রণতরী। যদিও সরকারি ভাবে এই ইস্যুতে কোনও বিবৃতি দেয়নি ওয়াশিংটনের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
দিয়েগো গার্সিয়ায় ‘ইরানি হামলা’র চেষ্টাকে কেন্দ্র করে দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় হইচই। কারণ, কিছু দিন আগেই একটি সাক্ষাৎকারে তেহরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘‘আমাদের কাছে সর্বাধিক ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আছে।’’ তা হলে ৪,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে কী ভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ? হিসাবের গরমিলের নেপথ্যে আছে কোনও জটিল অঙ্ক?
ইরানের দাবি, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দিয়েগো গার্সিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ‘নাটক’ সাজায় ইজ়রায়েল। কারণ, যুদ্ধের গোড়ার দিকে সেখানকার ঘাঁটি মার্কিন ফৌজকে ব্যবহার করতে দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার। পরে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তাতে রাজি হন তিনি। এককথায় ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের মাধ্যমে এই লড়াইয়ে ইংরেজদের অকুণ্ঠ সমর্থন ইহুদিরা পেতে চেয়েছে বলেই মনে করে তেহরান।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইতিহাসের পাতায় এ-হেন ‘মিথ্যা অভিযানের’ কম নজির নেই। সম্রাট নিরোর শাসনকালে (পড়ুন ৬৪ সালে) ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যায় রোম। লোককাহিনি অনুযায়ী, রাজধানী যখন আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নিয়েছে, তখন নাকি তিনি বেহালা বাজাচ্ছিলেন। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, শহর পোড়ানোর নেপথ্যে হাত ছিল স্বয়ং সম্রাটের। গোটা ঘটনার দায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপর চাপিয়ে দেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫ সাল) শুরুর মুখে নাজ়ি জার্মানির ফুয়েরার আডল্ফ হিটলারের নির্দেশে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন করে তাঁর কুখ্যাত এসএস বাহিনী। পোল্যান্ড সীমান্তের গ্লিউইটজ়ে একটি রেডিয়ো স্টেশনে হামলা চালায় তাঁরা। আক্রমণের সময় জার্মান সৈনিকদের পরনে ছিল পোলিশ ফৌজের উর্দি। এসএস অফিসার আলফ্রেড নাউজোস্কের নেতৃত্বে হওয়া ওই ‘মিথ্যা অভিযানের’ জেরে পোল্যান্ড আক্রমণের একটা ছুতো পেয়ে যান হিটলার।
১৯৫৪ সালে মিশরে একটা বিস্ফোরণের ছক কষে মোসাদ, যার সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন সুসানাহ’। কায়রোর প্রেসিডেন্টের গদিতে তখন গামাল আবদেল নাসের। সুয়েজ় খালের জাতীয়তাকরণের পক্ষে আওয়াজ তোলেন তিনি। এতে প্রমাদ গোনে ইহুদিরা। সুয়েজের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমি শক্তির হাতেই থাক, চেয়েছিল ইজ়রায়েল। সেই লক্ষ্যে ব্রিটিশ এবং আমেরিকার মালিকানাধীনে থাকা সিনেমাহল, গ্রন্থাগার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বোমা নিক্ষেপ করে তারা।
ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী ভেবেছিল, মিশরের ভিতরে ওই বিস্ফোরণ হলে ভয় পাবে পশ্চিমি শক্তি। তখন সুয়েজ় খাল থেকে কিছুতেই বাহিনী প্রত্যাহার করতে চাইবে না তারা। কিন্তু, আচমকাই ফাঁস হয়ে যায় মোসাদের যাবতীয় পরিকল্পনা। নাসেরের পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় ইজ়রায়েলের একাধিক এজেন্ট। ইহুদিভূমির প্রতিরক্ষামন্ত্রী তখন পিনহাস লেভন। চাপে পড়ে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন তিনি। ইতিহাসে এই ঘটনা স্থান পায় ‘লেভন কেলেঙ্কারি’ হিসাবে।
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে বড়সড় ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের পরিকল্পনা করে মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ বা সিআইএ। তত দিনে অবশ্য ক্যারিবিয়ানের দ্বীপরাষ্ট্র কিউবায় কমিউনিস্ট শাসনের প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন কিংবদন্তি ফিদেল কাস্ত্রো। আমেরিকার গোয়েন্দারা ঠিক করলেন, দেশের ভিতরে বিভিন্ন জায়গায় মিথ্যা সন্ত্রাসী অভিযান চালাবেন তাঁরা। গুলি করে নামানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াকু জেট। রণতরীর আশপাশে হবে বিস্ফোরণ।
এ-হেন ‘মিথ্যা অভিযান’গুলির পুরো দোষটাই কাস্ত্রোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল সিআইএ। পাশাপাশি, তাঁর গায়ে সন্ত্রাসবাদীর তকমা সেঁটে দেওয়ার পরিকল্পনাও করে মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী। সংশ্লিষ্ট অভিযানের পোশাকি নাম রাখা হয় ‘অপারেশন নর্থউডস’। কিন্তু এতে বাদ সাধেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি। সিআইএ-র সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি নাকচ করে দেন তিনি, যার সালটা ছিল ১৯৬২।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুকে ভয়ঙ্কর হামলা চালায় কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী ‘আল-কায়দা’। যাত্রিবাহী বিমান ছিনতাই করে নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার) জোড়া বহুতলে ধাক্কা মারে তাঁদের আত্মঘাতী জঙ্গিবাহিনী। ফলে চোখের নিমেষে গুঁড়িয়ে যায় ওই দু’টি ইমারত। একই কায়দায় আক্রমণ হয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনেও।
৯/১১ হামলায় ১৯ সন্ত্রাসবাদী এবং ২,৯৭৭ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গোটা ঘটনার ‘মূলচক্রী’ হিসাবে ‘আল-কায়দা’ প্রধান ওসামা বিন-লাদেনকে চিহ্নিত করে আমেরিকা। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায় ওয়াশিংটন। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে লাদেনকে নিকেশ করে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এই ঘটনাকে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ বলেই আখ্যা দিয়েছে ইরান।