Delimitation Bill 2026

ক্ষমতার সমতা থাকবে না উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতের মধ্যে? কী এই ডিলিমিটেশন বিল? কেন তা নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে বিরোধীরা?

সংসদের বিশেষ অধিবেশন বসছে বৃহস্পতিবার থেকে। তিন দিন ধরে চলবে বাজেট অধিবেশনের বিশেষ পর্ব। সংসদে লোকসভার পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী বিল বা ‘ডিলিমিটেশন’ বিল পেশ করতে সক্রিয় হয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদীর সরকার।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৩
Share:
০১ ২১

রাজনৈতিক মানচিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। এর মূল চালিকাশক্তি হিসাবে সরকার বলছে, সংসদে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করার কথা। পাশাপাশি রয়েছে, লোকসভার পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব। আর তা নিয়েই উত্তাল দেশের রাজনৈতিক মহল।

০২ ২১

সংসদের বিশেষ অধিবেশন বসছে বৃহস্পতিবার থেকে। তিন দিন ধরে চলবে বাজেট অধিবেশনের বিশেষ পর্ব। সংসদে লোকসভার পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী বিল পেশ করতে সক্রিয় হয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদীর সরকার। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনেই মহিলা আসন সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার উদ্দেশ্যে আনা এই বিলের পোশাকি নাম ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। সেই বিলের সঙ্গেই ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিলও পেশ করা হবে আসন্ন অধিবেশনে।

Advertisement
০৩ ২১

সব সমালোচনা উপেক্ষা করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই লোকসভায় আসন বাড়িয়ে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ চালু করতে মরিয়া প্রধানমন্ত্রী মোদীর সরকার। লোকসভার আসন বাড়িয়ে মহিলাদের সংরক্ষণ চালুর উদ্দেশ্যে মোদী সরকার মোট তিনটি বিল আনতে চলেছে।

০৪ ২১

এই বিলগুলির খসড়া মঙ্গলবার পাঠানো হয়েছে সাংসদদের কাছে। সেগুলি হল— মহিলা সংরক্ষণের জন্য ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল, লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার জন্য আসন পুনর্বিন্যাস বিল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল। এই বিলেই ২০২৭-এর জনগণনার জন্য অপেক্ষা না করে ২০১১-র জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের ব্যবস্থা করেছে মোদী সরকার। সংসদের দুই কক্ষে পাশ হওয়ার পরে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বেড়ে ৮৫০ হতে পারে। আর তার এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

০৫ ২১

২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল পাশ হয়েছিল লোকসভা এবং রাজ্যসভায়। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ওই বিলে বলা হয়েছিল, জনগণনার পরে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। তার পর ওই আসনের ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখা হবে মহিলাদের জন্য।

০৬ ২১

ভারতের নিম্নকক্ষের ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে মহিলা প্রায় ১৪ শতাংশ। নতুন সংস্কার সেই সংখ্যাকে বাড়িয়ে মোট সদস্য সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ করবে, যা বৈশ্বিক মানের কাছাকাছি। ভারতে ইতিমধ্যেই শহরাঞ্চলের গ্রাম পরিষদ এবং পুরসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ (যার মোটামুটি অনুবাদ ‘নারী শক্তিকে সম্মান জানানোর আইন’)-কে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, “আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।”

০৭ ২১

সংবিধানের ৮১ নম্বর ধারা বলছে, লোকসভার সর্বোচ্চ আসন হতে পারে ৫৫২। এর মধ্যে ৫৩০ জন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে এবং ২০ জন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি থেকে নির্বাচিত হতে পারেন। ৮১ নম্বর ধারা অনুযায়ী এর আগে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর ২ জন সদস্য লোকসভায় মনোনীত হতেন।

০৮ ২১

কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর জমানায় ২০১৯ সালে সংবিধানের ১০৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে তা তুলে দেওয়া হয়েছিল। এ বার ৮২ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব রয়েছে বিলে। ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণনার শেষ হওয়ার পরে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। এ পর্যন্ত ভারত ১৯৫১, ১৯৬১ এবং ১৯৭১ সালে দশবার্ষিক জনগণনার ভিত্তিতে তিন বার সংসদীয় আসনের রদবদল করেছে।

০৯ ২১

তার পর থেকে, রাজ্যগুলির মধ্যে জন্মহারের ভিন্নতার কারণে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কায় সব দলের সরকারই এই প্রক্রিয়াটি স্থগিত রেখেছিল। কিন্তু এ বার তা নিয়ে উদ্যোগী হয়েছে মোদী সরকার। আর জনগণনার রিপোর্ট প্রকাশের আগেই লোকসভার আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণও চালু করতে চাইছে কেন্দ্র।

১০ ২১

তবে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কও মাথাচাড়া দিয়েছে। ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অহেতুক তাড়াহুড়ো’র অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। কেন্দ্র আর জনগণনা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দু’টি পৃথক বিষয়কে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ বিভিন্ন বিরোধী দল।

১১ ২১

বিরোধীদের দাবি, মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করা নিয়ে তাঁদের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু মোদী সরকার মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার জন্য যে ভাবে নিজের ইচ্ছামতো লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাইছে, তাতে আপত্তি রয়েছে। কারণ, এর ফলে বিজেপির গড় উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি থেকে লোকসভা কেন্দ্রের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে দক্ষিণ বা পূর্ব ভারতের থেকে আরও বেড়ে যাবে। বিরোধীদের বৈঠকে সব দলের নেতারাই একসুরে বলেছেন, কোন জনগণনার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হবে, তা সংবিধান থেকে সরিয়ে সরকারি আইনের আওতায় নিয়ে আসতে চাইছে মোদী সরকার। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার যখন খুশি আসন পুনর্বিন্যাস করতে পারবে।

১২ ২১

বিরোধীদের বৈঠকে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। বিরোধীদের আশঙ্কা, আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন কমিশনের মাথায় নিজের বাছাই করা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে বসিয়ে নিজের পছন্দ মতো লোকসভা, বিধানসভা কেন্দ্রের সীমানা নির্ধারণ করবে বিজেপি। সংখ্যালঘু ভোট যাতে নির্দিষ্ট কিছু আসন বাদে বাকি কোথাও নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে না পারে, সেই ভাবে সীমানা নির্ধারণ হবে।

১৩ ২১

লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘বিজেপির একটি বিপজ্জনক পরিকল্পনা হল ২০২৯ সালের নির্বাচনের জন্য সব লোকসভা আসন নিজেদের সুবিধামতো জালিয়াতি করা। প্রস্তাবিত বিলগুলো সীমানা পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সমস্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা সরিয়ে দিচ্ছে, ফলে পুরো ক্ষমতা চলে যাবে ডিলিমিটেশন কমিশনের হাতে, যেটিকে সরকার নিজেই নিয়োগ ও পরিচালনা করবে।’’

১৪ ২১

সংসদের বিশেষ অধিবেশনের আগে রণকৌশল স্থির করতে বুধবারই দিল্লিতে বৈঠকে বসেছিল বিরোধী দলগুলি। বৈঠকের পরে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল বলেন, ‘‘এই বিলটি ভয়ঙ্কর, কারণ এর ফলে গণতন্ত্র সঙ্কটের মুখে পড়বে। এর শর্তগুলি দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়।” সেই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘মহিলা সংরক্ষণ বিল ২০২৩ সালেই সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে। সেই বিলের আড়ালে, গত তিন বছরে কিছু না করে, এখন তাদের সুবিধামতো বৃহৎ পরিসরে আসন পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব আনা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্রকে ছিনতাই করার চেষ্টা।’’

১৫ ২১

বুধবার দিল্লিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের বাড়িতে বিরোধী দলগুলির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী লোকসভা নির্বাচনের সময় মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার আগে মোদী সরকার যে ভাবে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে, তা সম্মিলিত ভাবে আটকানো হবে।

১৬ ২১

কারণ সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে লোকসভা ও রাজ্যসভার মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন ছাড়াও, উপস্থিত ও ভোটাভুটিতে অংশ নেওয়া সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। লোকসভায় এখন ৫৪০ জন সাংসদ রয়েছেন। যদি সবাই উপস্থিত থেকে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশের সময়ে ভোটাভুটিতে অংশ নেন, তাতে বিলের পক্ষে ৩৬০ জনের সমর্থন প্রয়োজন।

১৭ ২১

এই মুহূর্তে এনডিএ-র শিবিরে লোকসভায় ২৯৩ জন সাংসদ রয়েছেন। বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার রয়েছে ২৩৪ জন। বুধবারের বৈঠকের পরে বিরোধীদের হিসাব, তাঁদের অন্তত ১৯৩ জন সাংসদ লোকসভায় হাজির থেকে বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন। ফলে লোকসভায় বিল পাশ করানো যাবে না। বিরোধীদের বক্তব্য, লোকসভায় বিল পাশ না হলে রাজ্যসভায় বিল যাবেই না।

১৮ ২১

লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য সংশোধনী বিলের প্রস্তাব বিরোধী, বিশেষ করে দক্ষিণের বিরোধী দলগুলোকে উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে তাদের আসন এবং প্রভাব তুলনামূলক ভাবে উত্তর ভারত এবং পূর্ব ভারতের তুলনায় কমে যেতে পারে। ফলে কার্যকর ভাবে কম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং শক্তিশালী অর্থনীতির অঞ্চলগুলি বিপদে পড়বে।

১৯ ২১

দক্ষিণের পাঁচ রাজ্য তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, কেরল এবং তেলঙ্গানা— ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের প্রায় ২০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও তারা দেশের বাকি অংশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু এখানে উত্তরের তুলনায় শিশু জন্মের হার কম হওয়ার কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম।

২০ ২১

তামিলনাড়ু, কেরল, কর্নাটক এবং তেলঙ্গানা ২৫ বছরের জন্য আসন পুনর্বণ্টন স্থগিত রাখার আবেদন করেছিল। ফলে কেন্দ্রের নতুন এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট ভাবেই উদ্বিগ্ন তারা। দক্ষিণ ভারতের বিরোধী নেতাদের আশঙ্কা, কম সন্তান জন্মানো এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী হওয়ার ‘শাস্তি’ হিসাবে দক্ষিণ ভবিষ্যতে সংসদীয় গুরুত্ব হারাতে পারে উত্তরের তুলনায়।

২১ ২১

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন ইতিমধ্যেই সংসদে লোকসভার পুনর্বিন্যাস করার পরিকল্পনাকে ‘বড় ঐতিহাসিক অবিচার’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দল ডিএমকে বৃহস্পতিবার রাজ্য জুড়ে কালো পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিরও ডাক দিয়েছে। জনসমক্ষে সীমানা নির্ধারণ বিল বা ‘ডিলিমিটেশন’ বিলের অনুলিপি পুড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে স্ট্যালিনকে। তিনি প্রশ্নও তুলেছেন, ‘‘ভারতের অগ্রগতির জন্য লড়াই করার অপরাধে তামিলনাড়ু ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোকে কি শাস্তি দেওয়া হচ্ছে?’’

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement