সরকারি গোয়েন্দা বা স্পাইয়ের চল ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থায় চালু থাকলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর সেই অর্থে আলাদা করে কোনও গোয়েন্দাসংস্থা তৈরির প্রয়োজন পড়েনি। ভারতের সরকারি গোয়েন্দাসংস্থা ‘ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো’র জন্ম হয়েছিল ‘ব্রিটিশ এমআই৬’-এর আদলে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্ত গুপ্ত তথ্য জোগাড় করার ভার ছিল এই প্রতিষ্ঠানের কাঁধে।
১৯৬২ সালের চিন-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের ‘অপারেশন জিব্রাল্টারের’ পূর্বাভাস দিতে না পারা ছিল সে সময়ের অন্যতম বড় গোয়েন্দা ব্যর্থতা। এর ফলে সামরিক উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি পৃথক সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ গোয়েন্দাসংস্থা আইবি অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক— দু’দিক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল।
১৯৬৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সিদ্ধান্ত নেন যে, ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা কার্যকলাপ চালানোর জন্য একটি পৃথক সংস্থা প্রয়োজন। সেটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর জহুরির চোখ এমন একজনকে বেছে নিয়েছিল, যাঁর দৌলতে দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সংজ্ঞাই পাল্টে গিয়েছিল। দেশের মাটিতে বসে বিদেশে গোয়েন্দাগিরি চালানোর জন্য পেশাদার পৃথক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা থেকে গড়ে ওঠে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং অর্থাৎ ‘র’। আর এই সংস্থার প্রাণপুরুষ ছিলেন রামেশ্বরনাথ কাও ওরফে আরএন কাও।
তিনিই ভারতের প্রথম এবং ‘শ্রেষ্ঠ সুপার স্পাই’। তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে সকলে ওয়াকিবহাল থাকলেও হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ছবিই পাওয়া যায়। তেমনই পাওয়া যায় না তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে জীবনযাপন করতেন তিনি। জনসমক্ষে খুব কমই দেখা যেত তাঁকে। ‘র’-এর ইতিহাস লিখতে গেলে কাও ছাড়া তা অসম্পূর্ণ। ‘র’ আর কাও যেন একে অপরের পরিপূরক।
১৯৪০ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভারতীয় ইম্পিরিয়াল পুলিশে যোগদানের পর তা ছেড়ে দেন কাও। তাঁর প্রথম পোস্টিং ছিল কানপুরে, সহকারী পুলিশ সুপার হিসাবে। স্বাধীনতার ঠিক আগে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) পুনর্গঠিত হওয়ার সময় কাওকে সেখানে নিযুক্ত করা হয়। জওহরলাল নেহরুর আস্থাভাজন হিসাবে পরিচিত তুখোড় বুদ্ধির এই গোয়েন্দাকর্তা পরবর্তী দেশশাসক ইন্দিরার সুনজরে পড়েন।
ঘানার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কোয়ামে এনক্রুমার সরকারকে একটি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার জন্য পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে কাওকে ঘানায় পাঠানো হয়েছিল। রহস্যময় জীবনযাপন করতেন কাও। অত্যন্ত প্রচারবিমুখও ছিলেন। ফরাসি গোয়েন্দারা তাঁকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা গোয়েন্দাপ্রধান হিসাবে অভিহিত করেছিলেন।
তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি জওহরলালের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কাও ছিলেন একাধারে ভারতীয় আমলা, পুলিশকর্তা এবং গোয়েন্দাকর্তা। তিনি ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং-এর প্রথম প্রধান হিসাবে ১৯৬৮ সালের জন্মলগ্ন থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে তিনি আইবি-র দুঁদে কর্তা হিসাবে পরিচত ছিলেন সরকারের বিভিন্ন মহলে।
‘র’-এর জন্মলগ্নে আইবি থেকে কয়েক জন বাছা বাছা সুদক্ষ গোয়েন্দাকে কাও নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন। গোয়েন্দা মহলে ‘কাও-বয়েজ়’ বলে পরিচিত ছিলেন তাঁরা। ‘র’-এর মধ্যে শৃঙ্খলা, আনুগত্য এবং তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছিলেন কাও, যা আজও সংস্থার মূল চালিকাশক্তি। তিনি মনে করতেন একজন গোয়েন্দা তখনই সফল, যখন তাঁর নাম কেউ জানতে পারে না।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সেটি কাওয়ের পেশাজীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। তাঁর নির্দেশে ‘র’ বাংলাদেশের ‘মুক্তি বাহিনী’কে অস্ত্র ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়। যুদ্ধের আগেই পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক প্রস্তুতির নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে কৌশলগত সুবিধা করে দিয়েছিলেন ‘কাও-বয়েজ়’। সাবেক সেনাকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দু’টি পর্যায়ে ঘটেছিল। গোপন অন্তর্ঘাত ও সামরিক হস্তক্ষেপ।
প্রথম পর্যায়টিতে কাও এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে জেনারেল স্যাম মানেকশ’ সমন্বয় করেছিলেন। উভয়েই সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে রিপোর্ট করতেন। কাওয়ের সহচরদের গোয়েন্দা তথ্য এতটাই পূর্ণাঙ্গ ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তান মন্ত্রিসভা যে কক্ষে বৈঠক করছিল সেখানে বোমাবর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল ভারতীয় বিমানবাহিনী। সেই তথ্যের বলেই ভারতের নৌ কমান্ডোরা চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি জাহাজ উড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কাওয়ের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি জেনারেলদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতাতেও ভারতীয় গোয়েন্দারা আড়ি পাততে পারতেন বলে দাবি করা হয়।
রক্তপাত ছাড়াই একটি রাজতন্ত্রকে কী ভাবে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তা ছিল কাওয়ের রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা বুদ্ধির চরম নিদর্শন। তিনি সিকিমের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকামী শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রায় অসাধ্যসাধন করেছিলেন। সিকিমের রাজা বা চোগিয়াল (পালদেন থোনডুপ নামগিয়াল) ভারতকে ভারত-সিকিম চুক্তি সংশোধনের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। ভুটানের মতো একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন তিনি।
পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য সিকিমের এই দাবি বেশ ঝুঁকির কারণ ছিল। ইন্দিরার নির্দেশে সমস্যা সমাধানে আসরে নামেন কাও। কাওয়ের নির্দেশে মাঠে নামেন অজিত ডোভাল। এর পর ‘র’ সিকিমের চোগিয়াল-বিরোধী এবং ভারতপন্থী নেতাদের নৈতিক ও আর্থিক সহায়তা দিতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালে সিকিমে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশাল গণ আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন যে, চোগিয়াল সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে সিকিমের রাজা ভারতের সাহায্য চাইতে বাধ্য হন।
কাও ২৭ মাসের অপারেশনটি এমন ভাবে পরিচালনা করেছিলেন যে বিশ্ব জুড়ে গোয়েন্দাসংস্থাগুলি ভারতের পরিকল্পনা টেরই পায়নি। ১৯৭৩ সালের ৪ এপ্রিল, চোগিয়ালের ৫০তম জন্মদিনে, গ্যাংটকের রাস্তায় সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিবর্ষণে দু’-এক জনের মৃত্যু ঘটে। চোগিয়ালের বড় ছেলে তেনজিং প্রাসাদে যাওয়ার পথে বাধা পেলে, সিকিম গার্ডের এক সদস্য আতঙ্কিত হয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালান। বিরোধীরা এই ঘটনাটিকে চোগিয়াল-বিরোধী মনোভাব উস্কে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেন। পরের দিনই সিকিম জুড়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ শুরু হয়।
শেষ ধাপে কাও অত্যন্ত দ্রুততায় অভিযানটি শেষ করেন। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে চোগিয়ালের প্রাসাদের রক্ষীদের নিরস্ত্র করতে ভারতীয় সেনাবাহিনী নির্দেশ পায়। ‘র’-এর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অপারেশনটি মাত্র ২০ মিনিটে শেষ হয়। সিকিম বিধানসভা চোগিয়াল পদটি বিলুপ্ত করার প্রস্তাব পাশ করে। এর পর একটি গণভোট আয়োজন করা হয়, যেখানে সিকিমের ৯৭.৫ শতাংশ জনতা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দেন। কোনও বড় ধরনের রক্তক্ষয় ছাড়াই সিকিম ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।
শুধুমাত্র স্থানীয় গোয়েন্দাদের তথ্যের উপর ভরসা করে ‘র’ পরিচালনা করতেন কাও, এমনটা ভাবা ভুল। দেশ-বিদেশের গোয়েন্দাদের সঙ্গে সুচারু যোগাযোগ রেখে চলতেন তিনি। ভারতের জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান কেএন দারুওয়ালার মতে, কাও সিআইএ এবং কেজিবির মতো সংস্থাগুলির সঙ্গে দুর্দান্ত সংযোগ বজায় রেখেছিলেন। ইরান, আফগানিস্তান ও চিন জুড়ে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন। এর ফলে, বিশ্বব্যাপী জোট যখন ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছিল, তখন ভারতের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য পেতে সমস্যা হয়নি কাওয়ের তুখোড় নেটওয়ার্কের জন্য।
১৯৭৭ সালে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পদচ্যুত হন। কংগ্রেস নির্বাচনে জনতা পার্টির কাছে পরাজিত হয়। কাও এবং ইন্দিরার পেশাগত ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত ছিল। বিরোধীদের অনেকেই মনে করতেন কাও ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর ‘চোখ ও কান’। তাই ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থায় কাওয়ের ভূমিকা দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তবে কাওয়ের ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে খবর, ব্যক্তিগত ভাবে তিনি ইন্দিরাকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করার পরামর্শই দিয়েছিলেন।
১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কাও পদত্যাগ করেন। কারণ কাও জানতেন নতুন সরকারের আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারবেন না তিনি। ১৯৮০ সালে ইন্দিরা পুনরায় দিল্লির ক্ষমতায় ফিরলে তিনি কাও-কে আবার ফিরিয়ে আনেন। তবে এ বার সরাসরি ‘র’ প্রধান হিসাবে নয়, বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে। ১৯৮৪ সালে শিখ দাঙ্গা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের একটি বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। বলা হয়ে থাকে ‘র’-এর প্রাক্তন প্রধান কাওয়েরই মস্তিষ্কপ্রসূত পরিকল্পনা থেকে জন্ম নেয় ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড বা এনএসজি।
১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর যখন তরুণ রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি দেশের নিরাপত্তা নিয়ে দিশেহারা ছিলেন। কাও তখন তাঁর অভিভাবকের মতো ভূমিকা পালন করেন। রাজীবকে যাবতীয় গোয়েন্দা রিপোর্ট বোঝানো এবং বিশ্ব রাজনীতি শেখানোর পিছনে বড় অবদান পোড়খাওয়া এই ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তারই।
৭০-এর দশকে বিশ্বের শীর্ষ গোয়েন্দা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে গণ্য হওয়া সত্ত্বেও কাও প্রচারের আলো থেকে দূরেই থাকতেন। তিনি নিজের কাজ নিয়ে খুব কমই কথা বলতে ভালবাসতেন। অবসরের পরেও গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শদাতা হিসাবে নিরন্তর কাজ করে গিয়েছেন পর্দার অন্তরালে। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যা আজও ভারতের গোয়েন্দা ও জাতীয় নিরাপত্তার কাজকর্মকে প্রভাবিত করে। ২০০৩ সালে মৃত্যু হয় ‘র’-এর প্রাণপুরুষের।